ফুল খাওয়া শেষ। এখন দেখা হবে কার মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হল।
হঠাৎ ফ্রান্সিস ছুট লাগাল। প্রহরীদের ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ইশারা করল। শাঙ্কো লাফিয়ে উঠল। তারপর দুজন কয়েদীর ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হল মারামারি। অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুষোঘুষি শুরু হল। বেঁটে চেঁচিয়ে বলল—থামো থামো। শাঙ্কো থামল। বেঁটে প্রথমে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–তুমি তো দেখছি বিদেশি।
বিদেশি বলে কি ফুল কাজ করবে না? ফ্রান্সিস বলল।
–না-না তা করবে। তুমি কোন ফুল খেয়েছিলে? বেঁটে বলল।
–সূর্যমুখী ফুল। ফ্রান্সিস বলল।
এবার বেঁটে জিজ্ঞেস করল শাঙ্কোকে–তুমি?
–চন্দ্রমল্লিকা ফুল। শাঙ্কো বলল।
রাজার দিকে তাকিয়ে বেঁটে বলল–এই দুটি ফুল অনেককে খাইয়ে দেখেছি কোন সতেজভাব হয়নি। কিন্তু এখানে হয়েছে তার কারণ মাটি। আপনার এই এলাকায় মাটি খুব ভাল। তাই অন্তত দুজনের মধ্যে দ্রুত ভালো প্রতিক্রিয়া হয়েছে। চন্দ্রমল্লিকা আর সূর্যমুখীর চাষ বাড়ান। আপনার সৈন্যদের খাওয়ান। সৈন্যরা বিদেশি সৈন্যদের সঙ্গে সিংহের মত লড়বে।
-হ্যাঁ। যা বুঝছি দুটো ফুলেরই চাষ বাড়াতে হবে। রাজা বললেন।
–ঠিক তাই। বেঁটে বলল।
রাজা, বেঁটে আর সেনাপতি ঘোড়ায় চড়ে চলে গেল। ফ্রান্সিস হেসে উঠল। শাঙ্কোও হেসে প্রায় লুটিয়ে পড়ে অবস্থা। কয়েদীরা ঠিক বুঝল না ওদের হাসির কারণ কী।
দুদিন পরে পাগল রাজা আর বেঁটে এল। এবার মাঝরাতে না। দিনের বেলাই এল। সামনের দুটো ঘোড়ায় রাজা আর বেঁটে। আর একটি ঘোড়ায় সেনাপতি।
রাজা ও বেঁটে কাটাতারের প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢুকল। সেনাপতি বেশ জোরে বলল–মাননীয় রাজা এসেছেন। তোমরা এই দেবদারু গাছের নিচে এসে দাঁড়াও। প্রহরীরাও এসো।
কিছুক্ষণের মধ্যে সব কয়েদীরা প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে দাঁড়াল। প্রহরীরা এসেও দাঁড়াল। রাজা বলল–তোমরা সূর্যমুখী ফুল খেয়েছিলে? কয়েকজন কয়েদী মাথা কাত করে বলল খেয়েছি। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–কী করে খাবো। কে বা কারা বাগানের সব সূর্যমুখী ফুলের গাছ শেকড়সুষ্ঠু উপড়ে ফেলেছে।
-সে কি। এতো সাংঘাতিক অপরাধ। রাজা বললেন।
–অবশ্যই অপরাধ। বেঁটে বলল।
রাজা সব কয়েদীদের দিকে তাকাল। সবাই চুপ। পাগলা রাজা আরো চটে গেল। বলতেই হবে কে কাণ্ডটা করেছি।
সবাই চুপ। সেনাপতি এগিয়ে এল। রাজাকে কানে কানে কী বলল। রাজা কান সরিয়ে বললেন–এক-এক করে এগিয়ে এসো। একজন একজন করে এগিয়ে আসতে লাগল আর রাজা তাদের হাত দেখতে লাগলেন। একজন কয়েদীকে পেলেন। তার হাত মাটিমাখা।
রাজা বললেন–সেনাপতি এটাকে ধরুন। সেনাপতি ছুটে এসে কয়েদীটিকে সরিয়ে নিল। রাজা আবার কয়েদীদের হাত দেখতে লাগলেন। এবার ফ্রান্সিস ধরা পড়ল। রাজা চেঁচিয়ে বললেন–এই বিদেশিটার হাতে মাটি ধুলো। ফ্রান্সিস বলল- মহামান্য রাজা উপড়ে-ফেলা সূর্যমুখী পাঁচটা গাছ আমি পুঁততে পেরেছি। তাই হাতে ধূলা মাটি লেগেছে।
খুব ভালো–খুব ভালো। পাগলা রাজা চেঁচিয়ে বলল।
আবার হাত দেখা শুরু হল। আবার একজনকে পাওয়া গেল। দুজনকে দেখিয়ে রাজা সর্দার প্রহরীকে বললেন–এদের কী শাস্তি হবে তা তো জানিস। ঐ দুটোকে সেই শাস্তি দে।
সর্দার প্রহরী এগিয়ে এল। পেছনে আরো কয়েকজন প্রহরীও এল।
ওরা দুই কয়েদীদের নিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে নিয়ে গেল। রাজা চেঁচিয়ে ছুঁড়ে ফ্যা। দুজন প্রহরী ঐ কয়েদীদের দুজনকে ধরে কাঁটাতারের বেড়ার ওপর ছুঁড়ে দিল। কয়েদী দুজন উঠে এলো। আবার ধাক্কা দিয়ে ফেলল কাটাতারের ওপর। এইভাবে কিছুক্ষণ ছোঁড়া ভোলা চলল। কয়েদী দুজন কাঁদতে লাগল। সমস্ত শরীর দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। পোশক রক্তাক্ত।
রাজা হাত তুললেন। শাস্তি বন্ধ হল। কয়েদী দুজন আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে অন্য কয়েদীদের কাছে এল তখনও সারা গা থেকে রক্ত বেরোচ্ছে।
রাজা এবার হাসলেন। বললেন–সেনাপতি।
-বলুন।
–এই শাস্তিটা কেমন বের করেছি বলুন তো? রাজা বললেন।
–তুলনা নেই। কেউ ভাবতেই পারবে না। সেনাপতি বলল।
তিনজনে কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে এল। ঘোড়ায় চড়ল। রাজপ্রাসাদের দিকে চলল। রাজা যেতে যেতে বললেন জানেন এই শাস্তির ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি। ঘুমোবার আগে এই এক চিন্তা আমার। কেটে ফেলা হল, ফাঁসি দেওয়া হল এসব তো আবহমানকাল ধরে চলে আসছে। আমি চাই নতুন কিছু। আর কেউ যা ভাবতেই পারবে না।
–আমিও ভাবি বুঝলেন। ভাবি কী করে মানুষকে উজ্জীবিত করা যায়। নতুন নতুন সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যেমন এখন ফুল নিয়ে ভাবছি–পরে ফল নিয়ে ভাববো। বেঁটে বলল।
–ঠিক বলেছেন। রাজা হেসে বললেন।
আহত দুই কয়েদীকে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো নিয়ে এসে বিছানায় শুইয়ে দিল। আহত দুজন তখনও গোঙাচ্ছে। গুরুতর আহত ওরা। ফ্রান্সিস প্রহরীদের ঘরে এল। সর্দার প্রহরীকে বলল–কাটাছেঁড়ার ওষুধ আছে?
সর্দার প্রহরী বলল–আছে। কিন্তু রাজা আহতদের জন্যে ওষুধ দিতে বলে যান নি। কাজেই আমি দিতে পারবো না।
ফ্রান্সিস এক লাফে এগিয়ে সর্দার প্রহরীর গলা চেপে ধরল। সর্দার প্রহরী মাটিতে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস দাঁত চাপা স্বরে বলল, ওষুধ না দিলে তোমাকে আমি খুন করবো আর সেটা করতে গিয়ে আমি মরে যেতে রাজি। বল–কী করবে?
