–সেটা তো একটা কারণ বটেই। তা ছাড়া আরও কারণ আছে। এই কাকোয়াম্বোর সঙ্গে প্যারাইসো দেশের অল্পদিনের মধ্যেই লড়াই বাঁধবে। আমরা বিদেশি গুপ্তচর বলে সন্দেহ করে এখানকার পাগলা রাজা আরকানিয়া আমাদের কয়েদ করেছে।
–তাহলে তোমরা এখানে এলে কেন? আর একজন কয়েদী বলল।
ফ্রান্সিস বার্বারের কথা–তার হীরে চুরির কথা সব বলল। তারপর বলল– আমাদের মিথ্যে বদনাম দিয়ে পাগলা রাজা আরকানিয়া আমাদের কয়েদখানায় ঢুকিয়েছে।
–রাজা আরকানিয়াকে পাগলা রাজা বলছো কেন?
–পাগলা না হলে কেউ কাটাতারে ঘেরা কয়েদখানা করে? কয়েদখানার মধ্যে বাগান করে? কয়েদখানার চাবি থাকে কয়েদীর কাছে।
দুতিনজন কয়েদী হেসে উঠল। একজন বলল–তাহলে তুমিও পাগলা রাজাকে চিনেছো। পাগলা রাজার আরো কাণ্ডকারখানা আছে। যাক গে–সবেমাত্র এলে। তাই রেহাই পেলে। কাল ভোর থেকেই কাজে ডেকে নিয়ে যাবে। বাগান পরিচর্যার কাজ চলছে এখন। আমাদের সঙ্গে ঐ কাজেই লাগতে হবে।
এমন সময় ঘরে ঢুকলো সর্দার প্রহরী। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল– তোমরা কোথায় থাকতে চাও?
–এই ঘরেই। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে ঐ দক্ষিণ কোনায় তোমাদের বিছানা করে দেওয়া হবে। তোমরা আমার সঙ্গে এসো। সর্দার দরজার দিকে চলল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো সর্দারের পেছনে পেছনে চলল।
প্রহরীদের ঘরে ঢুকল। কোনার একটা পাশে স্থূপীকৃত শুকনো ঘাস পাতা। উঁই করে রাখা। সর্দার বলল–এখান থেকে ঘাসপাতা নিয়ে নিজেদের বিছানা তৈরি করো।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো ঘাসপাতা দফায় দফায় নিয়ে এসে বিছানা তৈরি করল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো বসে রইল।
দু’দিন কাটল। ফ্রান্সিসের এক চিন্তা–এই অদ্ভুত কয়েদখানা থেকে পালাতে হবে। কিন্তু কেমন করে। সব চিন্তাভাবনা গুলিয়ে যাচ্ছে।
সেদিন সর্দার এসে বলে গেল রাজা আরকানিয়া কয়েদখানা দেখতে আসবেন।
সকাল গেল। বিকেলও গেল। রাত হল। ফ্রান্সিসদের খুব তাড়াতাড়ি খেতে দেওয়া হল। কয়েদীরা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল না। বসে রইল। ফ্রান্সিস একজন কয়েদীকে বলল–রাজা তো আর আসবে না।
–হুঁ। পাগলা রাজা নাম হয়েছে কি সাধে। ঘুমিয়ে পড়ো না। রাজা ঘুমুচ্ছে দেখলে ভীষণ রেগে যায়। বলে–আমার আসার খবর আগেই দেওয়া হয়েছে। গভীর রাতেও আসতে পারি। তোমরা শুয়ে পড়লে কেন। ওঠ। সবাই উঠে দাঁড়ায়। রাজা ইঙ্গিত করে–বসো। সবাই বসে পড়ে। কথাগুলো শাঙ্কোও শুনল। বলল–রাজাটা। একেবারে বেহেড একটা। একজন কয়েদী বলছিল এসব সত্ত্বেও পাগল রাজা ভালো।
গভীর রাত তখন। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু প্রহরীদের ঘরে মশালের আলো। কয়েদীদের ঘরেই মশাল জ্বলছে।
হঠাৎ প্রহরীদের ছুটোছুটির শব্দ শোনা গেল।
রাজা আরকানিয়া ঘোড়ায় চেপে এলেন। পেছনে দুজন অশ্বারোহী। সবাই দরজার কাছে থামল। সর্দার প্রহরী ছুটে এসে দরজা খুলে দিল। ঘোড়া থেকে নেমে রাজা আস্তে আস্তে দরজা পার হয়ে কয়েদীদের ঘরের সামনে এলেন।
তারপর কয়েদীদের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। প্রথমেই ফ্রান্সিসদের ঘরটা পেলেন। নিজেই ভেজানো দরজা খুলে ঢুকলেন। মশালের আলোয় দেখলেন সব কয়েদী উঠে দাঁড়িয়েছে। রাজা ফ্রান্সিসদের সামনে এসে বললেন–তোমরা গুপ্তচর। কঠিন শাস্তি হবে তোমাদের।
–আমরা নির্দোষ। আপনার দেশের কোন ক্ষতি করতে আমরা আসি নি। আমরা বিদেশি। আপনাদের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্কই নেই।
–আছে–আছে। কিন্তু একটা কথা বুঝতে পারছি না। তোমরা আমার রাজত্বে এলে কেন? রাজা বললেন।
-যদি শোনেন তাহলে বলি? ফ্রান্সিস বলল।
–বলো। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিস তখন আস্তে আস্তে হীরের খণ্ড চুরির ব্যাপারটা বলল। তারপর বলল– গয়না গড়তে একখণ্ড হীরে এই বার্বারকে দিয়েছিলো কিনা। বার্বার হীরের খণ্ডটা হারিয়ে গেছে এরকম কথা বলে অন্য হীরের খণ্ড নিয়ে গিয়েছিল কিনা। শুধু এইটুকু জানতে আপনার রাজত্বে এসেছিলাম। আমাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই।
–হুঁ। বানিয়ে টানিয়ে ভালোই বললে। কিন্তু আমাকে অত সহজে বোকা বানানো। যাবে না। তোমাদের বিচার হবে। রাজা বললেন, তারপর অন্য কয়েদীদের কাছে গেলেন।
আশ্চর্য! কয়েদীদের নাম ধরে ডাকলেন। কয়েদীরা একে একে রাজার কাছে আসতে লাগল। কার কী অপরাধ তাও বললেন। ক’ বছরের সাজা হয়েছে তাও বললেন।
এবার রাজা প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে বললেন–খুব সাবধানে পাহারা দেবে যেন কেউ পালাতে না পারে।
রাজা কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঘোড়ায় উঠলেন। সঙ্গের দুজন। অশ্বারোহীও ঘোড়ায় চড়ল। রাজা ঘোড়া ছোটালেন রাজবাড়ির দিকে।
পাগলা রাজা আবার এল কয়েকদিন পরে। সঙ্গে সেনাপতি আর বেশ বেঁটে একজন লোক। তালা খুলে দেওয়া হল। রাজা সেনাপতি আর বেঁটে লোকটি– ঢুকলেন। প্রহরী সর্দারকে বলল–সব কয়েদীদের এখানে আসতে বল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সব কয়েদী জড় হল।
রাজা সর্দার প্রহরীকে বললেন, বাগানে ফুল এত কম কেন?
–মান্যবর রাজা–এটা শীতকাল। কাজেই ফুলের সংখ্যা কম। তবে ঝরে গেলেও দক্ষিণ দিকটায় খুব ফুল ফুটেছে। রাজা বেঁটে লোকটার দিকে তাকাল। বলল- মনে হয় খুব বেশি ফুল পাবেন না।
–ঠিক আছে। যা দেখছি তাতে কাজ চলে যাবে। বেঁটে লোকটি বলল।
–তাহলে দেখুন। রাজা বললেন।
বেঁটে লোকটি একটু গলা চড়িয়ে বলল–তোমরা সবাই প্রত্যেকটি গাছ থেকে একটি করে ফুল নিয়ে খাবে। বুঝতে হবে কোন ফুল খেয়ে তোমাদের শরীরের ক্লান্তিভাব চলে গেছে। এখন অনায়াসে হেঁটে অন্য রাজ্যে চলে যেতে পারবে। মন উৎফুল্ল থাকবে। বর্শা ছুঁড়তে পারবে বেশ দূরে। লক্ষ্যভেদ করতে পারবে। এই অবস্থাটা বেশ কিছুদিন চলবে। তারপরে আবার ফুল খেতে হবে। বেঁটে ভদ্রলোকটি থামলেন। তারপরে বললেন-তোমরা ফুল খেতে থাকো। কয়েদীরা ফুল গাছের ওপর যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। সবাই ফুল খেতে লাগল।
