–এরকম মানুষ তোমরা? বিশ্বাস হয় না। রাজা হেসে বললেন।
–দেখেন নি কাউকে। তাই বিশ্বাস হচ্ছে না আপনার। ফ্রান্সিস বলল।
–যাক গে–তোমরা কোথা থেকে আসছো? রাজা জিজ্ঞেস করলেন।
–প্যারাইসো থেকে। ওখানে জাহাজঘাটায় আমাদের জাহাজ রয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–হুঁ। কী জন্যে এখানে এসেছো?
–তাহলে একটু খুলে বলতে হয়। তানাকাতে বাবার নামে একজন জহুরী থাকে। আপনি বোধহয় নাম শুনেছেন। ফ্রান্সিস বলল।
না। বলে যাও। রাজা বললেন।
–সেই বার্বার এখানে বেশ কয়েকটি দেশের রাণিদের জন্যে বা রাজকুমারীদের জন্যে হীরের গয়না তৈরি করে দিয়েছেন। ফ্রান্সিস বলল।
জানি না। হতে পারে। রাজা বললেন।
–এখন এই বার্বার এখানেও হীরের গয়না গড়াবার ডাক পেয়েছিল কিনা সেটা জানতে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল।
কে কোথায় কার জন্য গয়না গড়াচ্ছে এটা জেনে তোমাদের কী লাভ? রাজা বললেন।
–আমাদের আর্থিক লাভ কিছুই নেই। তবে এই থেকে একটা কথা জানা যাবে বলে আমাদের ধারণা। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা আরকানিয়া হঠাৎ সিংহাসন থেকে উঠলো। তারপর সিংহাসনের চারপাশে ঘুরে এল। রাজা দাঁড়িয়ে রইলেন কাজেই মন্ত্রী সেনাপতি অমাত্যরাও উঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের আসনের চারপাশে ঘুরে এল। সিংহাসনে রাজা আরকানিয়া বসলেন। সবাই বসল।
–কী কথা জানতে চাও? রাজা বললেন।
–গয়না গড়ার আগে বার্বার বলেছে কিনা সেই হীরকখণ্ড হারিয়ে গেছে কিংবা চুরি হয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা আরকানিয়া সিংহাসন থেকে হঠাৎ লাফিয়ে উঠে পড়লেন। মন্ত্রী, অমাত্যরাও উঠে দাঁড়ালন। রাজা বললেন–সব মিথ্যে কথা। তোমরা প্যারাইসো দেশের গুপ্তচর। আর কিছুদিনের মধ্যেই আমরা প্যারাইসো আক্রমণ করবো। খুব জমবে লড়াইটা। তোমরা লুকিয়ে জানতে এসেছে–আমরা কিভাবে যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছি। কোন দিক দিয়ে আমরা আক্রমণ করবো। কবে আক্রমণ করবো এসব তথ্য জানতেই প্যারাইসসা থেকে তোমরা এসেছে। রাজা আরকানিয়া সিংহাসনের এর চারধারে ঘুরে এসে সিংহাসনে বসলেন। মন্ত্রী, সেনাপতি, অমাত্যরাও তাই করলেন। সিংহাসনে বসে রাজা আরকানিয়া বললেন
–তোমাদের বন্দী করা হল।
–কিন্তু আমরা বিদেশি। অল্পদিন হল এখানে এসেছি। আমরা কাউকেই চিনি না এই দেশের কিছুই জানি না। তাছাড়া গুপ্তচরবৃত্তি করতে যাবো কেন? কী লাভ আমাদের? ফ্রান্সিস বলল।
সোনার চাকতি পাবে। তারপর জাহাজে চড়ে পালাবে। রাজা বললেন।
–আমাদের যথেষ্ট সোনার চাকতি আছে। আমরা এই কাজ করতে যাবো কেন? ফ্রান্সিস বলল।
রাজা আবার হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। মন্ত্রী, অমাত্যরাও উঠে দাঁড়াল। রাজা সেনাপতির দিকে আঙ্গুল বাড়িয়ে বললেন–কয়েদখানা। রাজা বসে পড়লেন আর। সবাই বসলেন। ফ্রান্সিস বুঝল এই পাগল রাজাকে কিছুই বোঝানো যাবে না। যা হচ্ছে তাই মেনে নিতে হবে।
ততক্ষণে সেনাপতি উঠে দাঁড়িয়েছে। প্রহরীদের ইঙ্গিত করল। চারজন প্রহরী এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের হাতে দড়ি বাঁধল। সবাই রাজসভা থেকে নেমে এল। প্রহরীরা ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল। রাজসভার লোকজন তাকিয়ে দেখল। বোঝাই যাচ্ছে বন্দীরা বিদেশি। কেউ ভেবে পেল না পাগল রাজা ওদের বন্দী করল কেন।
ফ্রান্সিসদের সদর রাস্তায় নিয়ে আসা হল। তারপর নিয়ে চলল কয়েদখানার দিকে। রাস্তার লোকজন ফ্রান্সিসদের তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল! এই বিদেশিদের বন্দী করা হয়েছে কেন?
ফ্রান্সিসদের একটা পাহাড়ের নিচে আনা হল। দেখা গেল–বেশ কিছু জায়গা নিয়ে কাঁটাতারের বেড়া। তার মধ্যে কাঠ পাথরের কয়েকটা বাড়ি। একটা বাড়ি বেশ বড়। ঘেরা জায়গা জুড়ে ফুলের গাছ। দু-একটা ফ্রান্সিসদের চেনা যেমন গোলাপ টিউলিপ সান ফ্লাওয়ার ক্রিসেনথেমাম। কিছু লোক ফুলগুলোর পরিচর্যা করছে। বোঝাই গেল কয়েদী ওরা।
সর্দার প্রহরী কাঁটাতারের পাশ দিয়ে হেঁটে দরজার কাছে এল। কার নাম ধরে ডাকল। তারপর কোমরে গোঁজা চাবিটা বের করল। ওদিকে একজন কয়েদী এগিয়ে এল। তারও হাতে চাবি। প্রথমে সর্দার প্রহরী বাইরের দিককার তালায় চাবি ঢোকাল। মোচড় দিল। মৃদু কট শব্দ তুলে তালাটা খুলে গেল। এবার ওপাশে কয়েদী এগিয়ে এসে চাবি দিয়ে ওপাশের তালা খুলে দিল। এইবার দরজা। সম্পূর্ণ খুলে গেল। সর্দারসহ সবাই ঢুকল। ভেতর দিককার দরজায় আবার তালা লাগাল কয়েদীটি। বাইরের তালায় চাবি ঢুকিয়ে বন্দী করল।
সর্দার প্রহরী ফ্রান্সিসকে বলল–এটাই কয়েদখানা। আমরা পাহারাদার। কয়েদখানার মাঝখানে এত ফুলের সমারোহ ফ্রান্সিসরা বুঝতেও পারে নি। প্রহরীরা বড় ঘরটায় চলে গেল। সর্দার ফ্রান্সিসকে বলল–ঐ যে ঘরগুলো দেখছো ওখানকার একটা ঘরে তোমাদের থাকতে হবে। যাও।
ফ্রান্সিসরা প্রথম ঘরটায় ঢুকল। দেখল কাঠ আর পাথর দিয়ে তৈরি ঘরটা বেশ বড়ই। দরজায় তালাচাবির ব্যাপার নেই। ঘরে কেউ নেই। চারদিকে মাটির ওপর ও শুকনো ঘাস আর পাতা দিয়ে তৈরি বিছানামত।
তখনই কয়েকজন কয়েদী ঢুকল। হাতে মাটি লেগে আছে। তাহলে এরাই ফুলগাছের পরিচর্যা করছিল? একজন এগিয়ে এল। বলল–তোমরা কয়েদী হলে আমাদের মত? কী করেছিলে তোমরা? চুরি না খুন? ফ্রান্সিস বলল–আমরা আমাদের মত? কী করে এই রাজ্যে এসেছিলাম জন্যেই তোমাদের
–কিন্তু তোমরা তো বিদেশি। বোধহয় ঐ জন্যেই তোমাদের কয়েদখানায় ঢোকানো হয়েছে।
