ফ্রান্সিস বলল–সরাইওয়ালাকে বল। ওর এই সরাইখানায় তো অশ্বারোহী মানুষও আসে। তাকে তো সেই ব্যবস্থা রাখতে হয়। নিজেকে বড়ই ক্লান্ত মনে হচ্ছে। একটু বিশ্রাম নেবো।
–ঠিক আছে। আমিই দেখছি। শাঙ্কো বলল।
শাঙ্কো বাইরের ঘরে এল। সরাইওয়ালার সামনে এসে দাঁড়াল। সরাইওয়ালা মাথা নিচু করে হিসেবটিসেব দেখছিল। এবার মুখ তুলল। শাঙ্কোকে দেখে বলল– কোন অসুবিধে হচ্ছে না তো?
–তা হচ্ছে। শাঙ্কো বলল।
-মানে? সরাইওয়ালা থমকে গেল।
–আমরা দুজন ঘোড়ায় চড়ে এসেছি। ঘোড়াদুটো এখনও দানাপানি পায় নি।
–ও–এই কথা। আসুন। সরাইওয়ালা বলল।
সরাইওয়ালা শাঙ্কোকে সরাইয়ের পেছনে নিয়ে এল। আবছা চাঁদের আলোয় দেখল–ঘোড়া দুটো একটা গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা।
–আপনাদের ঘোড়াকে দানাপানিও দেওয়া হয়েছে। সরাইওয়ালা বলল।
–অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। শাঙ্কো বলল।
–না। সে কি কথা। এটা তো আমার কর্তব্য। সরাইওয়ালা বলল। শাঙ্কো সরাইখানায় ঢুকল। নিজের জায়গায় বসে সরাইওয়ালা বলল–একটা কথা ছিল।
শাঙ্কো বলল–বলুন।
–ম-মানে–এখানকার নিয়ম–আগেভাগে দাম দিয়ে দেওয়া।
–কেন? পরে দিলে ক্ষতি কি? শাঙ্কো বলল।
–না-না। এ দেশে এটাই চলে। সরাইওয়ালা বলল।
শাঙ্কো বুঝল যুবকটি ঠিক কথাই বলেছিল। শাঙ্কো বলল–বেশ। বলুন কতদিতে হবে?
–আপনি কিভাবে দেবেন? সরাইওয়ালা বলল।
সোনার চাকতি দিয়ে। শাঙ্কো বলল।
–তাহলে একটা বড় চাকতি আর একটা ছোট চাকতি। সরাইওয়ালা বলল।
-বেশ। শাঙ্কো বলল। তারপর কোমরের ফেট্টিতে গোঁজা সোনার একটা চাকতি বের করল। সরাইওয়ালাকে দিল। সরাইওয়ালা হেসে বলল–ঘোড়ার দানাপানি, দেখাশুনো। আর আধখানা একটা ছোট চাকতি। শাঙ্কো তাই দিল।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। সরাইওয়ালার কথা বলল। দুজনেই হাসতে লাগল।
খাওয়ার ডাক পড়ল। গরম গরম মাংস, রুটি। খিদের জ্বালায় হাপুস হুপুস খেতে লাগল দুজনে। রুটি কম পড়ে গেল। দুজনে আর খেতে চাইল না। ফ্রান্সিসদের খাওয়া দেখে দুই পরিবেশনকারীর মুখ হাঁ।
খাওয়া শেষ। শাঙ্কো একজন পরিবেশনকারীকে বলল–আরো আট দশখানা রুটি খেতে পারতাম। পরিবেশনকারী চুপ করে শাঙ্কো আর ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন সকালে ফ্রান্সিস সরাইওয়ালার কাছে এল। বলল–আপনাকে একটা উপকার করতে হবে।
নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই—সরাইওয়ালা হেসে বলল।
–আমরা রাজবাড়ি যাচ্ছি। হেঁটেই যাবো। ঘোড়ায় চড়ে যাবো না। আপনি কি ঘোড়াদুটোকে কিছু দানাপানি খাওয়াবেন। ফ্রান্সিস বলল।
–নিশ্চয়। তবে আধখানা চাকতি দিতে হবে। সরাইওয়ালা বলল।
–ফিরে এসে দেব। শাঙ্কো বলল।
না। এখন দিতে হবে। সরাইওয়ালা বলল।
–বেশ। শাঙ্কো আধখানা চাকতি বের করে দিল।
রাজবাড়িতে আসতে অসুবিধে হল না। রাজবাড়ি বলে কথা। সবাই চেনে।
ফ্রান্সিসরা ভেতরে ঢুকল। এবার রাজসভার দরজার কাছে এল। ঢুকতে যাবে তখন একজন প্রহরী এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল। ফ্রান্সিস বলল–আমরা সেনাপতির সঙ্গে দেখা করবো।
-তোমরা বিদেশি। রাজসভায় ঢুকতে পারবে না। প্রহরী বলল।
রাজসভায় ঢুকবো না। সভার বাইরে সেনাপতির সঙ্গে কথা আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা যেতে পারবে না। প্রহরী বলল।
ফ্রান্সিস পিছিয়ে এল না।
বলল–আমাদের যেতেই হবে।
দাঁড়াও। প্রহরী বর্শা তুলে ফ্রান্সিসের মাথা লক্ষ্য করে চালাল। ফ্রান্সিস তৈরিই ছিল। মুহূর্তে মাথা পিছিয়ে নিল। বর্শার ঘা পড়ল ফ্রান্সিসের ডান বাহুতে। ফ্রান্সিস বাঁ বাহুটা ডান হাতে চেপে ধরল। ব্যথাটা ছড়াল সারা শরীরে। ফ্রান্সিস দাঁত চেপে ব্যথাটা সহ্য করল। তারপর তরোয়াল কোষমুক্ত করল। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিসের হাত চেপে ধরল। বলল–ফ্রান্সিস শান্ত হও। এখন লড়াইয়ে নামলে বাঁচবো না। দেখ আরো কয়েকজন প্রহরী ছুটে আসছে। আমাদের গায়ে মাথায় তরোয়াল চালাতে পারবে। আমাদের জীবন বিপন্ন হবে। শান্ত হও ফ্রান্সিস।
ফ্রান্সিস প্রহরীর মুখের দিকে তাকিয়েছিল। এবার দৃষ্টি সরাল। শাঙ্কোর দিকে একবার তাকিয়ে তরোয়াল কোমরে গুঁজল।
এইসবের জন্যে কিছু শব্দটব্দ হল। শাঙ্কো দেখল সভার অনেকগুলো লোক ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। বিচার চলায় বিপ্ন দেখা দিল। রাজা বিরক্ত হলেন। বিচার থামিয়ে প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে বলল–কী ব্যাপার? কী হচ্ছে ওখানে?
প্রহরী রাজার দিকে এগিয়ে গেল। মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে বলল– দুজন বিদেশি আপনাদের কাছে আসতে গিয়ে ধরা পড়েছে। ওরা বলছে– আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়।
–ওদের নিয়ে এসো। রাজা বললেন।
প্রহরী দরজার কাছে এল। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল–মহামান্য রাজা ডাকছেন। এসো।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো এগিয়ে গেল। রাজাকে মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে ফ্রান্সিস বলল–আমরা ভাইকিং। এখানে বেড়াতে এসেছি।
–এতদূর এলে?
–অন্য একটা কাজও আমরা করি। কোন দেশে গুপ্তধনের কথা জানতে পারলে গুপ্তধন খুঁজে উদ্ধার করি। গুপ্তধন সেই দেশের রাজাকে দিয়ে আমাদের জাহাজে চড়ে আবার অন্য দেশে যাই। এটাই আমাদের কাজ।
–কিন্তু গুপ্তধন উদ্ধার করে পালিয়েও তো যেতে পারো। রাজা বললেন।
–না। আমরা উদ্ধার করা গুপ্তধন নিয়ে পালিয়ে যাই না। যার ধনসম্পদ তাকে দিয়ে দিই। আমরা প্রতারণা করি না। ফ্রান্সিস বলল।
