-তোমার বাবার খবরও আমি নিতাম। ফ্রান্সিস বলল–যা গে–তুমি আমার ঘোড়া দুটোকে জল আর খাবার দিয়েছো?
-হা-হা-দিয়েছি। আপনাদের ঘোড়া দুটি এখন তরতাজা। তানাকা বলল।
–হু। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল।
রাজবাড়ির কাছে এসে ফ্রান্সিস বলল-চলো তোমাদের দোকানটা দেখবো।
চলুন।
বাজার এলাকায় এল ওরা। দোকানপাট পার হয়ে চলল। একটা বন্ধ দোকানের সামনে এসে তানাকা বলল–এটাই আমাদের দোকান। দোকানের দরজায় তালা লাগানো। ফ্রান্সিস বলল–তানাকা দোকানের চাবিটা কই?
–বাবার কাছে।
–তাহলে দোকান খুলবে কী করে?
–দোকানের পেছনে একটা ছোট্ট দরজা আছে। ওটার চাবি আমার কাছে। আছে। চলুন পেছনের দরজা দিয়েই ঢুকবো।
তিনজনে দোকানের পেছনে এল। ফ্রান্সিস দেখল একটা ছোট্ট দরজা। দরজায় তালা ঝুলছে।
–তানাকা ফ্রান্সিস বলল–এই দরজাটা বোধহয় বেশি ব্যবহার করা হয় না।
–হ্যাঁ। এই দরজা দিয়ে যাওয়া আসা খুব কমই হয়। তানাকা বলল।
দরজাটা খোলো। ফ্রান্সিস বলল।
তানাকা কোমর থেকে চাবির গোছা বের করল। খুঁজে খুঁজে পেছনের দরজাটার চাবিটা বের করল। তালায় চাবিটা ঢোকালো। মোচড় দিতেই দরজাটা খুলে গেল।
তিনজনে ঢুকল। ঘরটায় দুপুরের আলো আঁধারি। সামনের ঘরে এল। ফ্রান্সিস সিন্দুকটা দেখল। বেশ বড়। ভারি লোহায় তৈরি।
ফ্রান্সিস সিন্দুকটার চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখল। বলল—এই সিন্দুকের চাবিটা তো তোমার কাছে নেই।
–না। তানাকা মাথা এপাশ-ওপাশ করল।
–হুঁ। ফ্রান্সিস ভালো করে চারদিক তাকিয়ে দেখল।
–একটা কথা। তোমার এক বন্ধু আছে। সে নাকি তোমাকে বোকা বানিয়ে সিন্দুক থেকে হীরে চুরি করেছে। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ। আরোনাস যে একটা পাকা চোর আমি সেটা বুঝতে পারিনি। তানাকা বলল।
–তুমি ওর খোঁজ পেয়েছো? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। পেয়েছি। সান্তিয়াগোর কয়েদঘরে আমরা দুজনেই ছিলাম। কিন্তু কী করবো? হাতে তো কোন অস্ত্র নেই। তাই ওকে খুন করতে পারি নি। তানাকা বলল।
–বলো কি। খুন করতে চেয়েছিলে? শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। কিন্তু ভেবে দেখলাম ওকে মেরে ফেললে হীরেটার কোন খোঁজই পাওয়া যাবে না। এখানকার কয়েদঘর থেকে যেদিন ছাড়া পাবে সেইদিনই ওকে চেপে ধরবো হীরের খণ্ড কোথায় রেখেছিস্ বল্। আদায় করে ছাড়বো। তানাকা বলল।
-বুঝলাম। সে তো ওকে দেখতে পারলে। তার আগে আরোনাসের বিরুদ্ধে তুমি রাজার কাছে বিচার চাও। দ্যাখো কী হয়। আরোনাস তো কয়েদঘরেই আছে। প্রহরীদের ওকে খুঁজে বেড়াতে হবে না। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখি। তানাকা মাথা নাড়ল।
ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। পেছনের দরজা দিয়ে তিনজনে বেরিয়ে এল।
তানাকার বাড়িতে এল। ফ্রান্সিস তানাকাকে বলল–ঘোড়া দুটোকে একটু দানাপানির ব্যবস্থা করো।
–ভাববেন না। সে সব দেখা হবে। তানাকা বলল।
রাতে খেয়েদেয়ে ফ্রান্সিস, শাঙ্কো শুয়ে পড়ল।
শাঙ্কো বলল–তুমি ঠিক কী করতে চাইছো?
ফ্রান্সিস বলল–বাবার কোন কোন রাজবাড়িতে হীরের গয়না করার নির্দেশ পেয়েছিল সেই রাজবাড়িতে যাবো। রাণীমাদের কাছে হারিয়ে গেছে, চুরি হয়ে গেছে বলে কান্নাকাটি করে পার পেয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস বার্বার মানে তানাকার বাবা হীরের খণ্ড চুরি করেছে। এই ব্যাপারটা যাচাই করে দেখবো।
–এতে বার্বার তো আরো বিপদে পড়বে। শাঙ্কো বলল।
–উপায় কি। চোরের চোরামি তো মেনে নেওয়া যায় না। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। এখন তুমি সবদিক দেখে শুনে এগোও। শাঙ্কো বলল।
পরদিন। সকালের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো ঘোড়া ছোটাল সান্তিয়াগোর দিকে। পথে এক চাষীর বাড়িতে আশ্রয় নিল। খেল। তারপর আবার ঘোড়া ছোটাল।
শেষ বিকেলে সান্তিয়াগোতে পৌঁছল। ঘোড়ায় চড়ে যেতে যেতে ফ্রান্সিসরা দেখল বেশ বড় নগর। রাস্তাঘাটে বেশ লোকজনের ভিড়। যেতে যেতে একটা সরাইখানা দেখল। ঘোড়া থামাল। দুজনে ঘোড়া থেকে নামল। সরাইখানার দিকে চলল। সরাইওয়ালা হাসিমুখে বারবার বলতে লাগল–আসুন–আসুন।
–ঘোড়ার খাবার জল দানা পাওয়া যাবে তো? শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। কত লোক ঘোড়ায় চড়ে আসে। সব ব্যবস্থা আছে আমার। সরাইওয়ালা কাকে ডাকল। দেখা গেল একটি কিশোর এগিয়ে এল। সরাইওয়ালা বলল–ঘোড়া দুটো নিয়ে যা। দানাপানি খাওয়া। কিশোরটি বেশ অভ্যস্ত হাতে ঘোড়া দুটোকে পেছনে নিয়ে গেল।
ফ্রান্সিসরা সরাইখানায় ঢুকল। খিদে, ক্লান্তি।
পাটাতন পাতা। তার ওপর শুকনো ঘাসপাতার বিছানা। দুজনেই শুয়ে পড়ল। দুজনেই চুপ করে শুয়ে রইল।
কিছু পরে সেই তরুণ ছেলেটি দুটো কাঠের থালায় বিকেলের খাবার নিয়ে ঢুকল। ফ্রান্সিস ও শাঙ্কোর হাতে থালা দিয়ে চলে গেল।
ফ্রান্সিস খেতে খেতে বলল–আজকের দিনটা কাজে লাগাতে পারলাম না। কাল সকালে কাজে নামতে হবে। ওরা শুয়ে এসব কথাবার্তা বলছে তখন চার-পাঁচজন লোক চেঁচিয়ে কথা বলতে বলতে সরাইখানায় ঢুকল। প্রত্যেকের কোমরেই তরোয়াল গোঁজা। ওরা ফ্রান্সিসদের শুয়ে থাকা দেখল। একজন ঝুঁকে পড়ে ফ্রান্সিসদের দেখল। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–আরে–দুটোই বিদেশী ভূত। সবাই হৈ হৈ করে উঠল। ফ্রান্সিস বা শাঙ্কো কোন কথা বলল না। একজন এগিয়ে এসে বলল–তোরা এখানে শুয়ে আছিস কেন? এটা আমাদের জায়গা। ফ্রান্সিস বললশাঙ্কোসরে এস। দুজনেই বেশ সরে গেল। ওরা কেউ বসল, কেউ শুয়ে পড়ল। একজন ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল–তোদের দেশ কোথায় রে?
