নিশ্চয়ই। আসুন–আসুন। বয়স্ক মানুষটি দরজার পাল্লাটা আরো খুলে বলল।
তিনজনে ভেতরে ঢুকল। পাটাতনের ওপর শুকনো ঘাসপাতার বিছানা। তিনজনেই বসল। ততক্ষণে দুটো বাচ্চা ছেলেমেয়ে ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসদের দেখছে। ফ্রান্সিস একটা বাচ্চা মেয়েকে ডাকল। যা তোক একটু সাহস করে মেয়েটি ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফ্রান্সিস নাম জিজ্ঞেস করল। নাম বলল মেয়েটি। মেয়েটির ভাইও সাহস পেয়ে এগিয়ে এল।
তখনই বাড়ির কর্তী এল। বলল–আপনারা এসেছেন আমাদের বাড়িতে এটা অত্যন্ত আনন্দের। কিন্তু আমাদের তো দুপুরের খাওয়া হয়ে গেছে কাজেই আপনাদের জন্যে রাঁধতে হবে। কিছু দেরি হবে।
–কোন সমস্যা নেই। আমরা ততক্ষণ অপেক্ষা করবো। ফ্রান্সিস বলল। কত্রী ছেলেমেয়েকে নিয়ে চলে গেল।
ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো বলল–এতক্ষণ ঘোড়ায় চড়ে হাতপায়ে খিল ধরে গেছে। শাঙ্কোও শুয়ে পড়ল। তানাকা বসে রইল।
শেষ বিকেলে ফ্রান্সিসদের খেতে দেওয়া হল। তিনজনেই তখন ক্ষুধায় কাতর। পাতে খাবার পড়তেই খেয়ে নিল ফ্রান্সিসরা। খাওয়া শেষ। কী এসে বলল আপনাদের পেট ভরেছে তো?
–হ্যাঁ-হ্যাঁ। বোধহয় একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছি। শাঙ্কো বলল।
আবার ফ্রান্সিসরা ঘোড়ায় উঠল। ঘোড়া চলল তানাকার দিকে।
বেশ রাতে তানাকা পৌঁছল। তানাকা বলল–এই রাতে আর কোথায় যাবেন? আমাদের বাড়িতেই চলুন। ফ্রান্সিস বলল–বেশ চলো।
তানাকাদের বাড়ির সামনে এসে ওরা ঘোড়া থেকে নামল।
তানাকা এগিয়ে গেল। দরজায় ধাক্কা দিল। কয়েকবার ধাক্কা দেওয়া হল। একটি নারীকণ্ঠ শোনা গেল-আসছি।
একটু পরেই দরজা খুলে গেল। স্ত্রীলোকটির হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি। তানাকা বলল–মা-বাবা কেমন আছে?
–ভেতরে আয় বলছি। কিন্তু এঁরা কারা? তানাকার মা বলল।
–আমার বন্ধু। বিদেশি। রাতে খাবে থাকবে। তানাকা বলল।
–ও। আয়।
মোমবাতির আলোয় ছোট উঠোনমত পার হল। সামনে ঘর দেখল। তানাকা ঘরের দরজা খুলল। মার হাত থেকে মোমবাতিটা নিয়ে উঁচু পাটাতনে রাখল। ফ্রান্সিস শাঙ্কো কাঠের পাটাতনে বসল। তানাকা বলল–আপনাদের খাওয়ার এ ব্যবস্থা দেখি। ঘোড়াদুটোকেও তো খাওয়াতে হবে। তানাকা বেরিয়ে গেল।
এবার ফ্রান্সিস নিম্নস্বরে বলল শাঙ্কো–একটা ব্যাপারে আমার সন্দেহ যাচ্ছে না।
–কোন ব্যাপারে? শাঙ্কো বলল।
–তানাকার বাবা মনে হয় সৎ ব্যবসায়ী নয়। তবে এটা এখনো আমার অনুমান। এখন কয়েকটা দেশে যেতে হবে। বাবার মানে তানাকার বাবা আর কোন কোন রাজ্য থেকে হীরের গয়না গড়িয়ে দেবার নির্দেশ পেয়েছিলেন এটা জানলেই সিদ্ধান্তে আসা যাবে।
তানাকা ঘরে ঢুকল। বলল–মা রান্না বসিয়ে দিয়েছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রান্না হয়ে যাবে।
ফ্রান্সিস বলল–তানাকা তোমাদের দোকান তো বাজার এলাকায়।
–হ্যাঁ।
কালকে একবার দেখবো। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ তো। একটু থেমে তানাকা বলল–এই তানাকা রাজ্যের রাজা বাবাকে বন্দী করে রেখেছে। রাণিমা বলেছেন–যেখান থেকে তোক হীরে জোগাড় করে গয়না গড়িয়ে দিতে হবে। তানাকা বলল।
কিন্তু তোমার বাবাকে মুক্তি না দিলে উনি কী করে গয়না গড়বেন? ফ্রান্সিস বলল।
–সেসব কথা বলতেই কাল রাজসভায় যাবো। তানাকা বলল।
–বেশ। আমরাও যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনারা কেন যাবেন? তানাকা জানতে চাইল।
–সেনাপতির সঙ্গে কিছু কথা আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–ও। তানাকা মুখে শব্দ করল।
পরের দিন সকালে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো রাজসভায় গেল।
-বাবার মুক্তির ব্যাপারে কিছু বলবেন না? তানাকা বলল।
–না। আগেই নয়। পরে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো রাজসভায় এল। বেশ ভিড়। রাণী একটা কাঠের সিংহাসনে বসে আছেন। বিচার চলছে। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস সেনাপতিকে আগেই দেখেছে। তক্কে তক্কে রইল কখন সেনাপতি রাজসভার বাইরে আসে।
কিছু পরেই হঠাৎ সেনাপতি রাজসভার বাইরে এলেন। সৈন্যাবাসের দিকে চললেন। ফ্রান্সিস প্রায় ছুটে সেনাপতির কাছে এল। সেনাপতি দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন–কী ব্যাপার।
মাননীয় সেনাপতি–আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।
–তোমাদের দেখে তো মনে হচ্ছে-বিদেশি। সেনাপতি বলল।
–হ্যাঁ। আমরা ভাইকিং। একটা কথা জানতে এলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো। সেনাপতি বলল।
–বার্বার যিনি রাণীর গয়নাগাঁটি গড়েন তিনি রাণীর পাঠানো হীরে হারিয়ে ফেলেছেন। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। কঠোর শাস্তি হবে বার্বারের। সেনাপতি বলল।
–আচ্ছা বার্বার কি এর আগেও হীরের খণ্ড হারিয়েছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। আবার হারানো রাণীমা খুব রেগে গেছেন। সেনাপতি বলল।
–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।
তখনই পেছন থেকে তানাকা ছুটে এল। সেনাপতিকে বলল–মাননীয় সেনাপতি। বার্বার আমার বাবা। তাকে কি মুক্তি দেওয়া হবে না?
–এখন না। কিছু শাস্তি ভোগ করুক আগে। সেনাপতি বললেন।
–বাবা হীরেটা হারিয়ে ফেলেছেন। তানাকা বলল।
–ওসব বলে পার পাওয়া যাবে না। রাণিমা রেগে আগুন হয়ে আছেন। বাবার যে হীরের খণ্ডটা কিভাবে হারাল–এটাই আমরা বুঝতে পারছি না।
সেনাপতি আর কিছু বললেন না। সৈন্যাবাসের দিকে হাঁটতে লাগলেন। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে পড়ল। তিনজনেই ফিরে আসছে তখন ফ্রান্সিস বলল–তানাকা তোমাকে আসতে মানা করেছিলাম।
–বাবার জন্যে আমার চিন্তা হয় না? আমি চুপচাপ বসে থাকতে পারি? তানাকা বলল।
