উউ গেলাম–পা মাড়িয়ে দিয়েছে–ও হোহো–। ফ্রান্সিস ভালো করে তাকিয়ে দেখলো–কোণার দিকে একটা লোক পায়ে হাত বুলোচ্ছে আর চ্যাঁচাচ্ছে। এই লোকটা তো আমাদের দলের নয়, ফ্রান্সিস ভাবলো। তাহলে এই লোকটা আগে থেকেই শেকল বাঁধা ছিল। পুরানো কয়েদী। হাতে শেকল আটকানো; ও এগিয়ে যেতে পারল না। ঐ লোকটার পাশেই ছিল হ্যারি। লোকটার পায়ে হাঁটুতে হাত বুলোতে বুলোতে বললো–খুব লেগেছে? অন্ধকারে দেখতে পাইনি।
লোকটা এতক্ষণে শান্ত হলো। দু’একবার উ–হুঁ-হুঁ করে চুপ করলো।
হ্যারি জিজ্ঞেস করল–তুমি ভাই কদ্দিন এখানে আছো?
লোকটা বলল–এখানে কি দিন-রাত বোঝা যায়, যে দিন-মাস-বছর গুণবো?
এবার ফ্রান্সিস লোকটির দিকে ভালো করে তাকাল। দেখলো, লোকটার মাথা ভর্তি লম্বা লম্বা কঁচাপাকা চুল। মুখে কঁচাপাকা দাড়ি গোঁফের জঙ্গল। গায়ে শতছিন্ন একটা জামা। পরণে ভেঁড়া পায়জামা। প্রায় বুড়ো এই মানুষটা ক্রীতদাসের হাটে হয়তো ভালো দামে বিকোবে না। তাই হয়তো একে এখনও কয়েদঘরে রেখে দিয়েছে, মরে গেলে সমুদ্রে ফেলে দেবে।
লোকটার জন্যে ফ্রান্সিসের সহানুভূতি হলো। কে জানে কতদিন এই পশুর জীবন কাটাচ্ছে লোকটা? ও হ্যারিকে বলল–হ্যারি, জিজ্ঞেস করতো–ওর নাম কি? হ্যারি জিজ্ঞেস করতে, লোকটা ফ্যাসফেসে গলায় বলল–ফ্রেদারিকো।
–তুমি কি পর্তুগীজ? হ্যারি জিজ্ঞেস করলো।
–না স্প্যানিশ, তবে পর্তুগীজদের সঙ্গে থেকে-থেকে ওদের ভাষাতেই কথা বলা অভ্যেস হয়ে গেছে।
কথাটা বলে ফ্রেদারিকো কোমর থেকে কী বের করে মুখে দিয়ে চিবোতে লাগল। হ্যারি জিজ্ঞেস করল–কি চিবুচ্ছো?
–তামাকপাতা।
–এখানে তামাকপাতা পেলে কি করে?
ফ্রেদারিকো খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠল। মাথায় আঙুল ঠুকে বললো–বুদ্ধি-টুদ্ধি খরচ করলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
তারপর আস্তে-আস্তে বললো–ঐ যে পাহারাদারটাকে দেখছো পাথরের মত মুখ, মনে হয় দয়া-মায়া বলে কোন জিনিস ওর মনে নেই।
–ওর মুখ দেখে তো তাই মনে হয়।
–ঠিক। কিন্তু ওরও বৌ-ছেলেমেয়ে আছে। ওর মনেও স্নেহ-ভালোবাসা আছে। ওর নাম বেঞ্জামিন। ও মাঝে মাঝে হাত দেখায়। একবার একদল জিপসীদের সঙ্গে আমি বেশ কিছুদিন ছিলাম। ভালই হাত দেখতে শিখেছিলাম। বেঞ্জামিন হাত দেখায়, আর আমি ওকে ওর বৌ-ছেলেমেদের খবরাখবর বলে দিই। ব্যাস, বেঞ্জামিন এতেই খুশি।
ফ্রেদারিকো একটু থেমে বললো একবার লিসবনের কাছে দিয়ে এই ক্যারাভেলটা যাচ্ছিল, আমি ওর হাত দেখে বললাম–তুমি শিগগীর বাড়ি যাও, তোমার ছেলের মরণাপন্ন অসুখ।
ও লা ব্রুশের কাছে ছুটি নিয়ে লিসবন ওর বাড়িতে ছুটে গেল। দেখল, সত্যিই ছেলেটি মারা যায় যায়। চিকিৎসা-টিকিৎসার পর ছেলেটি সুস্থ হ’ল। বেঞ্জামিন আবার ফিরে এল। ব্যস্। তারপর ওর কাছে আমার কদর বেড়ে গেল। যা চাই, তাই এনে দেয়। লুকিয়ে আমার জন্য মাংস-টাংস নিয়ে আসে।
–তাহলে তো ওর সাহায্যে তুমি পালাতেও পারো।
–তা’ পারি। কিন্তু লা ব্রুশ মাঝে-মাঝেই আমার কাছে আসে। প্রতিদিন আমার খোঁজ করে। যদি কোনদিন এসে দেখে আমি পালিয়েছি, প্রথমেই বেঞ্জামিনের গর্দান যাবে। অন্য পাহারাদার যে দু’জন আছে, তাদের হাঙরের মুখে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।
–লা ব্রুশ তোমার কাছে আসে কেন? হ্যারি জানতে চাইলো।
–সে অনেক ব্যাপার!
ফ্রেদারিকো আর কোন কথা বলল না। চোখ বন্ধ করে তামাকপাতা চিবুতে লাগল।
এক সময় হ্যারি লক্ষ্য করল ফ্রেদারিকো গলায় লকেটের মত ঝোলানো একটা কী যেন বের করল। তারপর মুখের কাছে ধরে দাঁত-মুখ খিচোতে লাগল। হ্যারি দেখলো, ওটা একটা আয়নার ভাঙা টুকরো। গলার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা। একদিকের ভাঙা মুখটা ছুঁচলো। ফ্রেদারিকো আয়নাটার মুখ দেখছে আর ভেংচি কাটছে। ওর কান্ড দেখে হ্যারির হাসি পেলো। বললো–এই অন্ধকারে মুখ দেখতে পাচ্ছো?
–পারছি বৈ কি! ফ্রেদারিকো হাসলো–কিছুদিন থাকো, বেড়ালেরমত অন্ধকারে, তুমিও দেখতে পাবে। তখন আর আলো সহ্য হবে না। আলোর সামনে চোখ জ্বালা বা করবে। চোখ জলে ভরে যাবে।
হ্যারি ভাবল, সত্যিই দীর্ঘদিন এভাবে অন্ধকার কয়েদ ঘরে পড়ে থাকলে বাইরের আকাশ-মাটি-জলের কথা ভুলেই যেতে হবে।
ফ্রান্সিসদের কয়েদ ঘরের বন্দীজীবন কাটলো কয়েকদিন। দু’বেলা খাওয়া জুটল পোড়া পাউরুটি, আর আলু-মুলো এবং আনাজ মেশানো ঝোল। বেঞ্জামিনই ওদের খাবার দাবার জল দেয়। বেঞ্জামিনকে আরো দু’জন পাহারাদার সাহায্য করে। ফ্রেদারিকো কিন্তু মাংস, সামুদ্রিক মাছের ঝোল, এসব খেতে পায়। ওর বেলা বেশ ভালো ফুলকো রুটি। হ্যারি বুঝল, ফ্রেদারিকো বেঞ্জামিনের হাত দেখেই বেশ সুবিধে করে নিয়েছে।
ফ্রান্সিসদের কয়েদ ঘরের জীবন এভাবেই কাটতে লাগল। দিন যায়, রাত যায়। দিনরাতের পার্থক্যও ওরা ভালোভাবে বুঝতে পারে না! দরজার পেছনে অন্ধকার না থাকলে বোঝে দিন, আর ওদিকটা অন্ধকার হলে বোঝে রাত্রি। ফ্রেদারিকোর সঙ্গে হ্যারির আর কোন কথাবার্তা হয়নি, ফ্রেদারিকো শুধু তামাক পাতা চিবোয় আর ঝিমোয়। আর মাঝে-মাঝে আয়নার ভাঙা টুকরোটা বের করে মুখ দেখে। মুখ ভ্যাংচায়। আপন মনেই বিড়বিড় করে কী বলে আর ঝিমোয়।
***
একদিন। তখন দিনই হবে। কারণ গরাদ দেওয়া দরজার ওপাশে আলোর আভাস ছিল। হঠাৎ বেঞ্জামিন আর দু’জন পাহারাদারকে খুব সন্ত্রস্ত মনে হ’লো। বেঞ্জামিন এক সময় ফ্রেদারিকোর কানের কাছে মুখ নিয়ে কী কী সব ফিফিস্ করে বলে গেল।
