বলল–কাকে চাই?
–তানাকায় আপনাদের কোন আত্মীয় থাকে? আমি জানতে চাইলাম।
–হ্যাঁ। ভিক্টর বলল।
–তাহলে আরোনাস তো আপনার আত্মীয়। আমি বললাম।
–হ্যাঁ। কেন বলুন তো। ভিক্টর বলল।
–পরে বলছি। আরোনাস আপনাদের কাছে বেড়াতে এসেছে। আমি বললাম।
–হ্যাঁ। ভিক্টর বলল।
–আরোনাসকে ডেকে দিন। আমি বললাম।
ভিক্টর একটা ঘরের দিকে যেতে যেতে ডাকল–আরোনাস–আরোনাস। কোন উত্তর নেই। একটা ঘরের দরজা দিয়ে মুখ গলিয়ে দেখে ফিরে দাঁড়াল। বলল– আরোনাসকে একটু আগেও আমি দেখে গেছি। ও কোথাও গেছে বোধহয়। ও নেই। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এতদূর এসে সব আশার শেষ? এটাই ভাবলাম। তবু জিজ্ঞেস করলাম–আরোনাস কোথায় যেতে পারে?
–যায় তো কয়েকটা জায়গায়। কিন্তু ব্যাপারটা কী বলুন তো। ভিক্টর বলল।
আমি আস্তে আস্তে সব কথা বললাম। তারপর বললাম–বাবার সাংঘাতিক বিপদের কথা।
আপনি কি নিশ্চিত যে আরোনাসই ঐ হীরের খণ্ডটা চুরি করেছে। ভিক্টর বলল।
–হ্যাঁ। নিশ্চিত। আপনারা জানেন না আরোনাস কত বড় চোর। আমি বললাম।
–না না এ বিশ্বাস করা যায় না। ভিক্টর বলল।
–যাক গে–আপনার বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে আমি ভাবছি না। আমি আরোনাসকে পেতে চাই। কোথায় পাবো ওকে? আমি বললাম।
–তা কী করে বলি। ভিক্টর বলল।
তবু দু-একটা জায়গা বলুন। আমি বললাম।
–গীর্জার পেছনে একটা শরীরচর্চার ঘর আছে। ওখানে ও যায়। ভিক্টর বলল।
–বেশ। আর একটা? আমি বললাম।
–মোড়ের মাথায় রুটির দোকান আছে। সেখানে ওর দু’একজন বন্ধু আছে। ভিক্টর বলল।
–ঠিক আছে। আমি বললাম।
আমি গীর্জার পেছনে এলাম। একটা ঘরও পেলাম। দেখি বেশ কয়েকজন যুবক ঘরে বাইরে দাঁড়িয়ে বসে আছে। আমি তাদের ওপর চোখ বুলিয়ে নিলাম। আরোনাস নেই। তাদের কাছে আমি গেলাম। বললাম–আপনারা আরোনাসকে দেখেছেন?
এসেছিল। চলে গেছে। একজন বলল। আমার কেমন সন্দেহ হল ওরা মিথ্যে কথা বলছে। তাহলে আরোনাস জানতে পেরেছে যে আমি এসেছি। চললাম রুটি তৈরির কারখানার দিকে। পেলাম দোকানটা।
মালিক একটা উঁচু পাটাতনে বসে। কয়েকজন যুবকও বসে আছে। ওদের একবার দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম–আরোনাস কি এখানে এসেছিল?
–না। ও আসে নি। একজন বলল। আর একজন বলল–কী ব্যাপার বলুন তো? ওকে খুঁজছেন কেন?
-ও আমার বন্ধু ছিল। আমি বললাম।
বন্ধু ছিল বলছেন। এখন কি বন্ধু নয়? একজন বলল।
–না। ও চোর। বিশ্বাসঘাতক। বললাম। কথা না বাড়িয়ে চলে এলাম।
তখন বিকেল হয়ে গেছে। সারাদিন না খেয়ে আছি। এবার ঠিক করলাম– ওকে পিসির বাড়িতেই ধরবো।
একটা সরাইখানায় ঢুকলাম। রূপার মুদ্রা দিয়ে খেলাম। সরাইখানায় শুয়ে রইলাম। ঠিক করলাম–একটু রাতে পিসির বাড়ি যাবো। এখন বিশ্রাম করি। শুয়ে রইলাম। দুচোখ জ্বালা করছে। ঘুম আসবে না। চুপ করে শুয়ে রইলাম। ভাবলাম একটু বেশি রাতে যেতে হবে।
রাতের খাওয়া হল। একটু শুয়ে থেকে উঠলাম। আরোনাসের পিসির বাড়ির এ দিকে চললাম।
অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে ওর পিসির বাড়ি এলাম। দরজায় আঙ্গুল ঠুকলাম। ভিতরে শব্দ হল। তারপর চুপ। এবার জোরে আঙ্গুল ঠুকলাম। সশব্দে দরজা খুলে গেল। কে আমার বুকে জোরে ধাক্কা দিল। আমি ছিটকে মাটিতে পড়লাম। এ নিশ্চয়ই আরোনাস। জ্যোৎস্নার মৃদু আলোতে দেখলাম আরোনাস ছুটে পালাচ্ছে। আমিও ওর পেছনে ছুটলাম।
ছুটতে ছুটতে চারটে রাস্তার মোড়ে এলাম। এবার ডাকলাম–আরোনাস দাঁড়া। আরোনাস দাঁড়াল না। ছুটতে লাগল। এবার আমি প্রাণপণে দৌড়ে আরোনাসের ঠিক পেছনে এলাম। এক লাফ দিয়ে ওকে ধরে ফেললাম। ঘাড়ে পিঠে জোরে দুই ধাক্কায় আরোনাসকে রাস্তায় ফেলে দিলাম। ও চিৎ হয়ে গেল। আমি ওর গলা চেপে ধরতে গেলাম। বললাম হীরে ফেরত দে। ও এক হ্যাঁচকা টানে কোমর থেকে ছোরা বের করল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। সাবধান হলাম।
তখনই দুই পাহারাদার ছুটে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–এই লোকটি আমাকে খুন করতে চাইছে। একে ধরুন। একজন পাহারাদার আরোনাসের হাতে ধরা ছোরা দিতে ইঙ্গিত করল। আরোনাস ছোরা দিল। এক পাহারাদার বলল– দুজনেই চলল।
তোমাদের কয়েদখানায় ঢোকানো হবে।
–আমি কোন দোষ করি নি। ও আরোনাস আমার হীরে চুরি করেছে। আমি হীরেটা ফেরত চাই। আমি বললাম।
–ঠিক আছে। কালকে সব শোনা যাবে। বিচারও হবে। এখন দুজনেই চল। পাহারাদার কোমর থেকে দড়ি বের করল।
তানাকা থামল। তারপর বলল–বুঝলাম আমি আরোনাসের কাছ থেকে হীরেটা উদ্ধার করতে পারব না। পাহারাদারদের কিছুতেই বোঝাতে পারবো না যে আমার হীরেটা ওই চুরি করেছে। ওটা আদায় করবার জন্যেই ওর পেছনে ছুটে এসেছি। ওকে ধরেছি। পাহারাদার কোন কথা বলল না।
তখন ভোর হয়ে এসেছে। সবাই কয়েদঘরে এলাম। পাথরের টানা বাড়ি একটা। সেই বাড়ির একটা ঘরের সামনে আমরা এলাম। লোহার দরজা একজন প্রহরী খুলে দিল। ভেতরে ঢুকলাম আমরা দুজন।
মশালের আলোয় দেখলাম শক্ত পাথরে গাঁথা দেয়াল মেঝে। দেখলাম আরও তিন-চারজন বন্দী রয়েছে। শুকনো লম্বা ঘাসের বিছানা। বিছানায় শুয়ে পড়লাম। রাত জেগেছি মাথা টন্ টন্ করছে। তানাকা বলতে লাগল–
সকাল হল। দুজন প্রহরী সকালের খাবার নিয়ে ঢুকল। প্রত্যেকের হাতে বড় পাতা দিল। দু’টো করে পোড়া রুটি আর দু-তিনরকম আনাজপত্রের ঝোল। ভীষণ খিদে। অল্পক্ষণেই খেয়ে ফেলে পাতা এগিয়ে ধরলাম। বললাম–আরো দাও। প্রহরী বলল–আর একবার পাবে। ব্যাস্।
