–কিন্তু বাবা বোধহয় রাজি হবেন না। আমি বললাম।
–আরে বাবা দিন পনেরোর মামলা। দাদা দিন পনেরো পরে চলে যাবে। তখন নিয়ে যাবে। আরোনাস বলল।
–ঠিক আছে। কিন্তু পনেরো দিনের মধ্যে নিতে হবে। আমি বললাম।
নিশ্চয়ই। এখন আমি বলছিলাম তুই তোর বাবাকে এই নিয়ে কিছু বলবি না। আরোনাস বলল।
-বেশ। আমি রাজি হয়ে গেলাম।
–তাহলে সামনের রোববার দুপুরে তুই চাবিটা নিয়ে আয়। হীরেটা দোকানের সিন্দুকে রেখে দেব। চাবি আগের জায়গায় রেখে আসবি। এইজন্যে আমি তোকে একটা স্বর্ণমুদ্রা দেব। আরোনাস বলল।
–বেশ। আমি বললাম।
তবে পরশু রোববার। দুপুরের সময় তোদের দোকানের সামনে আমি দাঁড়িয়ে থাকবো। আরোনাস বলল।
–বেশ। স্বর্ণমুদ্রাটা? আমি বললাম।
–কাজ সেরে দেব। আরোনাস বলল।
তানাকা থামল। তারপর আবার বলতে লাগল–সেই রোববার চাবি নিয়ে এলাম। দোকান খুলে সিন্দুকের কাছে গেলাম। সিন্দুক খুললাম। আরোনাস বলল ওপরের জানলাটা খুলে দে। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। আমি জানলা খুললাম। আরোনাস বলল-জানালা বন্ধ করে দে। কাজ হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করলাম হীরেটা কত বড়? আমি জানতে চাইলাম।
-বেশি বড় না। তোদের যেটা আছে–তেমনি বড়। আরোনাস বলল।
দুজনে দোকানের বাইরে এলাম।
–তারপর? শাঙ্কো বলল।
–কী আর বলবো। তানাকার রাজা মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দেশে যান। ঐদিনের পরেই খবর পেলাম–রাজা ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে এসেছেন। শোভাযাত্রা করে রাজা প্রাসাদে ফিরলেন।
কয়েকদিন পরে সেনাপতি ঘোড়ায় চড়ে এলেন। দোকানে ঢুকলেন। বাবা উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে সেনাপতিকে সম্মান জানালেন। সেনাপতি বললেন– রাণিমা আগে দেওয়া হীরের খণ্ডটা থেকে গয়না করতে বলেছেন। আপনাকে কাল রাজপ্রাসাদে যেতে হবে। রাণিমা নকশা তৈরি করেছেন। সেরকম অলঙ্কারই আপনাকে করতে হবে। বাবা মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন–ঠিক আছে।
সেনাপতি কোমর বন্ধনী থেকে একটা গভীর নীল রঙের রুমাল বের করলেন। রুমালের ভাঁজ খুলে বললেন–এই হীরেটা নিন। রেখে দিন। রাণিমা পরে কিভাবে তৈরি করবেন তার নক্শা দেবেন।
বাবা আবার বললেন–ঠিক আছে।
সেনাপতি চলে গেলেন। বাবা সিন্দুক খুলে হীরেটা রেখে দিলেন। সিন্দুকটা বন্ধ করলেন। তখনও আমরা বুঝিনি আমাদের কী সর্বনাশ হয়ে গেছে।
-তারপর? শাঙ্কো বলল।
বাবা পরদিন রাজবাড়িতে গেলেন। বড় দরজার এক প্রহরী বাবাকে দেখে বলল–আপনিই তো মণিকার?
–হ্যাঁ।
রাণিমার সঙ্গে দেখা করতে চলুন। প্রহরী বাবাকে নিয়ে অন্দরমহলের কাছে নিয়ে এল। অন্দরমহলের প্রহরী বাবাকে অপেক্ষা করতে বলে চলে গেল। একটু পরে ফিরে এসে বাবাকে ভেতরে নিয়ে গেল। বাবা তো অবাক হয়ে চারদিকের সাজসজ্জা দেখছিলেন। একটা ঘরে দেখলেন রাণিমা একটা সিংহমুখওয়ালা আসনে বসে আছেন। বাবাকে বসতে বললেন। বাবা একটা ছোট আসনে বসলেন। রাণিমা একজন। পরিচারিকাকে বললেননকশাটা নিয়ে আয় তো। পরিচারিকা একটা পার্চমেন্ট কাগজ নিয়ে এল। কাগজটা বাবার হাতে দিয়ে বললেন-দেখুন নকশাটা কেমন করেছি। বাবা দেখে টেখে বললেন কিছু এদিক-ওদিক করে হীরে দিয়ে করা যাবে।
–নকশা নিয়ে যান। এই নকশামত করবেন।
বাবা ফিরে এলেন। তখন দুপুর। আমি দোকান খুলে বসে আছি। বাবা এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে চাবি বের করে সিন্দুকটা খুললেন। চিৎকার করে বলে উঠলেন– রাণিমার হীরেটা কোথায়? আমি লাফিয়ে উঠলাম। ছুটে এসে দেখি আগের হীরের খণ্ডটা নেই। সেখানে একটা কাঁচের ডেলা। হাতে নিয়ে দেখে বুঝলাম কাঁচের ডেলা। বাবা তখনও চিৎকার করছেন–সর্বনাশ হয়ে গেল। রাণিমা, আমাকে ফাঁসি দেবেন। তার হীরের খণ্ডটা চুরি হয়ে গেছে।
আমি সবই বুঝলাম তখন। আরোনাসের হাত সাফাই–কোন সন্দেহ নেই। আমি বললাম–বাবা–আমি দেখছি। তুমি বাড়ি যাও। খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করো।
আমি দোকানের বাইরে এলাম। প্রায় ছুটে এলাম আরোনাসের বাড়িতে। দরজা বন্ধ। দরজায় জোরে টোকা দিলাম। এক বুড়ি হয়তো আরোনাসের মা এসে দাঁড়াল। আমি হাঁপাচ্ছি তখন। বললাম–আরোনাস কোথায়?
–তুমি কে? আরোনাসের মা বলল।
–সেসব পরে বলছি। আরোনাস কোথায় বলুন। আমি বললাম।
–আরোনাস সান্তিয়াগোতে–ওর পিসির বাড়ি বেড়াতে গেছে।
–সেই পিসির বাড়ি কোথায়? আমি জানতে চাইলাম।
–তা তো ঠিক বলতে পারবো না। আরোনাসের মা বলল।
–আপনাদের আত্মীয় তার ঠিকানা জানেন না? আমি বললাম।
–আহা–কী যেন নাম গীর্জাটার–হ্যাঁ মনে পড়েছে– নর্থ গীর্জার কাছে।
–পিসেমশাইর নাম? আমি জানতে চাইলাম।
ভিক্টর। আরোনাসের মা বলল।
–ঠিক আছে। আমি বললাম।
আমি আর বাড়ি ফিরলাম না। কোমরের ফেট্টি থেকে বেশ কয়েকটা রুপোর মুদ্রা পেলাম। এই সম্বল করে সান্তিয়াগোর দিকে চললাম।
সন্ধে হল। আমি চললাম। রাতে এক সরাইখানায় কিছু খেয়ে আবার হাঁটতে লাগলাম। সারারাত হাঁটলাম। পরদিন দুপুরবেলা সান্তিয়াগো পৌঁছলাম। খুঁজে খুঁজে নর্থ গীর্জার সামনে এলাম। কাছাকাছি একটা দর্জির দোকান পেলাম। দর্জিকে জিজ্ঞেস করলাম ভিক্টরের বাড়ি কোনটা? সে আঙ্গুল দিয়ে একটা বাড়ি দেখাল। সেই বাড়ির দরজার কাছে এসে দাঁড়ালাম। দরজায় টোকা দিলাম। ভেতরে কোন সাড়া নেই। আবার আঙ্গুল ঠুকলাম। একটু জোরে। শব্দ করে দরজা খুলে গেল। এক মধ্যবয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে। বুঝলাম–ভিক্টর।
