এক দুপুরে আরোনাস একটু আগেই আমাকে দোকানের বাইরে নিয়ে এল। বলল–চন্আজকে মন্ত্রীমশাইর বাড়ি যাবো।
–তোকে নেমন্তন্ন করেছে? আমি বললাম।
না না। আমি নিজে থেকেই যাচ্ছি। আরোনাস বলল।
কী জন্যে যাচ্ছিস? আমি বললাম।
–আছে–আছে। চল–দেখবি। আরোনাস শুধু এই কথাটাই বলল।
দুজনে মন্ত্রীমশাই-র বেশ বড় বাড়িটার সামনে এলাম। চারদিকে পাথরের দেয়াল। খুব উঁচু নয়। আরোনাস বলল–দেওয়াল পার হতে পারবি তো?
-হা হা। আমি বললাম। কিন্তু এভাবে না বলে কয়ে
উপায় নেই। বিনা কারণে কেউ তোকে এমনি এমনি থলিভর্তি সোনার চাকতি দিয়ে যাবে না। আরোনাস বলল।
–ঠিক আছে। পার হ! আমি বললাম।
দুজনে দেওয়াল পার হলাম। একটা বড় বাগান। ফলফুলের গাছ। আরোনাসের পেছনে পেছনে মাথা নিচু করে একটা বড় আপেল গাছের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি তখনও জানি না ওখানে কেন দাঁড়িয়ে গেলাম। ওখান থেকে কাঁচের জানালা দিয়ে ঘরটা মোটামুটি দেখা যাচ্ছে।
দাঁড়িয়ে আছি। কিছু পরে রাজার এক পেয়াদা এল। দরজায় শব্দ করল। মন্ত্রীমশাই নিজেই দরজা খুলে দিলেন। বাড়ির পাহারাদার বোধহয় অন্য কাজে গেছে। পেয়াদা কোমর থেকে একটা ভেলভেট কাপড়ের থলিমত বের করল। মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে মন্ত্রীমশাইর হাতে দিল। আরোনাস ফিস্ ফিস্ করে বলল-পেছনে চ। জলদি।
দুজনে দ্রুতপায়ে বাড়ির পেছনে এলাম। একটা মোটাগাছের আড়াল থেকে দেখলাম একটা ঘর। শোবার ঘর। মন্ত্রীমশাই সেই ঘরে এলেন। একটা আবলুশ কাঠের আলমারি। মন্ত্রীমশাই আলমারির দরজাটা খুললেন। থলিটা পরের তাকে রাখলেন। তারপর চলে গেলেন। আলমারিটা বন্ধও করলেন না। বোধহয় পরে থলিটা কোথাও রাখবেন।
এবার আরোনাস ফিসফিস্ করে বলল–তুই পেছনের গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়া। দাঁড়িয়েই থাকবি। আমি কথামত গেট-এ গিয়ে দাঁড়ালাম। শুনলাম দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ। একটি কাজের স্ত্রীলোক দরজা খুলে বেরিয়ে এল। আরোনাস আমাকে দেখিয়ে কী বলল। স্ত্রীলোকটি আমার কাছে আসতে লাগল। তখনই দেখলাম আরোনাস খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে দ্রুত ঢুকে পড়ল। আর অল্প সময়ের মধ্যে বেরিয়ে এল। স্ত্রীলোকটি তখন আমার সামনে আসছে। আরোনাস মুহূর্তের মধ্যে শোবার ঘরের দরজা ভেজিয়ে ছুটে এল আমাদের কাছে। স্ত্রীলোকটি তখন আমাকে জিজ্ঞেস করছে–এই দরজা দিয়ে এলেন কেন? বড় দরজায় যান। আরোনাস ও ছুটে এল। চাপা গলায় বলল–পালা। ছোট। আমিও আরোনাসের পেছনে পেছনে ছুটলাম। কাজের স্ত্রীলোকটি হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
রাস্তায় নেমেই আরোনাস বলল–এবার স্বাভাবিকভাবে হাঁট। সব হিসেবমত করেছি। আর ভয়ের কিছু নেই।
হাঁটতে হাঁটতে দুজনে আরোনাসের বাড়ি এলাম। আরোনাস কী একটা লোহার মত লম্বা কাঠি বের করল। দরজাটার ফাঁকে ঢোকাল। দরজা খুলে গেল। দুজনে ভেতরে ঢুকলাম। তখনও আমরা হাঁপাচ্ছি। যীশু বাঁচিয়েছেন। ঠিক সময় পালাতে পেরেছি।
আরোনাস জামার গলার কাছ দিয়ে হাত ঢোকাল। থলিটা বার করল। সোনার চাকতিগুলো বিছানায় ছড়াল। গুনল। বলল–মন্ত্রীমশাই আমাদের টিকিও ছুঁতে পারবে না। আমাদের কামাইটা আজ ভালোই হল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। বললাম– চলি রে।
–দাঁড়া–এই সার্টিনের থলিটা নিয়ে যা। আরোনাস বলল।
–না–না। আমি বললাম।
নিয়ে যা। অনেক কাজে লাগবে। আরোনাস বলল।
কেমন লোভ হল। জিনিসটা দেখতেও সুন্দর। থলিটা নিলাম। বাড়িতে আর আনলাম না। দোকানেই রেখে দিলাম।
–ওটাই ভুল করেছো–শাঙ্কো বলল–চুরির জিনিস রাখাও অপরাধ।
–সেটা পরে বুঝলাম।
–হুঁ। তারপর বলো। শাঙ্কো বলল।
–বেশ কিছুদিন কাটল। মন্ত্রীর বাড়িতে চুরি। হৈ-চৈ পড়ে গেল। সে সব চাপাও পড়ল।
আরোনাস মাঝে মাঝেই আসে। একটা কথা ভালোই বুঝলাম–আরোনাস পাকা চোর। আমি ওর সঙ্গে যেতে না চাইলেও ও প্রায় জোর করে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে লাগল। তখন ও বলছিল–আমি চুরি টুরি করা ছেড়ে দিয়েছি। চল্ এমনি ঘুরে টুরে আসি।
কিছুদিন গেল। আরোনাস একদিন বলল,তোর বাবা তো হীরের কাজের নাম করা কারিগর। কত রাজা-রাজড়া তাকে দিয়ে গয়নাটয়না বানায়।
–হ্যাঁ। এসব কাজে বাবার সুনাম আছে। আমি বললাম।
–শুনেছি–আট দশ মাস আগে এখানকার রাজা ব্রাপেন নাকি একটা হীরে দিয়েছে ভেঙে গয়না বানাতে।
–হ্যাঁ। ঐ কাজে এখনও আমরা হাত দিতে পারিনি।
–রাজা কী দিয়েছে? আরোনাস বলল।
–একখণ্ড তিনকোনা হীরে। ওটাই ভেঙ্গে দুটো গয়না গড়াতে হবে। আমি বললাম।
–তোর বাবা হীরেটা কোথায় রেখেছে? আরোনাস বলল।
দোকানের লোহার সিন্দুকে। আরোনাসকে আমি বললাম।
–ওটার চাবি তোর বাবার কাছেই থাকে। আরোনাস বলল।
–নিশ্চয়ই। আমি বললাম।
–উনি চাবিটা কোথায় রাখেন? আরোনাস বলল।
–সে অনেক ব্যাপার।
তার মানে? আরোনাস বলল।
–একটা ছোট্ট রুপোর শেকলের মধ্যে চাবিটা থাকে। আমি বললাম।
–সে কি। ঐ নিয়েই স্নান খাওয়া শোওয়া? আরোনাস বলল।
-হ্যাঁ। শুধু রোববার বাবা ঘুম থেকে উঠে ওটা আমাদের এক ছোট্ট যীশুর মুর্তির বেদীতে ঢুকিয়ে রাখে। আমি বললাম।
তারপর–সোমবার সকালে কোমরে পরেন। আরোনাস বলল।
–তাহলে রোববার সারা দিন রাত ওটা ঐ বেদীতেই থাকে। আরোনাস বলল।
–হ্যাঁ। কিন্তু এত কথা জানতে চাইছো কেন? আমি বললাম।
–কারণ আছে। আমার এক দাদা পেরুর রাজধানী লিসা থেকে এক খণ্ড হীরে কিনে এনেছে। আমাকে বলল–বড় দামী হীরে। বাড়িতে সিন্দুক- টিন্দুক নেই। সিন্দুক আছে এমন কারুর সঙ্গে তোর জানাশোনা আছে? আমি তোদের কথা বললাম। ঐ হীরেটা আমি তোদের সিন্দুকে রাখবো। আরোনাস বলল।
