–গুপ্তধন নিয়ে যান। তানাকা বলল।
–না। যে আসল মালিক তাকে দিয়ে দিই। নিজেরা একটা মুদ্রাও নিই না। শাঙ্কো বলল। তানাকা বেশ অবাকই হল। ও ঠিক বিশ্বাস করল না। আবার এই নিয়ে কোন কথাও বলল না।
এতক্ষণ তানাকার হাতের দড়ি খোলা হয়নি। শাঙ্কো দেখল সেটা। ও নিজের জামার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ছোরাটা বের করল। তানাকার হাতের দড়িটাকে ছোরা দিয়ে কেটে দিল। তানাকা হাতের কব্দিদুটোয় হাত বুলোতে লাগল।
সূর্য উঠেছে কিছুক্ষণ আগে। এবার ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। সবার পোশাক ভেজামাথা থেকে টপ্ টন্ করে জমা জল পড়ছিল এতক্ষণ। সবাই ভিজে ঢোল। এক ভাইকিং বন্ধু এতক্ষণে বলল–সুন্দর জামাটামা পরা আমাদের কপালে নেই। যাও বা পেলাম জলকাদায় এক কদাকার চেহারা নিয়েছে। এবার আরো দুতিনজন ভাইকিং বলল–মাথা গা সব ভিজে একশা। দুর্ভাগ্য–দুর্ভাগ্য। হাঁটতে হাঁটতে আরো কয়েকজন বলল–রাস্তায় কাদা জমে গেছে। কাদা ছিটকোচ্ছে। নতুন পোশাক দেখাচ্ছে যেন তিরিশ বছরের পোশাক।
বেলা বাড়তে লাগল। সবাই ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর। কিন্তু কোথায় জুটবে সরাইখানা। চলছে সবাই। হঠাৎ তানাকা গলা তুলে বলল–ঐ ওক গাছটার নিচেই রয়েছে একটা সরাইখানা।
চলল সবাই। সত্যিই দুটো ঘর। পাথর আর শুকনো ঘাস দিয়ে তৈরি।
সবাই সরাইখানার সামনে এসে থামল। মালিক কাঠের পাটাতনে বসে আছে। এত খরিদ্দার দেখে খুব খুশি।
আসেন, আসেন। মালিক একগাল হেসে বলল। তারপর তাড়াতাড়ি উঠে এল।
শাঙ্কোরা ঘরের ভেতর ঢুকল। পাটাতন পাতা। তার ওপরেই শাঙ্কোরা বসল। সবাই জল খেল। কেউ কেউ রান্নার বড় উনুনের কাছে এসে বসল। জামাটামা যত তাড়াতাড়ি পারা যায় শুকিয়ে নেওয়া।
শাঙ্কো মালিকের কাছে এল। বলল–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের খেতে দিন। বেশি দেরি করলে ময়দা আটা চিনির জলে ঢেলে খেয়ে নেব। মালিক আঁতকে উঠল।
না না। দেখছি দেখছি। মালিক কথাটা বলে রাঁধুনিদের কাছে গেল। ফিস্ ফিস করে বলল–তাড়াতাড়ি রুটি মাংস বেঁধে দাও। নইলে আঁড়ার ঘরে রাখা আটা ময়দা, চিনি সব লুঠ করবে। তাড়াতাড়ি করো।
রাঁধুনিরা খুব তাড়াতাড়ি রুটি মাংস রাঁধল। মালিক শাঙ্কোদের কাছে এসে হেসে বলল–আপনাদের খাবার আসছে। আপনারা খেতে বসুন।
শাঙ্কোরা সার দিয়ে বসল। পদ্মপাতা দেওয়া হল। তারপর রুটি আর মাংস। কেউ জানতে চাইল না এটা কিসের মাংস। পাতে পড়ামাত্র ওরা হাপুস হুপুস খেতে লাগল। শাঙ্কো বারকয়েক মারিয়াকে জিজ্ঞেস করেছে শরীর ভালো আছে কিনা। মারিয়া হেসে বলেছে আমার জন্যে ভেবো না।
খাওয়া শেষ। জল খেয়ে উঠল সবাই। শাঙ্কো সোনার চাকতি দিয়ে দাম মেটালো। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল–চল সবাই।
শাঙ্কোরা চলল। একটা মোড়ে এসে দাঁড়াল সবাই। শাঙ্কো দেখল একটা রাস্তা সোজা চলে গেছে অন্যটা ডানদিকে মোড় নিয়েছে। তানাকা শাঙ্কোর কাছে এগিয়ে। এল। বলল-সোজা রাস্তা চলে গেছে তানাকার দিকে। ডানদিকের রাস্তাটা গেছে। প্যারাইসো। এখন আপনারা কোথায় যাবেন?
–প্যারাইসো বন্দরের কাছে।
–তাহলে ডানদিকের রাস্তাটা ধরে চলতে হবে।
–হুঁ। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল–ডান দিকের রাস্তা দিয়ে আমরা যাবো। চলো সব।
ডানদিকের রাস্তা ধরে চলল সবাই।
মাথার ওপর সূর্য যেন আগুন ছড়াচ্ছে। পেট ভরা আছে। এতেই ওরা তৃপ্ত। রোদের তীব্রতা ওদের কাহিল করতে পারল না। বেশ জোরেই হাঁটতে লাগল সবাই।
শাঙ্কো তানাকার কাছে এল। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তানাকা বলল–এবার। তোমার কথা বলো তো। কী করেছিলে যে বন্দী হলে?
—-সে অনেক কথা। তানাকা বলল।
–বল–শুনি। শাঙ্কো বলল।
–দুর্ভাগ্য, দুর্ভাগ্য। তানাকা বলল।
–বেশ তো। দুঃখের কথাটাই শুনি। শাঙ্কো বলল।
একটু থেমে তানাকা বলতে লাগল–তানাকা রাজ্যেই আমার জন্ম। তাই আমি নিজেই আমার নাম রেখেছি তানাকা। পড়াশুনো বেশি করতে পারি নি। বাবা ছিলেন হীরের গয়না তৈরিতে ওস্তাদ।
সান্তিয়াগো আর অন্য দেশ থেকে বাবার কাছে লোক আসতো হীরের গয়না তৈরি করার জন্যে। বাবার হাতের কাজ ছিল নিখুঁত। তানাকার বাজারের মধ্যে আছে বাবার দোকান। স্কুল পালিয়ে আমি বাবার দোকানে এসে বসে থাকতাম। পড়াশুনোর প্রতি আমার কোন আগ্রহই ছিল না। বাবাও বুঝল সেটা। বাবা। বললেন কী আর করবি। হীরের কাজই শেখ। বাবা হাতে ধরে আমাকে হীরের কাজ শেখাতে লাগলেন। আমার বাবা আমার কাজ দেখে বললেন–ভালো। তাহলে হীরের সঙ্গে সোনা রুপোর কাজও শেখ। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে হীরে সোনা রুপোর কাজও শিখলাম। বাবার কাজে সাহায্য করি। আবার শুধু নিজেও গয়না টয়না তৈরি করতে লাগলাম।
তানাকা থামল। তারপর বলতে লাগল–আসলি হীরে সোনা এক নজর দেখেই আমি চিনে ফেলতাম। বাবা আমার এই গুণটার খুব প্রশংসা করলেন। বললেন– আমিও তোর মত এত তাড়াতাড়ি হীরে সোনা চিনতে পারি না। বাবা মাঝে মাঝে শুধু আমাকেই একটা গয়না তৈরির দায়িত্ব দিতে লাগলেন। আমিও গয়নাগুলো নিখুঁতভাবে করতে লাগলাম।
একটু থেমে তানাকা বলতে লাগল–এইসময় আমার এক বন্ধু জুটল– আরোনাস নাম। ও দোকানে আসতো। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওর সঙ্গে গল্পটল্প করতাম। মাঝে মাঝে আরোনাসের সঙ্গে দোকানের কাজ শেষ করে দোকান থেকে বাইরে আসতাম। বাবা আপত্তি করতেন না। তানাকা থামল। শাঙ্কো কিছু বলল না। তানাকা বলতে শুরু করল
