রাতের খাওয়া হলে। ক্লান্ত বিস্কোরা বেশ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল।
ভোর হল। শাঙ্কোর ঘুম ভাঙল। পাখির ডাক শোনা গেল। শাঙ্কো মারিয়ার। আলাদা ঘরে এল। দেখল মারিয়া প্রাতরাশ খাচ্ছে। শাঙ্কো বলল-রাজকুমারী আমরা এখন কী করবো?
প্যারাইসো বন্দর শহরে ফিরে যাবো। শহর দেখা ঘুরে বেড়ানো সবই তো হয়ে গেছে।
–ঠিক আছে। একটা কথা বলছিলাম–আমরা এখানে দুপুরের খাবার খেয়ে রওনা দেব। শাঙ্কো বলল।
–এটা ঠিক করেছো কেন? মারিয়া বলল।
-সকালের সামান্য খাবার খেয়ে সারা পথ হাঁটতে হবে। দুপুর নাগাদ প্যারাইসো পৌঁছব। তখন সরাইখানায় সবারই খাওয়া হয়ে যাবে। আমাদের জন্যে আবার রান্না করতে সরাইওয়ালা রাজি হবে কিনা সন্দেহ। মারিয়া বলল।
ঠিক আছে। দুপুরের খাওয়া খেয়ে যাবো। সবাইকে বলে দাও।
শাঙ্কো বিস্কোর কাছে গেল। রাজকুমারীর সঙ্গে যা কথা হয়েছে বলল।
বিস্কো রাজি হল। বলল–এইভাবে গেলেই আমরা কোন সমস্যায় পড়ব না। শাঙ্কো সব বন্ধুদের বলল। সবাই রাজি হল।
দুপুরের খাওয়া শাঙ্কোরা তাড়াতাড়িই খেয়ে নিল। সবাই তৈরি হয়ে যাত্রা শুরু করল প্যারাইসো বন্দর শহরের দিকে।
রোদের তেজ কম। মাঝে মাঝে সূর্য উড়ন্ত মেঘে ঢাকা পড়ছিল। মেঘ সরে যেতেই রোদ।
কালো রঙের মাটির রাস্তা। হাওয়ায় ধুলো উড়ছে মাঝে মাঝেই। রাস্তায় ঝরে পড়ছে গাছের পাতা।
শাঙ্কোরা চলল। শাঙ্কো একবার দুবার মারিয়ার কাছে এল। বলল–আপনার কষ্ট হচ্ছে না তো?
–না–না। মারিয়া হেসে বলছে–আমি ঠিক আছি। আমার জন্যে ভেবো না।
সন্ধ্যে হল। অন্ধকার নামল। শাঙ্কোরা হেঁটে চলেছে। একটা মোড়ে এসে দেখল– একটা অশ্বত্থাগাছের নিচে আলো জ্বেলে কয়েকটা দোকানে কেনাকাটা চলছে। বিস্কো তাড়াতাড়ি গেল। দেখল–মাংসের বড়া বিক্রি হচ্ছে। ও তাড়াতাড়ি শাঙ্কোর কাছে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–মাংসের বড়া বিক্রি হচ্ছে। তাড়াতাড়ি চল। ভাইকিংরা দোকানটার সামনে এসে দাঁড়াল। শাঙ্কো সবার জন্যে বড়া কিনতে চাইল। কিন্তু বড়াওয়ালা বলল–অত বড়া নেই। শাঙ্কো যা আছে তাই চাইল। দোকানি শাঙ্কোদের মাংসের বড়া আর কটা রুটি দিল। ভাইকিংরা সবাই খাবার পেল না। যারা পেল বড়া ভেঙে খেল। রুটি অবশ্য বেশিই ছিল। ভাইকিংরা তাই খেল। সামনেই একটা ইঁদারা। শাঙ্কোরা জল খেল। তারপর হাঁটা।
কিছুদূর যেতে হঠাৎ আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। আর কিছুদূর এগোতে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। সেইসঙ্গে বাজ পড়ার শব্দ।
শাঙ্কোরা জাহাজী। সমুদ্রের সঙ্গে ওদের নাড়ির যোগ। বিদ্যুতের আলো দেখে শাঙ্কো আন্দাজ করল আর অল্পক্ষণের মধ্যেই ঝড়বৃষ্টি শুরু হবে। শাঙ্কো জোরে বলল–ভাইসবঝড়বৃষ্টি শুরু হবে। তার আগেই ডানদিকের জঙ্গলে ঢুকে পড়। এখানে কোন বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে না। আশ্রয় নেবার হলে বনের মধ্যে ঢুকতে হবে।
এতক্ষণ বাতাস খুব আস্তে বইছিল। হঠাৎ সেই বাতাসও বন্ধ হয়ে গেল।
শাঙ্কোই প্রথমে ডানদিকের বনে ঢুকে পড়ল। তারপর সকলেই যখন ছুটে আসছে প্রচণ্ড ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়ল। সবাই বনে ঢুকে পড়ল।
বৃষ্টি শুরু হল। গাছের পাতায় চট চট শব্দ হতে লাগল। তারপর সেই শব্দ আর শোনা গেল না। ততক্ষণে গাছের পাতা ভিজে গেছে।
অন্ধকারে শাঙ্কোরা দাঁড়িয়ে রইল। প্রচণ্ড ঝড়ের হাওয়া বইছে। গাছগাছালি। মাথা দোলাচ্ছে। বাতাসের শনশন শব্দ। ঝড় বৃষ্টি চলল।
বিস্কো হঠাৎ বিদ্যুতের আলোয় দেখল চারপাঁচজন প্রহরী বন্দীদের নিয়ে যাচ্ছে। বারবার বিদ্যুতের আলোয় দেখল বন্দীদের দল থেকে একজন খুব দ্রুত বেরিয়ে এল। দুজন প্রহরী খোলা তরোয়াল নিয়ে ছুটে এল। কয়েদীটি এক লাফে রাস্তা থেকে বনের গাছের কাছে চলে এল। প্রহরীরা থেমে গেল। বন্দী কয়েদী সঙ্গে সঙ্গে বড় গাছের আড়ালে চলে এল। বিদ্যুতের আলো চমকালেই সেই আলো অন্ধকার বনে খোলা তরোয়াল হাতে প্রহরীরা নিজেদের দলে ফিরে গেল। ওরা চলল। প্রহরীরা কয়েদীদের চেঁচিয়ে বলল–কেউ পালাবার চেষ্টা করলে মরবে। কয়েদীদের নিয়ে প্রহরীরা চলে গেল।
বৃষ্টি থামল। শাঙ্কো অন্ধকারে সেই কয়েদীদের কাছে গেল। আন্দাজে কয়েদী কোথায় আছে বুঝে নিল। তারপর গলা চড়িয়ে বলল- আমরা ভাইকিং। বিদেশী। আমাদের জন্যে ভয় পেও না। একটু পরে শাঙ্কো বুঝল কয়েদীটি হেঁটে হেঁটে ওদের দিকেই আসছে। একটু পরে কয়েদীটি শাঙ্কোর কাছে এল। অন্ধকারে শাঙ্কো দেখল কয়েদীটি বড় রোগা। যেন অনেকদিন না খেয়ে আছে। শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল,
–তুমি কে?
–আমি তামাকা। এখানকার মানুষ। পুবদিকে কিছু দূরে একটি রাজ্য তানাকা। ওখানেই আমার ঘরবাড়ি।
একটু থেমে বলল–বৃষ্টি মনে হয় কমেছে। এখন এখানে থাকলে গাছের তলা থেকে জল পড়বে বেশি। বেশি ভিজে যাবো। বনের বাইরে চলুন।
তানাকা আর শাঙ্কোরা বনের বাইরে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। বৃষ্টি একেবারে থেমে যায় নি। টিপটিপ পড়ছিল। তানাকা শাঙ্কোকে বলল–আপনারা কারা? বিদেশী নিশ্চয়ই?
–হ্যাঁ–আমরা ভাইকিং। আমরা দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসি।
শাঙ্কো মারিয়াকে দেখিয়ে বলল–উনি আমাদের দেশের রাজকুমারী।
–আপনারা এরকম বেড়ান–কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই?
-ঠিক উদ্দেশ্যহীন নয়। কোথাও কোথাও আমরা গুপ্তধনের কথা শুনলে তা বুদ্ধি খাঁটিয়ে খুঁজে আবিষ্কার করি। শাঙ্কো বলল।
