সবাই পাটাতনে পা রেখে রেখে হেঁটে তীরে উঠল। শুরু হল চলা। মারিয়া ক শাঙ্কোকে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো এগিয়ে এল।
মারিয়া বলল–যাচ্ছো তো–সান্তিয়াগো কোথায় কতদূর জানো।
–হ্যাঁ এক এদেশী লোকের কাছে খোঁজ নিয়েছি। খুব বেশি দূর নয়। আর প্যারাইসোর এই রাস্তা ধরে গেলেই সান্তিয়াগো পৌঁছোনো যাবে।
পথচলা শুরু হল। শেষ বিকেলের রোদ বেশ সহনীয়। ওরা চলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই প্যারাইসো পার হয়ে উন্মুক্ত ক্ষেতখামারের এলাকায় এল। শাঙ্কোরা চলল। একটা গ্রাম দেখল। কয়েকটা বাড়ি ধরে গ্রাম। গ্রামের মেয়েরা কপিকলের সাহায্যে ইঁদারা থেকে জল তুলছে। শাঙ্কোরা চলল।
সূর্য অস্ত গেল। চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল।
শাঙ্কোরা হাঁটছে। আকাশে আধভাঙা চাঁদ উজ্জ্বল হল। চারিদিকে চাঁদের আলো ছড়াল। শাঙ্কো আনন্দে শিস্ দিল।
–তোমার এত আনন্দের কারণ কী? বিস্কো শাঙ্কোকে বলল।
–চাঁদের আলো পেলাম। ভাগ্য ভাল কিনা বলো। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। চাঁদের আলোর কথা ভেবে আমরা বেরোই নি। এখন রাস্তার উঁচুনিচু গর্তটর্ত দেখে হাঁটতে পারবো।
শাঙ্কোরা হাঁটতে লাগল। বিস্কো ওর দেশের গান ধরল। ভাইকিংরা ধ্বনি দিল ও–হো–হো।
আর কিছুদূর যেতেই সান্তিয়াগো নগরের আলো দেখা গেল। শাঙ্কোরা আরো জোরে পা চালাল।
সান্তিয়াগো নগরে ঢুকল। বেশ সাজানো গোছানো শহর। রাস্তায় ভিড়। ঐ ভিড়ের মধ্যে দিয়ে শাঙ্কোরা ঘুরে ঘুরে শহরটা দেখতে লাগল। রাজা আজপার অট্টালিকা দেখে মারিয়া হাততালি দিল। মারিয়া খুব খুশি। কতদিন পরে এরকম অট্টালিকা দেখল।
হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত শাঙ্কোরা রাজপ্রাসাদের ধারে সুন্দর বাগান দেখল। কত ফুল ফুটে আছে। মারিয়া বলল–উঃ। আর হাঁটতে পারছি না। চলো এই বাগানে বসি। ওরা বাগানে ঢুকল। পাহারাদার লাঠি হাতে ছুটে এল। গলা চড়িয়ে বলল–রাতে বাগানে বসা যাবে না। শাঙ্কো পাহারাদারের কাছে এল। কোমর থেকে একটা রুপোর চাকতি বের করে পাহারাদারের হাতে দিল। পাহারাদার রুপোর চাকতিটা কোমরে গুঁজে বলল–
–আরও চাকতি দাও। এবার শাঙ্কো পাহারাদারের মাথার টুপি তুলে আনল। বলল–এই টুপি তুমি পাবে না।
–না-না–আমার টুপি দাও। পাহারাদার বলল।
–দিচ্ছি। কিন্তু আর চাকতি চাইবে না। শাঙ্কো বলল।
–বেশ–বেশ। তোমরা বস। পাহারাদার হাত বাড়াল। শাঙ্কো টুপি ফিরিয়ে দিল।
এবার সবাই পাথরের আসনে বসল। এতদূর হাঁটা। শাঙ্কো মারিয়াকে বলল রাজকুমারী আপনার খুব কষ্ট হল।
–মোটেই না। আমি ঠিক আছি। আমার জন্যে ভেবো না। মারিয়া বলল।
বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া বইছিল। শরীর যেন জুরিয়ে গেল। কেউ কোন কথা বলল না।
বেশ কিছুক্ষণ শাঙ্কোরা বিশ্রাম করল। এত হাঁটাহাঁটি। শাঙ্কো বলল– রাজকুমারী আপনার খুবই কষ্ট হয়েছে।
–আমি এখনও আরো হাঁটতে পারি। মারিয়া বলল।
–তাহলে এবার শেষবারের মতো দুপাক ঘুরে আসি। তারপর কোন সরাইখানায় রাতের খাওয়া আর থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
সবাই উঠে দাঁড়াল। শাঙ্কো বলল–পুব দিকটায় আমরা এখনও যাই নি। ঐ দিকে চলো।
ওরা পুবমুখে চলল। বেশ বড় বড় পাথর আর শুকনো ঘাসের ছাওয়া বাড়ি। কে জানে কাদের এই বাড়ি। নিশ্চয়ই মন্ত্রী-টন্ত্রীর। কিছু দূরেই একট মস্ত বড় মাঠ। হয়তো এখানে খেলা টেলা হয় মেলাও বসে। চাঁদের আলো খুব। উজ্জ্বল নয়। আর কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি হল। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল–আর ঘুরে বেড়ানো নয়। এক ভাইকিং বন্ধু বলে উঠল,–খিদেয় পেট জ্বলছে।
বিস্কো বলে উঠল–শাঙ্কো ঐ যে একসারি গাছ। বেশ কয়েকটা দোকান। ওখানে সরাইখানা পাওয়া যাবে। চল।
বিস্কোর অনুমান ঠিক। ওখানে দুটো সরাইখানা পাওয়া গেল। শাঙ্কোকে বলল– দুই সরাইখানার মালিককে দেখ ভালো করে। ওরা দাঁড়িয়ে আছে। তখনই প্রথম সরাইখানার মালিক ওর এক কর্মচারীকে বকতে বকতে তার গালে চড় কষাল। শাঙ্কো বলল–এই সরাইখানার মানিক রগচটা। ওর দোকানে যাবো না। এবার পরের সরাইখানাটায় এল। দাড়ি গোঁফওয়ালা মানিক হাসিমুখে এগিয়ে এল। বলল–আসুন–থাকা খাওয়ার সব ব্যবস্থাই ভাল। শাঙ্কো বলল–এই সরাইখানায় এসো। সবাই সরাইখানায় ঢুকল। পেছনে দেখল এক মস্তবড় জালায় জল রাখা। ওঁরা হাতমুখ ধুয়ে ঢালাও বিছানায় বসল।
মালিক এল। হাসিমুখে বলল–আপনারা কি এখন খাবেন?
–আমরা ক্ষুধার্ত। এখনই খাবো। শাঙ্কো বলল।
–সে ব্যবস্থা করছি। মালিক চলে গেল।
মিনিট পনেরোর মধ্যে কাজের লোকেরা শাঙ্কোদের সামনে চিনেমাটির থালা রেখে গেল। তারপর চিনেমাটির বড় বাটি রেখে গেল। বাটিতে গরম মুর্গির মাংস। থালায় দিল চারখানা গরম রুটি। শাঙ্কোরা খেতে শুরু করল। বেশ সুস্বাদু মাংসের ঝোল। সবাই বেশ ভালোই খেল। মালিকের মুখে হাসি নেই। শাঙ্কো মালিকের কাছে গেল। হাসল। কোমরের ফেট্টিতে রাখা দুটো সোনার চাকতি বের করল। মালিক অবাক। তাকিয়ে আছে। শাঙ্কো সোনার চাকতি দুটো দিল। বলল,
–কী খুশি তো?
–হা-হা-মালিক মাথা নাড়তে নাড়তে বলল।
–আমরা একটু বেশি খেয়ে ফেলেছি। খিদে তো। শাঙ্কো বলল।
না না। তাতে কি? মালিক বলল। তারপর গলা নামিয়ে বলল–এখনও তো পাঁচজন খেতে বাকি। আবার রান্না চাপানো হয়েছে। তারা দুতিনদিন ধরে এখানে আছে। তাদের তো আর না খাইয়ে রাখতে পারি না।
–তা তো বটেই। শাঙ্কো বলল।
