আকাশে চাঁদ অনুজ্জ্বল। ছেঁড়া কাপড়ের মত ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ উত্তরমুখি সার বেঁধে উড়ে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস বলতে শুরু করল–ভাইসব হ্যারি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ দেশীয় চিকিৎসককে দেখানো হয়েছে। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ হ্যারিকে খাওয়ানো হচ্ছে। চিকিৎসক বলেছেন–তার ওষুধ নিয়মিত খেলে হ্যারি অল্পদিনের মধ্যেই সুস্থ হবে। তবে ঘাড়ের জোরটা কমে যাবে। তাতে কিছু ক্ষতি মেনে নিতে হবে। কিন্তু হ্যারি বাঁচল তো। ফ্রান্সিস থামল। সবাই চুপ করে ফ্রান্সিসের কথা শুনতে লাগল। ফ্রান্সিস আবার বলতে শুরু করল–হ্যারি সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া। পর্যন্ত আমরা এই বন্দর শহর প্যারাইসো ছেড়ে যাবো না। মাঝ সমুদ্র দিয়ে যেতে যেতে হ্যারি যদি আবার অসুস্থ হয় তাহলে ভেন ওকে বাঁচাতে পারবে না। তখন অন্য চিকিৎসকও পাওয়া যাবে না। অসহায় আমরা দেখবো হ্যারি আস্তে আস্তে মৃত্যুর। কোলে ঢলে পড়ল। ফ্রান্সিস থামল। বন্ধুরা নিশ্চুপ। কানে লাগছে শুধু সমুদ্রের শো শোঁ শব্দ। ফ্রান্সিস বলল–তাহলে হ্যারি সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকবো। বন্ধুরা ধ্বনি তুলল– ও–হো–হো। তারপর চলে গেল। কোন নতুন বন্দরে এসে ফ্রান্সিস মারিয়া অন্য বন্ধুরা শহর দেখতে বেরোয়। বেশ রাত পর্যন্ত ছোট ছোট দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। তারপর জাহাজে ফিরে আসে।
আজ কিন্তু কোন বন্ধু জাহাজ থেকে নামল না। কেউ তীরে নামবার কথা বলল না। অসুস্থ হ্যারির জন্যে সবাই উৎকণ্ঠিত। কিছুই ভালো লাগছে না তাদের।
চিকিৎসকের ওষুধ খেয়ে তিন চারদিনের মধ্যে হ্যারি অনেকটা সুস্থ হল। ফ্রান্সিস উৎফুল্ল হল–যাক হ্যারির বিপদ কেটে গেছে।
সেদিন ডেক-এ নাচ গানের আসর বসল। হ্যারিও শাঙ্কোর কাঁধে ভর রেখে ওরা আস্তে আস্তে ডেক-এ উঠে এল। সবাই দেখল–হ্যারি আস্তে আস্তে এসে আসরে বসল। সবাই ও–হো–হো ধ্বনি তুলল। ডেক-এ বেশ কিছুটা গোল জায়গা ঘিরে ভাইকিংরা বসল।
প্রথমে বিস্কো এল। বিস্কো হাসির গল্প বলতে ওস্তাদ। কত হাসির গল্প যে ও জানে। কয়েকজন বন্ধু গলা চড়িয়ে বলল–বিস্কো প্রথমে হাসির গল্প। বিস্কো মাথা নেড়ে বলল–বেশ। তারপর গল্প বলতে লাগল–এক সার্কাস পার্টিতে একটা গাধা ছিল। মজার খেলা দেখাত। কিন্তু সার্কাস মালিক গাধার ওপর তেমন নজর রাখতো না। কাজেই অনেক সময় গাধাটাকে খেতেও দেওয়া হত না। এরকম মাঝে মাঝেই হত। খিদের জ্বালায় গাধাটা রাতে ঘুমুতে পারতো না। ওকে এত অবহেলা সহ্য করেও ঐ সার্কাস পার্টিতে থাকতে হতো। ঘোড়া ভালুকরা গাধাটাকে বলত–তুই এত কষ্ট করে এই সার্কাস পার্টিতে পড়ে আছিস কেন? গাধা চুপ করে থাকতো। একদিন দুটো কুকুর ওকে বলল–এই দল থেকে চলে যা।
–না, না। এখানে আমাকে থাকতেই হবে। ঐ দ্যাখ-মালিকের মেয়ে তারের ওপর দিয়ে হাঁটা অভ্যেস করছে। মালিক মেয়েটিকে বলে–যদি পা ফসূকে পড়ে যাস তবে এই গাধাটার সঙ্গে তোর বিয়ে দেব। ভাই–একদিন না একদিন পা ফস্কাবেই। সেই দিনের জন্যেই আমি মার খেয়ে খেয়ে এই সার্কাস দলে পড়ে আছি।
তুমুল হাসি আর হাততালিতে ভরে উঠল জাহাজের ডেক। এবার গান। এক বন্ধু এগিয়ে এল। সঙ্গে একটা পীপে হাতে নিয়ে আর এক বন্ধু এল। গান শুরু হল। পীপের দুপাশে হাতে চাপড় দিয়ে বাজনা বাজল। গান জমে উঠল। হাততালি দিল শ্রোতা বন্ধুরা।
এবার সেই গায়ক বন্ধুটি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–ফ্রান্সিস– রাজকুমারীকে একটা গান গাইতে বল। ফ্রান্সিস বলল কী বকছো। মারিয়া গাইতে জানে নাকি??
জানে। তুমি জানো না। আমরা রাজকুমারীর গান শুনেছি। বন্ধুটি বলল।
— ঠিক আছে। বলে দেখি। তোমরা মারিয়াকে বলো–আমি ডাকছি। ওরা চলে গেল। একটু পরে মারিয়া এল।
-কী ব্যাপার? আমাকে ডেকে পাঠালে কেন? মারিয়া এসে বলল।
–আমার বন্ধুরা খুব ধরেছে আমাকে। ওরা তোমার গান শুনতে চায়।
–একসময় গাইতাম। এখন আর গাই না। মারিয়া বলল।
–যা পারো গাও। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। মারিয়া বলল।
মারিয়া মাঝখানের গোল জায়গাটায় দাঁড়াল। তারপর গান গাইতে শুরু করল। ফ্রান্সিস বেশ চমকে উঠল–মারিয়ার এত সুন্দর গলা। সঙ্গে পীপেয় চাপড় মেরে তাল রাখল এক বন্ধু। গানটা যেন কোথায় শুনেছে ফ্রান্সিস। একটু পরে ফ্রান্সিসের মনে পড়ল–ওরা আইসল্যাণ্ড গিয়েছিল। সেখানে এক উৎসবে চাষী মেয়েরা এই গান গেয়েছিল। বলা যায় আইসল্যাণ্ডের গান।
মারিয়ার গান শেষ হল। বন্ধুরা কয়েকজন আনন্দে লাফাতে লাগল। সেইসঙ্গে হাততালি। মারিয়াকে আরো দুটি গাইতে হল। তুমুল হর্ষধ্বনি শোনা গেল।
গানের আসর শেষ হল। বন্ধুরা নিজেদের কেবিনে চলে গেল। শাঙ্কো হ্যারিকে ধরে নিয়ে গেল।
কেবিনঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া তুমি এত সুন্দর গান গাও আমি জানতেই পারিনি।
–তোমার সামনে আমি কখনো গাই নি। তাই।
এখন থেকে গাইবে। আমি মাঝে মাঝে তোমার গান শুনবো।
–বেশ। মারিয়া হেসে বলল।
পরদিন সকালে বন্ধুরা কয়েকজন ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে এল। শাঙ্কোও ওদের সঙ্গে ছিল। ফ্রান্সিস বলল–কী ব্যাপার?
শাঙ্কো বলল–আমরা পোশাক তৈরি করাব। তুমি কিছু সোনার চাকতি দাও।
বেশ তো। ফ্রান্সিস বলল। তারপর মারিয়াকে বলল–বন্ধুদের সোনার চাকতি দাও। মারিয়া বিছানার এক কোনে এল। হাত নামাল। একটা কাঠের বাক্স বের করল। চাবি নিয়ে বাক্সটা খুলল। বিছানা থেকে নেমে এল। শাঙ্কোদের একটা একটা করে সোনার চাকতি দিল। তারপর তিনটে, চাকতি নিয়ে রাখল।
