ভাঙা-ভাঙা পর্তুগীজ ভাষার সঙ্গে ফরাসী ভাষা মিশিয়ে লা ব্রুশ বলতে লাগলো–তবে কেন আশী মাইল সমুদ্র পথ তোমাদের পেছনে ধাওয়া করে এলাম?
খুকখুক করে হেসে উঠল লা ব্রুশ। তারপর হাসি থামিয়ে বলল–সেটা এই জন্যে। কথাটা বলেই লা ব্রুশ খাপ থেকে তরোয়াল খুললো। তারপর বেশ দ্রুত ছুটে গিয়ে হীরের গাড়ির ওপর বাঁধা দড়িগুলো কাটতে লাগলো। তারপর ওখান থেকে সরে এসে ভাইকিংদের দিকে তাকিয়ে খুকখুক করে হেসে উঠলো। ফ্রান্সিস ও হ্যারি পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো। তবে কী লা ফ্রশ হীরের কথা জানে? লা ব্রুশ হঠাৎ চিৎকার করলো–ওপরের ঢাকনা সরাও।
তিন-চারজন জলদস্যু ছুটে গিয়ে ছেঁড়া পাল দুটো খুলে ফেলল। সূর্যের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল হীরে দু’টো। নীলচে-হলুদ কত রকমের আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগল। ভাইকিংরা কেউ অবাক হলো না। কারণ, এসব রঙের খেলা ওরা অনেকদিন দেখেছে। অবাক হল জলদস্যুরা। ওরা হাঁ করে তাকিয়ে রইলো। চোখে পলক পড়ে না। লা ফ্রশও কম অবাক হয় নি। এত বড় হীরে? ওর কল্পনারও বাইরে। কিছুক্ষণ চুপ করে হীরে দুটোর দিকে তাকিয়ে রইলো লা ব্রুশ। তারপর ভাইকিংদের দিকে তাকিয়ে লা ব্রুশ বলতে লাগল–তেকবুর বন্দরের কাছে যে দুর্গ আছে, সেখান থেকে হেনরী সময় মতই আমার কাছে লোক পাঠিয়ে ছিল। তোমরা ওকেভাওতা দিয়ে হীরে নিয়ে পালাচ্ছো, এইসংবাদ পেতেই তোমাদের পিছু নিলাম। আমাদের ক্যরাভেল’ জাহাজ যে অনেক দ্রুত গতিসম্পন্ন, সেটা আর একবার প্রমাণিত হলো। খুকখুক করে হেসে উঠল লা ব্রুশ।
ফ্রান্সিসের আর সহ্য হ’ল না। ও আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়াল। হ্যারি ওকে বারণ করতে গেল। কিন্তু ফ্রান্সিস শুনল না। ও উঠে দাঁড়িয়ে বললো–ক্যাপ্টেন লা ব্রুশ আমার কিছু বলবার আছে।
দু’তিন জন পাহারাদার তরোয়াল হাতে ছুটে এলো। লা ব্রুশহাত তুলে ওদের থামিয়ে দিল। বললে–বলো।
–দুর্গাধ্যক্ষ হেনরী মিথ্যে অভিযোগ করেছেন। আমরা তাকে ভাওতা দিতে চাই নি। তিনি আমাকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন। তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাকে এক খন্ড হীরে দিয়েছিলাম। কিন্তু লোভের বশেতিনি দু’টো খন্ডই জোর করে নিতে গিয়েছিলেন আমরা সেটা হতে দিইনি। কারণ হীরের দু’টো খন্ডই আমাদের প্রাপ্য। আমরাইহীরের পাহাড়ের খোঁজ জানতাম। আমার এক বন্ধু এই জন্য প্রাণ দিয়েছে। কাজেই এই হীরের নায্য দাবীদার আমরা। হেনরীকে এই হীরে পেতে বিন্দুমাত্র কষ্টও করতে হয় নি। তবে কি করে উনি বলেন, যে আমরা ওকে ভাওতা দিয়েছি।
লা ব্রুশ কী ভাবল। তরোয়ালের হাতলে হাত বুলোল দু’একবার! দাড়িতে হাত বুলিয়ে, তারপর কেশে নিয়ে বললো–ওসব তোমাদের ব্যাপার। হীরে দুটো আমি পেয়েছি, ব্যাস। বলে ব্রুশ চোখ পিটপিট করে হাসল।
–আমাদের কি হবে?
–তোমাদের আমার জাহাজে কয়েদ ঘরে থাকতে হবে।
–কেন?
লা ব্রুশ খুকখুক করে হাসল–তোমরা যে বেঁচে আছো, এই জন্য মা মেরীকে ধন্যবাদ দাও। তোমাদের যে প্রাণে মারতে বলিনি, তার কারণ এই হীরে দু’টো। তোমাদের নিয়ে আমরা প্রথমে যাবো ডাইনীর দ্বীপে। সেখানে লুঠের মাল রেখে যাবো চাঁদের দ্বীপে। তারপর ইউরোপের দিকে। ক্রীতদাস বিক্রীর হাটে তোমাদের বিক্রী করবো। এরমধ্যে অবশ্য ভালো খদ্দের পেলে হীরে দু’টোও বিক্রী করে দেব।
–আমাদের বিক্রী করা হবে কেন?
লা ব্রুশ ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠল–তুমি যে এখনো আমার সঙ্গে কথা বলতে পারছো, জেনো সেটা আমার দয়া।
হ্যারি ফ্রান্সিসের হাত ধরে টানল–ফ্রান্সিস মাথা গরম করো না। ব’সে পড়ো।
ফ্রান্সিস বসে পড়ল। লা ব্রুশ বড় সর্দারের দিকে তাকিয়ে বলল–এদের সব কয়েদ ঘরে ঢোকাও। তারপর এই জাহাজটাকে আমাদের ক্যারাভেলের পেছনে বেঁধে নাও।
লা ব্রুশ আর কোনদিকে না তাকিয়ে কাঠের পা ঠক্ঠক্ করতে করতে নিজের ক্যারাভেল-এ ফিরে গেল।
বড় সর্দার চেঁচিয়ে হুকুম দিলো–সব কটাকে কয়েদ ঘরে ঢোকাও। পাহারাদার জলদস্যুরা সব এগিয়ে এলো। ভাইকিংদের সারি বাঁধা হলো। ক্যরাভেলে নিয়ে যাওয়া হ’ল ওদের। ডেক থেকে কাঠের সিঁড়ি নেমে গেছে। ওরা নামতে লাগল। অনেক ক’টা ধাপের পর ক্যারাভেলের সবচেয়ে নীচের অংশে একটা লম্বা ঘর। লোহার মোটা-মোটা শিক লাগানো। ঘরটার জানালা বলে কিছুই নেই। ঐ শিকল লাগানো দরজা থেকেই যেটুকু আলো আসে। স্যাৎসেঁতে অন্ধকার। বাইরের আলো থেকে এসে কিছুই নজরে পড়ে না। অন্ধকার স’য়ে আসতে ওরা দেখল লম্বা ঘরটার ধার বরাবর একটা মোটা–শেকল। শেকলের দুটো দিক। একদিকে জাহাজের কাঠের খোলের সঙ্গে গাঁথা। অন্য এক দিকটা একটা বড় কড়ার সঙ্গে আটকানো। বড় সর্দার সেই দিকে শেকলটার মুখ একটা আংটা থেকে খুলে নিলো। এদিকে কোনের দিকে একজন জলদস্যু দাঁড়িয়ে। সে প্রত্যেকের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিয়ে এক-এক করে চাবি দিয়ে হাতকড়া আটকে দিতে লাগল। বড় সর্দার এক একজনের হাত কড়ার মধ্যে দিয়ে শেকলের মুখটা ঢুকিয়ে দিতে লাগল। হাতকড়ার মধ্যে দিয়ে শেকল বাঁধা অবস্থায় ওরা পরপর বসতে লাগল। যখন সবাইকে এভাবে বসানো হলো, তখন বড় সর্দার শেকলটা একটা আংটার মধ্যে আটকে দিয়ে যে হাতকড়া পরাচ্ছিল, তাকে ডাকল। সে এসে শেকলটা চাবি দিয়ে এঁটে দিল। বোঝা গেল, এই লোকটাই কয়েদ ঘরের পাহারাদার। ওই বন্দীদের সব দেখাশুনা করে। অদ্ভুত দেখতে লোকটা। যেমন কালো চেহারা, তেমনি মুখটা। মুখটা যেন আগুনে পোড়া তামাটে কালো। এমন ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, যেন কিছুই দেখছেনা, শুনছে না। মুখ দেখলে মনে হয় যেন জীবনে কোনদিন হাসে নি। মাথায় কঁকড়া চুল। একেবারে নরকের প্রহরী। এতক্ষণে হাতকড়া শেকলের ঝন্ঝন্ শব্দ হলো। তবু ভাইকিংদের মধ্যে কেউ উঠে দাঁড়ালে শেকলে ঝন্ঝন্শব্দ উঠেছে। এতক্ষণে চোখে অন্ধকার সয়ে আসতে ফ্রান্সিস চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। যে ভাবে শেকল বাঁধা হাতকড়ি পরানো হোল তাতে এসব ভেঙে পালানো অসম্ভব, দু’দিকে নিরেট কাঠের খোল। দরজায় মোটা গরাদ। ফ্রান্সিসের মন দমে গেল। শেষে ক্রীতদাসত্বকে মেনে নিয়ে জীবন শেষ করতে হবে? ও এইসব ভাবছে, তখনই শুনল প্রায় অন্ধকার কোন থেকে কে ফ্যাসফেসে গলায় চেঁচিয়ে উঠল–
