ফ্রান্সিস আর নিজেকে সম্বরণ করতে পারল না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিসের দুচোখে জলধারা নামল। শাঙ্কো ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরে বলল ফ্রান্সিস-ফ্রান্সিস তুমি কেঁদো না। ফ্রান্সিস হাতের উল্টেপিঠ দিয়ে চোখের জল মুছল।
তখনই চিকিৎসক ঢুকলেন। পরনে জোব্বা। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বন্ধুরা দরজায় এসে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে চিকিৎসক বললেন–কিভাবে অসুখ হল এটা বলবেন বলেছিলেন। এখন বলুন।
ফ্রান্সিস বলল–জাহাজে চড়ে আমরা আসছিলাম। একটা জায়গায় এলাম। সমুদ্রতীর। একটা জাহাজ নোঙর করে আছে। দেখলাম। আশ্চর্য জাহাজের সব মানুষ মরে পড়ে আছে। এই রোগী আর একজন বন্ধু তীরে এসেছিল। একটা বন পার হয়ে দুটো পাথরের বাড়ি দেখেছি। দুজনে বাড়ি দুটোয় গিয়ে দেখেছিল সব লোকজন ঘরে মরে পড়ে আছে। তখনই ঘরের অন্ধকার কোনা থেকে কয়েকটা নীলরঙের বড় বড় মাছি আমার এই বন্ধুর ঘাড়ে হুলমত ফুটিয়ে দেয়। জাহাজে ক ফিরে এসে বন্ধুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে।
ক’বার হুল ফুটিয়েছিল। চিকিৎসক জিজ্ঞেস করলেন।
–একবার। ফ্রান্সিস বলল।
–হুঁ। চিকিৎসক বললেন–আশা আছে।
ফ্রান্সিস প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল–আমার বন্ধুটি বাঁচবে তো।
–হ্যাঁ। বাঁচবে। চিকিৎসক বললেন। তারপর গলা চরিয়ে ডাকলেন–
–হিবু? ছেলেটি এসে দাঁড়াল। চিকিৎসক তাকে কয়েকটা ওষুধ আনতে বললেন। ফ্রান্সিসরা ঐ ওষুধের নাম জীবনেও শোনে নি।
একটু পরে হিবু দুটো বোয়াম আর একটা পুটুলি নিয়ে এল। একটা ছোট পাথরের পাটা আর হামান দিস্তা। একটু পরে একটা কাঠের গ্লাশে জল নিয়ে এল। চিকিৎসক ওষুধ তৈরি করতে লাগলেন। গোল শুকনো ফল হামান দিস্তায় গুঁড়ো করে বড়ি বানালেন। হিবু সাহায্য করতে লাগল। চিকিৎসক হিবুকে দুটো বড়ি একসঙ্গে খাওয়াতে দিলেন। হিবু হ্যারির মুখের কাছে এল। হাত বাড়িয়ে জলের গ্লাশটা এনে বলল–দুটো বড়ি খেয়ে নিন। হ্যারির কোন সাড়া নেই।
–আপনারা তো বন্ধু। ডেকে ওষুধটা খাওয়ান।
ফ্রান্সিস হিবুর কাছে থেকে বড়ি দুটো নিল। হ্যারির মুখের কাছে মুখ এনে ডাকল–হ্যারি! হ্যারি চুপ। কোন কথা নেই। ফ্রান্সিস বার তিনেক ডাকতে হ্যারি চোখ মেলে তাকাল। ফ্রান্সিস বলল–এই বড়ি দুটো খেয়ে নাও। হাঁ কর, আমি জল ঢেলে দিচ্ছি। বড়ি দুটো খেয়ে নাও। চিকিৎসক বলেছেন তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। হ্যারি কিছু বলল না। মুখ হাঁ করল। ফ্রান্সিস মুখে জল ঢালল। পর পর দুটো বড়ি মুখে দিল। হ্যারি খেয়ে নিল। এতক্ষণে ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
এবার চিকিৎসক হিবুকে সব বুঝিয়ে দিল। কাঠের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। শাঙ্কো কোমরে গোঁজা একটা সোনার চাকতি বের করে চিকিৎসকের হাতে দিল। চিকিৎসক নিয়ে জোব্বার পকেটে রাখলেন। ফ্রান্সিস বলল–দয়া করে আমার বন্ধুকে একটু অভয় দিয়ে যান। ও খুবই ভেঙে পড়েছে।
–হুঁ। চিকিৎসক মুখে শব্দ করলেন।
–হ্যারি–হ্যারি চিকিৎসক কী বলছেন শোন।
ফ্রান্সিস বলল-নীল মাছির হুল ফোঁটানোর কথা।
–রোগীর চোখ মুখ ফোলা দেখেই বুঝতে পেরেছি। চিকিৎসক বললেন। চিকিৎসক এবার হ্যারির দিকে তাকিয়ে বললেন–আপনার বিপদ কেটে যাবে। আপনি সুস্থ হবেন। হ্যারি ম্লান হাসল। চিকিৎসক বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। হিবু নিজের কাজ করে চলল।
এবার হিবু বসে বসে ওষুধ বানাতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ওষুধ তৈরি করল। বোঝা গেল এই ওষুধ তৈরির কাজটা ও ভালোই শিখেছে। শাঙ্কো হাত বাড়িয়ে ওষুধগুলো নিল।
হিবু–ফ্রান্সিস বলল–তোমার কাজ তো হয়েছে এবার আমাদের সঙ্গে আমাদের জাহাজে এসো।
–না–না। আমার কত কাজ। হিবু মাথা নেড়ে বলল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ইঙ্গিত করল। শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে একটা ছোট স্বর্ণমুদ্রা বের করে হিবুর দিকে বাড়াল। হিবু ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাতে লাগল। তারপর বলল–এই সোনার চাকতি আমাকে দিচ্ছেন কেন?
–চিকিৎসককে আমরা তার প্রাপ্য দিয়ে থাকি। তোমাকেও দিলাম।
এবার হিবু সোনার চাকক্টিা নিল। বলল–আমি আসছি। ও বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
কিছু পরে পোশাক পাল্টে এল হিবু। বলল–চলেন। কিন্তু আমি তাড়াতাড়ি চলে আসব।
শাঙ্কোরা হ্যারির পাটাতনটা ধরল। আস্তে আস্তে তুলে কাঁধে নিল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এল। রাস্তা দিয়ে চলল। ফ্রান্সিসদের বিদেশী পোশাক দেখে কেউ কেউ চেয়ে চেয়ে দেখল।
পথে আসতে আসতে ফ্রান্সিস বলল–হিবু এই বন্দরের নাম কি?
–ভালপেরাইসো বন্দর। সংক্ষেপে বলি প্যারাইসা।
–এটা কোন দেশ?
–চিলি।
ফ্রান্সিস আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। হ্যারিকে নিয়ে সবাই জাহাজঘাটায় এল। হ্যারিকে নিয়ে সাবধানে জাহাজে উঠল। মারিয়া আর সব বন্ধুরা ছুটে এল। ফ্রান্সিস মারিয়া আর বন্ধুদের বলল–চিকিৎসক ওষুধ দিয়েছে। বলেছে হ্যারির অসুখ সেরে যাবে। ভয়ের কিছু নেই।
মারিয়া কেঁদে ফেলল। ফ্রান্সিস এসে সান্ত্বনা দিল। বলল–রাত জেগে জেগে তোমার শরীরের অবস্থা খারাপ হয়েছে। এসব নিয়ে আর ভেবো না। দেখ এই ছেলেটি হিবু নাম-চিকিৎসকের ওষুধ বানায়।
–এই বাচ্চা ছেলেটা? মারিয়া হেসে বলল।
–হ্যাঁ। তারপর ফ্রান্সিস বলল–হিবু তুমি কখনও কোন রাজকুমারী দেখেছো?
–না–না। তবে গল্পের বইয়ে ছবি দেখেছি। কী সুন্দর দেখতে। কী সুন্দর মাথার চুল। কী সুন্দর মুকুট পরা। হিবু বলল।
