সূর্য উঠল। ভোরের আলো সমুদ্রে জাহাজে ছড়াল। দূরে ডাঙা দেখা গেল।
ফ্রান্সিস দাঁড় ঘরে এল। দেখল বন্ধুরা কেউ কেউ ঘরের মধ্যেই শুয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল-দাঁড় বাওয়া আস্তে কর। জাহাজ ডাঙায় গিয়ে ধাক্কা মারতে পারে।
জাহাজের গতি কমল। আস্তে আস্তে গিয়ে জাহাজঘাটায় গিয়ে থামল।
শাঙ্কো জাহাজ থেকে পার পর্যন্ত কাঠের তক্তা পেতে দিল। ফ্রান্সিস তক্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে নামবার সময় বলল–শাঙ্কো–আমি আগে চিকিৎসক খুঁজে বের করছি। তোমরা ততক্ষণ অপেক্ষা করো।
ফ্রান্সিস পারে নামল। বেশ বড় বন্দর। আট দশটা জাহাজ নোঙর করে আছে। চারদিকে তাকাল একবার। কোন দিকে কোথায় যাবে চিকিৎসকের খোঁজে এটা বুঝে উঠতে পারছিল না।
রাস্তার ধারের দোকানপাট খুলে গেছে। লোকজনের ভিড় বাড়ছে। ফ্রান্সিস এদিন-ওদিক ঘুরতে লাগল। এক প্রৌঢ় ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করল–এখানে ভাল চিকিৎসক কোথায় পাবো? ভদ্রলোক ফ্রান্সিসের মুখের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইল। বুঝল–ফ্রান্সিস বিদেশি। ভদ্রলোক হাত তুলে বললেন–ঐ যে চেস্টনাট গাছটা দেখছেন–তার পাশেই একটা ওষুধের দোকান আছে। ওরা বলতে পারবে।
ফ্রান্সিস চেস্টনাট গাছটা দেখল। এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে দেখল– সাইনবোর্ড–ওষুধের দোকান। ফ্রান্সিস দোকানে ঢুকল। এক যুবক বসে আছে।
ফ্রান্সিস বলল–বলছিলাম–এখানে চিকিৎসক পাবো।
-হা পাবেন বই কি।
–তিনি কোথায়?
বাড়িতে আছেন। ঘণ্টাখানেক পরে আসবেন।
–আমার রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ। আমি এক্ষুনি তাঁকে দেখাতে চাই। তার বাড়িটা কোথায় বলুন।
দেখুন গিয়ে কথা বলে। যুবকটি বলল–তারপর আঙ্গুল তুলে একটা ছোট গীর্জা দেখাল। বলল–ঐ গীর্জার পেছনেই চিকিৎসকের বাড়ি।
-খুব উপকার করলেন। ফ্রান্সিস বলল। তারপর ছুটল গীর্জার দিকে।
গীর্জার সামনে এল। পেছনে একটা সরু রাস্তা চলে গেছে। সেটা ধরে গীর্জার পেছনে এল। দেখল একটা কাঠের কাঠ পাথরের বাড়ি। ফ্রান্সিস বন্ধ দরজায় টোকা দিল একবার। ভেতরে কারু সাড়াশব্দ নেই। আবার ঠুকলো।
–কে? একজনের গম্ভীর গলা শুনল
—আমি চিকিৎসকের কাছে এসেছি। তাঁকে বড় দরকার। ফ্রান্সিস বলল।
দরজা খুলে গেল। একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি। পাকা দাড়ি গোঁফ। বললেন–আমিই চিকিৎসক। বলুন।
–আমরা জাতিতে ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।
–হুঁ। নাম শুনেছি। চিকিৎসক বললেন।
–আমরা জাহাজে এসেছি। আমার বন্ধু খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আপনি তাকে বাঁচান। ফ্রান্সিস বলল।
–কী করে অসুস্থ হল? চিকিৎসক বললেন।
–আমি বন্ধুকে নিয়ে আসতে যাবো। বন্ধুকে এনে সব বলবো। এখন কোথায় আপনাকে দেখাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–দোকানে নিয়ে আসুন। ঘণ্টাখানেক পরে। চিকিৎসক বললেন।
–না-না-না। আমরা এখানেই নিয়ে আসছি। দেরি করতে সাহস পাচ্ছি না। ফ্রান্সিস বলল।
-বেশ। আসুন। চিকিৎসক বলল।
–অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস ফিরে দাঁড়াল। তারপর রাস্তার মানুষের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ছুটল। জাহাজঘাটার দিকে।
জাহাজে উঠল। দেখল বন্ধুরা সব দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস বলল– চিকিৎসক পেয়েছি। তোমরা একটা দুহাত পাশে এরকম একটা কাঠের তক্তা নিয়ে এসো।
ছুটতে ছুটতে হ্যারির কেবিনঘরে এল। দেখল মারিয়া জলভেজা ন্যাকড়া হ্যারির কপালে আলগোছে চেপে ধরে আছে।
জ্বর কমেছে? ফ্রান্সিস বলল।
–কিছুটা কমেছে। মারিয়া বলল।
মারিয়া ফ্রান্সিসের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল–নাকমুখ ফুলে যাচ্ছে।
–ঠিক আছে। চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। তুমি জাহাজেই থাকো। তোমার মুখ চোখ-কয়েক রাত জেগে আছো। হ্যারিকে শুশ্রূষা করছে।
আমার জন্যে ভেবো না। তুমি শিগগির চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাও। মারিয়া বলল। #
শাঙ্কো বিস্কোরা কয়েকজন ঘরে ঢুকল। হাতে করে নিয়ে এসেছে চওড়া কাঠের পাটাতন। ওরা পাটাতনটা বিছানার কাছে নিয়ে এল। দু’তিনজন হ্যারিকে ধরে এনে পাটাতনে শুইয়ে দিল। তারপর তুলে কাঁধে নিয়ে হাতে ধরে পাটাতনটা তুলে বাইরে এল। ফ্রান্সিস হ্যারির মুখের দিকে তাকাল। অবিন্যস্ত মাথার চুল। চোখ দুটো কোটরে। হ্যারি চোখ বুজে আছে। ফ্রান্সিস তাকিয়ে থাকতে পারল না। আবাল্য বন্ধু–কত সুখ দুঃখের স্মৃতি। ফ্রান্সিস অনেক কষ্টে কান্না চাপল।
হ্যারিকে নিয়ে ফ্রান্সিসরা ডেক-এ এলো। তারপর কাঠের পাটাতনে শোওয়া হ্যারিকে নিয়ে আস্তে আস্তে ঘাটে নামল।
রাস্তার ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সিসরা চলল।
ফ্রান্সিস বলল–একটু তাড়াতাড়ি চল। শাঙ্কোরা ভিড়ের মধ্যে দিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত চলল।
গীর্জার পেছনে চিকিৎসকের বাড়ির সামনে এল। দরজায় আঙ্গুল ঠুকল। একটা অল্পবয়সী ছেলে দরজা খুলল।
–তোমার কর্তা কোথায়?
–আসছেন। আপনারা এই ঘরে আসুন। ছেলেটি পাশের ঘরটায় এল। ফ্রান্সিসরা ঘরটায় ঢুকল। দেখল মেঝেয় কয়েকটা কাঠের পাটাতন পাতা তার ওপর শুকনো ঘাসের বিছানা। ওরা হ্যারিকে ধরাধরি করে ঐ বিছানায় শুইয়ে দিল।
ফ্রান্সিসরা কেউ কেউ ঘরের বাইরে গেল। শাঙ্কো বিস্কো দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস বিছানার পাশে রাখা একটা কাঠের আসনে বসল।
হ্যারি দুর্বলকণ্ঠে ডাকল ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি হ্যারির মুখের ওপর ঝুঁকল। বলল–হ্যারি–কেমন আছো? হ্যারি দম নিয়ে নিয়ে বলল–আমি বাঁচবো না।
