–সেটা বলতে। খুব বেঁচে গেছি আমরা। এখন হ্যারি সুস্থ হলেই নিশ্চিন্ত হবো। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি একবার মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, রাজকুমারী যে আমার জন্যে কতকিছু করছেন–এ জন্যে
–ওসব থাক। হ্যারি তুমি ভালো হয়ে উঠবেই। আমার মন বলছে। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি মৃদু হাসল। বন্ধুদের শুভেচ্ছায় হয়তো ও সুস্থ হবে। হ্যারি এটাই ভাবে।
সেদিন ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে। হঠাৎ হ্যারির আবার জ্বর এলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভীষণ প্রচণ্ড জ্বর এল।
ফ্রান্সিসের কাছে খবর গেল। ফ্রান্সিস ছুটে এল। হ্যারির কপালে গলায় হাত বুলিয়ে যেন বুঝতে পারল–ভীষণ জ্বর। হ্যারি কেমন আচ্ছন্নের মত শুয়ে রইল। ফ্রান্সিস ভেনকে ডেকে পাঠাল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ভেন ওর ওষুধপত্র নিয়ে চলে এল। হ্যারির মুখ গলা দেখল। নাভি দেখল। বিড়বিড় করে বলল–মারাত্মক সময়টা কেটে গেছে। এখন তো সুস্থ হওয়ার কথা।
ভেন বসে ওষুধ তৈরি করতে লাগল। মারিয়াকে ওষুধ বুঝিয়ে দিল। কখন কোনটা খেতে হবে বলল। তারপর চারদিকে তাকিয়ে দেখল এক কোনায় শাঙ্কো বসে আছে। নিজে উঠে শাঙ্কোর কাছে এল। বলল-বাইরে এসো। শাঙ্কো ভেন-এর পেছনে পেছনে বাইরে এল। ভেন গলা নামিয়ে বলল,
-হ্যারির অবস্থা ভালো নয়। ফ্রান্সিসূকে ডাকো। আমি এখানে দাঁড়ালাম।
শাঙ্কো দ্রুত ছুটে গেল। একটু পরেই ফ্রান্সিসকে সঙ্গে নিয়ে এল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে! হাঁপাতে বলল–ভেন কী হয়েছে?
হ্যারির অবস্থা ভালো নয়। নাক মুখ ফুলতে শুরু করেছে। যতদূর আমার বিদ্যেয় কুলোয় করেছি। এখন একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে দেখাতে হবে।
–কিন্তু এখন এখানে কোথায় অভিজ্ঞ চিকিৎসক পাবো? পাবো। ফ্রান্সিস বলল।
উপায় নেই। সামনেই যে বন্দর পাবে সেখানে খুঁজে নিতে হবে। কালকে সকালের মধ্যেই কোন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে দেখাও। আমার যা সাধ্য আমি করেছি। ভেন বলল।
–তাহলে ভেন আজ রাতের মধ্যেই যে করে তোক কোন বন্দরে পৌঁছতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ। দেরি করো না। জাহাজ চালাও। আমি ওষুধ তৈরি করতে যাচ্ছি। ভেন চলে গেল।
ফ্রান্সিসের পিঠে আলগা চাপড় মেরে ভেন চলে গেল।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল–সবাইকে ডেক-এ আসতে বল। আমি কিছু বলবো। শাঙ্কো দ্রুত চলে গেল। বন্ধুদের ফ্রান্সিসের কথা বলল।
অল্পক্ষণের মধ্যে বন্ধুরা সব ডেক-এ উঠে এল। আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ। জ্যোৎস্না পড়েছে সমুদ্রের বড় বড় ঢেউয়ের ওপর। ঠাণ্ডা হাওয়া ছুটেছে।
ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এল। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল–ভাইসব। আমরা খুবই বিপদে পড়েছি। হ্যারির আবার জ্বর এসেছে। ভীষণ জ্বর। ভেন চিকিৎসা করছে। ভেন কিছুক্ষণ আগে আমাকে বলল–যদি কাল সকালের মধ্যে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে না পাওয়া যায় তবে হ্যারি–ফ্রান্সিস দুহাতে চোখ বন্ধ করল। একটু ফুঁপিয়ে উঠল। বলল–তবে হ্যারি বাঁচবে না।
শ্রোতা বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। বিস্কো বলল–তাহলে এখন আমরা কী করবো?
যত দ্রুত সম্ভব জাহাজ চালিয়ে একটা বন্দরে পৌঁছতে হবে। তারপর হ্যারির ভাল চিকিৎসা কালকে সকালের মধ্যে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–একজন দাঁড় টানতে চলে যাও। অন্যদল সব পাল খুলে দিয়ে পালগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বেশি করে বাতাস ধরাবে। পেড্রোফ্রান্সিস থামল। দেখল পেড্রো মাস্তুল বেয়ে উঠছে। ফ্রান্সিস মৃদু হাসল।
সব ভাইকিংরা ধ্বনি তুলল–ও–হো–হো।
সবাই কাজের জায়গায় চলে গেল। একদল পাল ঠিক করতে লাগল। আর কয়েকজন হাল ঠিক রাখল। অন্য দল দাঁড়ঘরে চলে গেল।
ফ্রান্সিস জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে এল।
বলল–ফ্লেজার-জাহাজ যাতে চূড়ান্ত গতিতে যায় তার ব্যবস্থা করেছি। এবার তোমার কাজ–যে ভাবে পারো জাহাজের গতি বাড়াও। ফ্লেজার মাথা কাত করে বলল–ঠিক আছে।
তখন আস্তে আস্তে জাহাজের গতি বাড়তে লাগল। বেগবান বাতাসে পালগুলো ফুলে উঠল। জাহাজ পূর্ণগতিতে চলল।
শাঙ্কো দাঁড়িদের ঘরে এল। দেখল বন্ধুরা প্রাণপণে দাঁড় টানছে। দুসারি দাঁড়িদের মাঝখানে গিয়ে শাঙ্কো দাঁড়াল। তারপর হাততালি দিয়ে দিয়ে শরীর ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ধ্বনি তুলল–ও–হো–হো-। ওপরে ডেক থেকে ভেসে এল–ও–হো–হো–ধ্বনি।
জাহাজের গতি অনেক বেড়ে গেল।
দাঁড়ঘরে শাঙ্কো তখন দাঁড় টানার দ্রুত ছন্দের সঙ্গে সঙ্গে শরীর দোলাতে লাগল। আর মুখে শব্দ করতে লাগল–ওহহাওহো! মাস্তুলের মাথায় বসে থাকা পেড্রো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারদিক দেখতে লাগল। জ্যোৎস্না উজ্জ্বল। সমুদ্রের বুকের অনেক দূর দেখা যাচ্ছে। আজ সমুদ্রের বুকে কুয়াশা কম।
দ্রুতগতিতে জাহাজ চলল।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–একজন একজন করে খেয়ে এসো। জাহাজের গতি যেন কমে না।
গভীর রাত তখন। দাঁড়িরা কেউ কেউ পরিশ্রমে কাতর হয়ে শুয়ে পড়ছে। যেখানে অন্যেরা এসে বসছে। দাঁড় বাওয়া চলছে। ওদিকে পাল টেনে টেনে মুখ ঘুরিয়ে বাতাস বেশি আসছে পালে। ফ্লেজার হুইল ঘুরিয়ে চলেছে।
রাত শেষ হয়ে আসছে। আকাশ সাদাটে হয়ে গেছে। তারাগুলো আর দেখা যাচ্ছে না। ফ্রান্সিস সারা জাহাজ ঘুরে ঘুরে বন্ধুদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে।
পূব আকাশে লাল রঙের ছোপ।
মাস্তুলের ওপর থেকে পেড্রো চেঁচিয়ে বলল–ডাঙা দেখা যাচ্ছে, ডাঙা। জাহাজে ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল– ও–হো–হো। ওদের আনন্দের ধ্বনি।
