মারিয়া জল এনে একটা হলুদ রঙের বড়ি হ্যারিকে খাওয়াল। হ্যারির কপালে গলায় হাত দিয়ে দেখে বলল-জ্বর আছে।
ভেন চেটে খাওয়ার জন্যে মারিয়াকে ওষুধ দিল। তারপর বলল–হ্যারির মাথায় জল দিতে হবে। জ্বর কমাবার জন্যে। মারিয়া বলল–বালতি আর বড় গ্লাশ জোগাড় করতে।
ভেন বেশ আস্তে বলল–ফ্রান্সিস বাইরে এসো। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। দেখল–হ্যারি চোখ বুজে শুয়ে আছে।
ঘরের বাইরে এসে ভেন বলল–হ্যারিকে মারাত্মক নীলমাছি হুল ফুটিয়েছে। হ্যারির বাঁচবার আশা নেই।
বলো কি? ফ্রান্সিস ভীষণভাবে চমকে উঠল।
–হ্যারিরা জাহাজে, বাড়িতে মৃত মানুষ দেখেছে; সবাই এই নীলমাছির হুল ফোঁটানোর জন্যে মারা গেছে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস দু’হাতে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে উঠল। ভেন বলল–একটা ব্যাপার বলা যায় যে হ্যারিকে একটা নীলমাছি একবারই হুল ফুটিয়েছে দুবার হুল ফোঁটালে এতক্ষণে মারা যেত। হ্যারির ওষুধগুলো খাইও। এখন ওষুধ কতটা কাজ করে তাই দেখার।
–তবে কি হ্যারি সুস্থ হবে?
–দেখা যাক। আমার কয়েকটা কথা জানার আছে। তুমি শাঙ্কোকে পাঠিয়ে দাও। মুখ চোখ মুছে যাও। তুমি কেঁদেছো এটা হ্যারি যেন না বুঝতে পারে। যা বললাম তা কাউকে বলবে না। বিশেষ করে রাজকুমারীকে তো বলবেই না।
ফ্রান্সিস চলে গেল। একটু পরেই শাঙ্কো এল। বলল, তুমি আমাকে
–হ্যাঁ। তোমার কাছ থেকে কিছু জানার আছে।
–বেশ। বলল। শাঙ্কো বলল।
–মাছিটা হ্যারির শরীরের কোথায় হুল ফুটিয়েছিল? ভেন জানতে চাইল।
ঘাড়ে। শাঙ্কো বলল।
–একবারই তো হুল ফুটিয়েছিল? ভেন বলল।
–হ্যাঁ। শাঙ্কো বলল।
–দুবার নয়? সে আবার জানতে চাইল।
–না। শাঙ্কো বলল।
–মাছিটা কোথা থেকে এসেছিল? ভেন জানতে চাইল।
–ঘরটার অন্ধকার কোণা থেকে। শাঙ্কো বলল।
–তার মানে মাছিটা অন্ধকারে ছিল। ভেন বলল।
–হ্যাঁ। শাঙ্কো বলল।
–হুঁল ফোঁটানোর পর হ্যারি কী বলেছিল? ভেন জানতে চাইল।
–ঘাড়টা যেন অবশ হয়ে গেল। হ্যারি বলেছিল। শাঙ্কো বলল।
–হুঁ বুঝলাম। ভেনের মুখ গম্ভীর হল।
ভেন হ্যারির কেবিনঘরে ঢুকল। বলল–ফ্রান্সিস একটু বাইরে এসো। ফ্রান্সিস ঘরের বাইরে এল। ভেন বলল–আমার যা সন্দেহ হয়েছিল তাই ঘটেছে। এক ধরনের মাছি আছে। প্রাণঘাতী মাছি। মানুষের গায়ে দুবার হুল ফুটোলে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। এই মাছিগুলো দিনের বেলায় অন্ধকার জায়গায় থাকে। সন্ধ্যের বেশ পরে–অন্ধকার জায়গা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। প্রায় সারা রাত উড়ে বেড়ায়। মানুষ, ঘোড়ার গায়ে হুল ফুটিয়ে দেয়। তাতে মানুষ ঘোড়া মারা যায়। ভোর হতেই বনের মধ্যে অন্ধকার জায়গায় লুকিয়ে থাকে। একটু থেমে বলল–হ্যারিরা যে জাহাজটায় জাহাজীদের মৃত দেখে এসেছে লোকজনের বাড়িতেও মৃত মানুষ দেখে এসেছে তারা সবাই এই মাছিদের হুল ফোঁটানোর জন্যে মারা গেছে। একটু থেমে ভেন বলল আমাদের একমাত্র হ্যারি ছাড়া আর কারো গায়ে হুল ফোঁটাতে পারে নি। আমরা এখনও নিরাপদ। তুমি যত শিগগির সম্ভব জাহাজ ছাড়ো। এই তল্লাট ছেড়ে পালাও।
–ঠিক আছে। আমি বলছি। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস ঘরের সামনে দাঁড়ানো এক বন্ধুকে বলল–ভাই তুমি সবাইকে খবর দাও যেন সবাই ডেক-এ আসে। বন্ধুটি চলে গেল।
কিছু পরে শাঙ্কো এল। বলল–ফ্রান্সিস চলো। সবাই এসেছে। মারিয়া এগিয়ে। এসে বলল–আমি যাবো?
–না তুমি হ্যারিকে দেখ। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এল। দেখল বন্ধুরা এসেছে। ফ্রান্সিস বলতে লাগল– ভাইসব– আমরা একটা সাংঘাতিক সমস্যায় পড়েছি। এই অঞ্চলে এক ধরনের হুলওয়ালা নীল রঙের মাছি আছে। মানুষের শরীরে এরা হুল ফোঁটায়। একবার কামড়ালে মানুষ বাঁচে। কিন্তু দুবার কামড়ালে তার মৃত্যু অবধারিত। আমাদের বন্ধু হ্যারিকে সেই মাছি একবার হুল ফুটিয়েছে। হ্যারি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এই মাছিরা দিনের বেলা অন্ধকার জায়গায় আত্মগোপন করে থাকে। সন্ধ্যে হলেই বেরোয়। ফ্রান্সিস থামল।
তারপর বলল–কাজেই আমরা স্থির করেছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা এই তল্লাট ছেড়ে পালাবো। রান্না হয়ে এসেছে। চান খাওয়া সেরে আমরা জাহাজ চালাবো। দেখি–কোন বন্দর পাই কিনা। ফ্রান্সিস চুপ করল। বন্ধুরা সবাই চলে গেল। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–তা হলে পালানোটাই স্থির করলে?
এ ছাড়া কোন উপায় নেই। খাওয়া দাওয়া হলেই জাহাজ ছেড়ে দাও। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা খুব তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে নিল। পেড্রো মাস্তুলের মাথায় উঠে গেল। দাঁড়ঘরে দাঁড়িরা গিয়ে লম্বা বৈঠায় হাত লাগাল। সব পাল খুলে দেওয়া হল। জাহাজ কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্রুত চলতে লাগল।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে দেখতে এল। মারিয়া হ্যারির কপাল থেকে জল-পট্টিটা খুলে রাখল। ফ্রান্সিসকে বলল–ভেন বলেছে–লক্ষণ খুব ভাল। হ্যারির জ্বর অনেক কমে গেছে। তবে এখনও সম্পূর্ণ ছেড়ে যায় নি। তবে কমের দিকে। হ্যারি ডান হাতটা ফ্রান্সিসের দিকে বাড়াল। ফ্রান্সিস ওর হাতটা জড়িয়ে ধরল। হ্যারি শুকনো মুখে অল্প হাসল। ফ্রান্সিস বলল
–কিছছু ভেব না। ভেন আমাকে বলেছে তুমি তাড়াতাড়িই সুস্থ হবে। ভেন এর ওষুধ কাজ করছে।
–ফ্রান্সিস–কী ভয়ানক জায়গা থেকে আমরা পালিয়ে আসতে পেরেছি। মারিয়া বলল।
