জ্যোৎস্না বেশ উজ্জ্বল। সবকিছুই মোটামুটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। হ্যারি দেখল জাহাজের মাথায় পোর্তুগালের পতাকা উড়ছে। তার মানে পর্তুগীজদের জাহাজ।
প্রথমে হ্যারি জাহাজটার ডেকে উঠে এল। হ্যারি আশ্চর্য এক দৃশ্য দেখল। জাহাজের ডেক-এ পাঁচ-সাতজন জাহাজী শুয়ে আছে। শাঙ্কোও উঠে এসে এই দৃশ্য দেখল। দুজনেই অবাক। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সবাই মৃত। মৃত জাহাজীদের গায়ে পোর্তুগীজ পোশাক। বোঝা যাচ্ছে সবাই পোর্তুগীজ। কিন্তু ওদের শরীরে কোথাও অস্ত্রাঘাত নেই। শাঙ্কো মৃতদেহগুলোর কাছে গেল। না। ওদের গায়ে কোথাও রক্ত লেগে নেই। তাহলে ওরা কিভাবে মারা গেল?
হ্যারি বলল–শাঙ্কো–বোঝা যাচ্ছে না এরা কিভাবে মারা গেল! আশ্চর্য ব্যাপার।
–এখন কী করবে? শাঙ্কো বলল।
চলো। তীরে নামি। লোকজনের দেখা পাই কিনা। হ্যারি বলল।
হ্যারি আর শাঙ্কো জাহাজ থেকে নৌকোয় নামল। একটু এগিয়ে তীরভূমিতে এল। চলল পায়ে চলা পথ ধরে। হাঁটতে হাঁটতে হ্যারি বলল–শাঙ্কো–একটা জিনিস লক্ষ্য করেছো?
–কী? শাঙ্কো বলল।
–এই মৃতদের সবারই মুখচোখ খুব ফোলা। এর কারণ বুঝছি না। হ্যারি বলল।
–যে অসুখে ওরা মারা গেছে, সেটা একই অসুখ। শাঙ্কো বলল।
হ্যারি বলল–এখন জানা দরকার ঐ প্রাণঘাতী অসুখটা কী?
পায়ে চলা রাস্তাটা বনভূমিতে ঢুকেছে। ওরা বনে ঢুকল। এতদূর আসার সময় কোন ঘরবাড়ি দেখল না।
বন থেকে বেরিয়ে এসে সামনেই দেখল দু’তিনটে পাথরের বাড়ি। ওপরে, শুকনো গাছের আচ্ছাদন।
সামনের প্রথম বাড়িটার কাছে গেল ওরা। দরজায় টোকা দিল। কিন্তু ভেতরে কোন সাড়াশব্দ নেই। শাঙ্কো আবার টোকা দিল। ভেতর থেকে কোন সারা শব্দ পাওয়া গেল না।
হ্যারি এগিয়ে এসে দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। আলোছায়ার মধ্যে দিয়ে দেখল বিছানায় দুজন নারী পুরুষ শুয়ে আছে। একটা ছেলেও পাশে শুয়ে আছে। দেখে বোঝা গেল–এরা সবাই মৃত। হ্যারি কাছে গিয়ে দেখল–সবারই মুখ ফোলা। তাহলে জাহাজে আর এখানে সবাই একই অসুখে মারা গেছে।
দুজনে বেরিয়ে এল। হ্যারি বলল–চলো ঐ বাড়িটায় যাই। অন্য একটা বাড়িতে ওরা এল। দরজা খোলা। দেখল তিনটি বড় মানুষ আর একটি শিশু মরে পড়ে আছে। এদেরও মুখচোখ ফোলা। কী অসুখ হয়েছিল এদের? হ্যারি ভাবল। শাঙ্কোকে বললোও কথাটা।
আরও কয়েকটা পাথরের বাড়ি এদিকে ওদিকে আছে। হ্যারি বলল–শাঙ্কো কী করবে?
–বোঝাই যাচ্ছে–এক মারাত্মক অসুখে এখানে থাকতো যারা তারা সবাই মারা গেছে।
–ঠিক। যে বাড়িতেই যাবো সেখানেই মৃত মানুষ দেখবো। চলো জাহাজে ফিরি। ওরা ঘরের বাইরে আসার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তখনই ঘরটার অন্ধকার কোণা থেকে একটা বড় আকারের মাছি উড়ে এল। হ্যারির ঘাড়ে বসল। হ্যারি মাছিটাকে দেখল। মাছিটার সারা শরীর গভীর নীল। পাখা কালো। হ্যারি হাত দিয়ে মাছিটা তাড়াতে গেলে তখনই মাছিটা হুল ফোঁটাল। ছুঁচ ফোঁটার মত লাগল। হ্যারির ঐ হুল ফোঁটানো জায়গাটা অবশ হয়ে গেল। হ্যারি চেঁচিয়ে বলল–শাঙ্কো জলদি। পালাও। হারি এক লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। মাছিটা শাঙ্কোর দিকে দ্রুত উড়ে এল। শাঙ্কো এক লাফ দিয়ে ঘরের বাইরে এল। দেখল মাছিটা অন্ধকার কোণায় উড়ে যাচ্ছে।
-পা চালাও। হ্যারি বলল। দুজনে ছুটে চলল সমুদ্রতীরের দিকে।
নৌকো বেয়ে ওরা জাহাজে উঠল। ফ্রান্সিস রেলিঙে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। সঙ্গে মারিয়া। হ্যারি আর শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। দুজনেই একটু হাঁফাচ্ছে তখন। হ্যারি যা যা ঘটেছে বলল। অবশেষে বলল-পেটটা নীল, পাখা কালো এরকম মাছি আমি কখনও দেখিনি। এগুলোর হুলও আছে। আমাকে ঘাড়ের কাছে হুল ফুটিয়েছে। জায়গাটা অসাড় হয়ে গেছে।
–এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার। তুমি এখন কেমন বোধ করছো? ফ্রান্সিস বলল।
–অসাড় ভাবটা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। ভীষণ দুর্বল লাগছে। ফ্রান্সিস পাশে দাঁড়ানো বিস্কোকে বলল–ভেনকে ডেকে আনন। একটু পরেই ভেন এল। হ্যারিকে জিজ্ঞেস-টিজ্ঞেস করে ওর শরীরটা টিপে টিপে দেখল। নাড়ি টিপে দেখল। বলল–হ্যারির শরীর গরম। জ্বর আসছে। কথা হচ্ছে; তখনই হ্যারি আস্তে আস্তে ডেক-এ বসে পড়ল।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। হ্যারিকে কেবিনঘরে জড়িয়ে ধরে নিয়ে চলল। ভেনকে বলল–ভেন কেবিনঘরে চল। হ্যারিকে ওষুধ দাও।
ভেন বলল–ওষুধ নিয়ে আসছি।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো হ্যারিকে ধরে ধরে ওর কেবিনঘরে নিয়ে এল।
হ্যারি আর বসে থাকতে পারল না। শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসরা কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ঐ কেবিনঘরের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল। মারিয়াও ছিল তাদের মধ্যে।
ভেন ওর ওষুধের বোয়াম পুঁটুলি এসব নিয়ে এল। ভেনকে মাছির হুলের কথা বলা হয়নি। হ্যারি বুঝল ভেনকে এটা জানানো দরকার। হ্যারি বলল– ভেন একটা বাড়িতে ঢুকেছিলাম। অন্ধকার কোণা থেকে একটা বেশ বড় নীলরঙের মাছি উড়ে এসে আমাকে হুল ফুটিয়েছিল।
–এটা তো আগে বলোনি। ভেন বলল।
–বিশেষ গুরুত্ব দিই নি। হ্যারি বলল।
–না-না। ওটাই আসল কথা। এই জ্বর দুর্বলতার কারণ ঐ নীলমাছি।
ভেন কিছুক্ষণের মধ্যেই ওষুধ বানাল। ফ্রান্সিসকে বলল–তিনটে বড়ি দিলাম। এখন একটা খাইয়ে দাও অন্য দুটি দুপুর রাতে খাওয়াবে। মারিয়া এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসকে বলল–ওষুধ আমাকে দাও। আমি খাওয়াবো। ফ্রান্সিস মারিয়াকে বড়ি তিনটি দিল।
