জাহাজের কাছে এসে দেখল পাটাতন তুলে রাখা হয়েছে। সমুদ্রের পার থেকে শাঙ্কো দুহাতের চেটো গোল করে ডাকল–হ্যারি, বিস্কো। জাহাজে কারো কোনো সাড়া নেই। আবার ডাকলো। সাড়া নেই। শাঙ্কো পথ থেকে একটা ইটের টুকরো তুলে জাহাজ লক্ষ্য করে ছুঁড়ল। জাহাজের গায়ে লেগে ঢিলটা জলে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস বলল-দাঁড়াও-জাহাজের ডেক-এ ঢিল ফেলতে হবে। রাত হয়েছে। গরমের দিন। কেউ না কেউ ডেক-এ নিশ্চয়ই শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস ঢিল তুলে ছুঁড়ল। ঠিক ডেক-এই পড়ল ঢিলটা। কারো গায়ে লেগেছে নিশ্চয়ই। কার চিৎকার শুনল–কে রে ঢিল ছোঁড়ে।
শাঙ্কো চিৎকার করে বলল–রেলিঙের ধারে আয়। নইলে আবার ঢিল ছুঁড়বো।
ভাইকিং বন্ধুদের কয়েকজন রেলিং-এর কাছে এল। শাঙ্কো আবার চিৎকার করে বলল–ফ্রান্সিস আর আমি এসেছি। পাটাতন পেতে দে।
এইবার ভাইকিংরা বুঝল ফ্রান্সিস শাঙ্কো ফিরে এসেছে। ওরা চিৎকার করে ধ্বনি তুলল– ও–হো–হো। জাহাজের রেলিং-এর ধারে ভিড় করে দাঁড়ালো ওরা। পাটাতন পেতে দেওয়া হল। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো পাটাতন দিয়ে হেঁটে ডেক এ উঠে এল। আবার ধ্বনি উঠল–ও–হো–হো।
বন্ধুরা কেউ কেউ ছুটে এসে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোকে জড়িয়ে ধরল।
মারিয়া ফ্রান্সিসের কাছে এল। মুখ চোখ শুকনো। চোখের নিচে কালচে ভাব। শরীরও কিছুটা শীর্ণ। ফ্রান্সিস সবই দেখল। বলল–আমি অভিযানে বের হলে তুমি যদি ভেবে ভেবে শরীর খারাপ করে ফেল তাহলে আমাকে তো এখন দেশে ফিরে তে, যেতে হয়।
–আর দুশ্চিন্তা করবো না। এখন থেকে মন শক্ত করবো। মারিয়া আস্তে বলল।
দুজনে কেবিনঘরের দিকে চলল। ফ্রান্সিস যেতে যেতে রাঁধুনি বন্ধুকে পেল। বলল–প্রায় উপোস করে আছি। যা হোক কিছু খেতে দাও। শাঙ্কোকেও দিও।
ওদিকে শাঙ্কো তখন বন্ধুদের কাছে হাত পা নেড়ে ওদের স্বর্ণখনি অভিজ্ঞতার কথা বলছে।
ফ্রান্সিস আর মারিয়া নিজেদের কেবিনঘরে এল। ফ্রান্সিস বিছানায় বসল। বলল–একবার শাঙ্কোর কাছ থেকে চামড়ার ঝোলাটা নিয়ে এসো তো। মারিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
একটু পরে ঝোলাটা নিয়ে এল। ফ্রান্সিস হাত ঢুকিয়ে একটা সোনার পিণ্ড তুলল। মারিয়া অবাক হল না। এরকম গুপ্তধন ও আগেও দেখেছে। ফ্রান্সিস বলল–এই স্বর্ণভাণ্ডারের কে মালিক জানতে পারিনি। কাজেই কিছু সোনার পিণ্ড আমরা নিয়ে এলাম।
কীভাবে আবিষ্কার করলে?
-সেটা শোন। আসলে ওটা ছিল সোনার খনি। সোনার গুঁড়ো মেশানো পাথর গালিয়ে সোনা বের করা হত।
তারপরে ফ্রান্সিস সোনার খনির কথা বলতে লাগল। মারিয়া সেই উদ্ধারের কাহিনী শুনতে লাগল।
হীরক সিন্দুকের সন্ধানে
তখন সকাল হয়েছে। নজরদার পেড্রো মাস্তুলের মাথায় ওর জায়গা ছেড়ে নিচে নেমে এল। চলল ফ্রান্সিসের কাছে।
পেড্রো ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের দরজায় টোকা দিল। ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়েই বলল–এসো। পেড্রো ঢুকল। বলল–ফ্রান্সিস–একটা অদ্ভুত ঘটনা।
-কী ঘটনা? ফ্রান্সিস জানতে চাইল। –
-এরকম ঘটনা। ভয়ের কথা।
–সোজা বল না বাপু-ঘটনাটা কী?
–এখানে ছোট্ট বন্দর মত দেখলাম।
–আরো জাহাজ নোঙর করে আছে?
–হ্যাঁ। তবে একটা মাত্র জাহাজ।
বেশ এবার বলো।
কী আর বলবো। অদ্ভুত ঘটনা।
ফ্রান্সিস এবার সত্যিই রেগে গেল। গম্ভীর স্বরে বলল–এখনও বলো অদ্ভুত ঘটনাটা কী? নইলে বিদেয় হও।
–মাস্তুল থেকে দেখলাম একটা ছোট জাহাজ নোঙর করা আছে। অদ্ভুত ব্যাপারটা হল জাহাজটায় জনপ্রাণী নেই। মানুষ তো দূরের কথা একটা ঘোড়াও নেই।
ফ্রান্সিস একটু ভেবে নিয়ে বলল–হয়তো বন্দরে নেমে খেতে টেতে গেছে।
–আমি ঘণ্টা পাঁচেক এক নাগাড়ে নজর রেখেছি। কেউ জাহাজটায় উঠলোও না নামলোও না।
–হুঁ, এটা একটু ভাববার কথা। ফ্রান্সিস বলল–তবে ভয় পাওয়ার মত কিছু নয়।
তাহলে কী করবে এখন? পেড্রো বলল।
–ঐ জাহাজটায় যেতে হবে। কী ব্যাপার সেটা জানতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
কে কে যাবে? পেড্রো জানতে চাইল।
–হ্যারি আর শাঙ্কোকে ডাকো। ওরাই যাবে। জাহাজের লোকদের সঙ্গে কথা বলবে–জানবে আমরা কোথায় এলাম।
পেড্রো হ্যারি আর শাঙ্কোকে ডাকতে গেল।
একটু পরেই হ্যারি আর শাঙ্কো এল। হ্যারি বলল,
–কী ব্যাপার ফ্রান্সিস?
–পেড্রো একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখেছে। তীরের কাছে একটা জাহাজ নোঙর করে আছে। পেড্রো দেখেছে জাহাজটা থেকে কোন মানুষ বেরোয় নি, ঢোকেও নি। জাহাজে কোন জনপ্রাণী নেই।
হ্যারি ব্যাপারটা ভাবল। বলল–ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুতই। এখন আমরা কী করবো?
জাহাজটায় যেতে হবে। লোকজন আছে কিনা দেখতে হবে। যদি কাউকে পাওয়া যায়। তাহলে বুঝতে পারবো দেশের দিকে যাচ্ছি কিনা। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। শাঙ্কোকে নিয়ে যাবো। হ্যারি বলল।
–তাই যাও। এখনই যাও। দেরি করো না। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস এই ব্যাপারটা কী হতে পারে বলে তোমার মনে হয়?
–ঠিক বুঝতে পারছি না। জাহাজটায় গিয়ে উঠলেই সঠিক জানা যাবে রহস্যটা কী।-ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। শাঙ্কোকে নিয়ে আমি যাচ্ছি। হ্যারি বলল।
কিছু পরে হ্যারি আর শাঙ্কো তৈরি হয়ে এল। দড়ির মই দিয়ে ছোট নৌকোয় নামল। শাঙ্কো নৌকো চালাল জাহাজটার দিকে।
জাহাজটার কাছে আসতে বেশি দেরি হল না। শাঙ্কো নৌকোটা জাহাজের গায়ে লাগাল। হালের কাছে দড়ি ধরে শাঙ্কো আগে উঠল। পেছনে উঠল হ্যারি।
