দলপতি মুখ হাঁ করে শুনল।
-সরাইখানায় চলো। ফ্রান্সিস বলল। ভোর হল। ভোরের নিস্তেজ রোদ ছড়ানো চারপাশে। একটা ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে গেল।
ফ্রান্সিস গাছটার কাণ্ড থেকে বাঁধা মোটা দড়িটা খুলে নিয়ে ঐ গাছটার তলাতেই বসল। চকমকি পাথর মশাল সব গাছটার নিচে রেখে দিল। তারপর গাছটার একটা ভাঙা ডাল দেখিয়ে বলল–একটা ডালভাঙা গাছ। এটা দেখলেই বুঝবেন এখানেই আছে সোনার খনি। একটু হেসে বলল
চলো–সরাইখানায় যাবো।
তিনজনে চলল শহরের দিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরে এলো।
সরাইখানায় উঠল।
সকালের খাবার খেতে খেতে শাঙ্কো দলপতির দিকে তাকিয়ে বলল–এখন আপনি কী করবেন?
–দুপুরের খাবার খেয়ে আমি আমার রাজত্বে চলে যাবো। এখানে কী কী করেছি গুপ্ত সোনার খনি আপনারা কীভাবে পেলেন–সেসব মহামান্য রাজাকে বলবো। তারপর মহামান্য রাজা যা করতে চান করবেন। আমার কর্তব্য এইটুকুই ছিল। তা আমি পালন করেছি। দলপতি বলল।
ফ্রান্সিস ডাকল–শাঙ্কো–আমরা কী করবো। যে কাজটা করবো বলে স্থির করেছিলাম তা তো হয়ে গেল।
-চলো আমরাও দুপুর নাগাদ বেরিয়ে পড়ি। একটা শস্যটানা গাড়ি পেলে ভালো হত। খুব তাড়াতাড়িই গ্যালিগস বন্দর শহরে পৌঁছে যেতাম।
-না-না, মাফ কর ফ্রান্সিস। শস্যটানার গাড়িতে আমি আর উঠছি না। কী অবস্থা হয়েছিল আমার। শাঙ্কো বলল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–ঠিক আছে–হেঁটে চল। কিন্তু অনেক দেরি হবে পৌঁছোতে।
–হোক। গাড়িতে যাবো না। শাঙ্কো বলল।
–বেশ বাবা তাই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
দুপুরের খাওয়া খেল তিনজনে। ফ্রান্সিসরা একটু শুয়ে বসে বিশ্রাম করল। দলপতি আর বসল না। নিজের দেশের দিকে রওনা হল। ঘোড়াটা এক ছোকরা নিয়ে এল। সেনাপতি তাকে কিছু মূল্য দিল।
–আপনার রাজাকে বলবেন সোনা বিক্রি করে উনি অনেক অর্থ পাবেন। ঐ সব অর্থ দিয়ে গরীব প্রজাদের উন্নতির জন্য ব্যয় করবেন। দলপতি হেসে বলল– বলবো। দলপতি ঘোড়ায় উঠলেন। উত্তরমুখো ঘোড়া ছোটাল।
কিছুক্ষণের মধ্যে ফ্রান্সিসরাও তৈরি হল। সব গোছগাছ করে রাস্তায় এলো। শেষ দুপুরে রওনা হল গ্যালিগস বন্দর শহরের দিকে।
বেশ রাত তখন। ফ্রান্সিসদের ভাগ্য ভাল। একটা ছোট বাজারমত পেল। একটি কি দোকানে রুটি মধু পেল। দুজনে পেট পুরে রুটি খেল। দারুণ খিদে পেয়েছিল। খিদে মিটল। রাতের খাওয়াটা হয়ে গেল। খেয়েটেয়ে শাঙ্কো বলল-চলো দেখি রাতে কোথাও থাকার জায়গা পাওয়া যায় কিনা। এই দোকান সেই দোকানে জিজ্ঞেস করল। একজন দোকানদার বলল–একটু দূরে একটা ওক গাছের নিচে, একটা মাংস ডিমের দোকান আছে। ওরা কিছু মূল্যের বিনিময়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। গিয়ে দেখুন।
মুরগী ডিমের দোকান খুঁজে পেল। দোকানদারের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দোকানদারের চেহারা লিকলিকে। কিন্তু গলার স্বর গম্ভীর। বলল–কী চান? মুরগী না ডিম।
–আমরা কিছুই চাই না। শুনলাম আপনার কাছে নাকি খালি ঘরটর আছে। অর্থের বিনিময়ে রাত কাটাবার ব্যবস্থা করে দিন। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনারা রাত কাটাবার জায়গা পাচ্ছেন না–এই তো। দোকানি বলল।
–হ্যাঁ। মড়ার মত ঘুমোবো। কারো কোন অসুবিধার সৃষ্টি করি না।
–ঘুমের মধ্যে নাক ডাকো? দোকানি বলল।
–না। শাঙ্কো মাথা নাড়ল।
–বলছেন। কিন্তু নাক ডাকলেই বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেবো। দোকানি বলল।
বেশ তো। শাঙ্কো হেসে বলল।
তাহলে আসুন। দোকানি বলল।
দোকানদার দোকানের পেছনে এল। দোকানের লাগোয়া একটা ঘর। বুনো খড়ে তৈরি।
ঘরের মধ্যে ঢুকল দোকানি। মোমবাতির আলোয় দেখা গেল তিন চারজন লোক শুয়ে বসে আছে। ওপাশটা খালি। ওখানে দুটো কাঠের পাটাতন পাতা। জায়গাটা দেখল। দোকানদার গম্ভীর গলায় বলল–এই জায়গাটায় থাকবেন। ভাড়াটা আগে দিন। দুটো লোক ভাড়া না দিয়ে শেষ রাতে পালিয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে আমি অগ্রিম নেওয়া শুরু করেছি।
–ঠিক আছে। শাঙ্কো বলল। কোমরের ফেট্টি থেকে দুটো ছোট সোনার চাকতি বের করল। দোকানিকে দিল। দোকানি খুব খুশি। সাধারণত রুপোর চাকতি দেয় সব। এ একেবারে সোনার চাকতি। দোকানি চলে গেল।
ঘরের মেঝেয় রাখা কয়েকটা কাঠের পাটাতন। দুজনে পাটাতনের ওপর বসল। তারপরে ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল।
ওরা কিছুক্ষণ পরে দোকানির কাছ থেকে জল চেয়ে খেল। তারপর শুয়ে পড়ল।
দুজনেই অত্যন্ত ক্লান্ত। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনে ঘুমিয়ে পড়ল।
ভোরে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল ফ্রান্সিসের। শাঙ্কো তখনও ঘুমিয়ে। ফ্রান্সিস আর ওকে ডাকল না। ঘুমোক। কিছুক্ষণ পরে শাঙ্কোর ঘুম ভাঙল। উঠে বসল। হাতমুখ ধুল দুজনে। তারপর সকালের খাবার খেতে চলল। সামনের দোকানেই পেল মাছভাজা আর আধ হাত লাঠির মতো রুটি। দুজনে বেশ ভালোই খেল।
ওরা আর দাঁড়াল না। মুরগীর দোকান থেকে জিনিসপত্র নিয়েই এসেছিল। দুজনে চলা শুরু করল। দুপুরে এক চাষীর বাড়িতে অতিথি হল। পেট পুরে রুটি আনাজের ঝোল খেল।
সন্ধ্যেবেলা। ফ্রান্সিস বলল–একটু রাতে বাজার টাজার গেলে রাতের খাওয়া খাবো। তারপর সারারাত হাঁটবো। রাতে যাবার কোন সমস্যা হবে না।
–শরীর অত ধকল সহ্য করতে পারবে? শাঙ্কো বলল।
-খুব পারবে। জাহাজে পৌঁছে পাক্কা দুই দিন শুধু খাবো আর ঘুমুবো। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে যখন গ্যালিগস বন্দর শহরে পৌঁছল তখন বেশ রাত। দুজনে জাহাজঘাটায় এল। ওদের জাহাজটা যেখানে দেখে গিয়েছিল সেখানেই আছে।
