দলপতি দেখেটেখে বলল–না। আরো দেখুন।
চলল বামন গাছের খোঁজ। একটা ছোট গাছ একটু দূর থেকে দেখে শাঙ্কো বলে উঠল–ঐ যে বামন গাছ। রাস্তার ধারে।
ফ্রান্সিস এগিয়ে এল। গাছটা দেখল। এবার নিশ্চিত হল। এটা একটা বামন গাছ। পাতা ঝরে গেছে। শুকনো ডালগুলো উঁচিয়ে আছে। ফ্রান্সিস একবার চোখ বুজল। চোখ খুলে বললনকশায় ঠিক এরকম গাছই আঁকা। শাঙ্কোকে ডেকে বলল–এই গাছটায় দড়ির একটা দিক ধর। শাঙ্কো তাই করল। ফ্রান্সিস দড়ি টেনে নিয়ে চলল। পাহাড়ের ধারে উঠল। মাত্র একটা বড় পাথরের চাই পেল। বাকি সব ছোট ছোট পাথরের টুকরো।
ফ্রান্সিস পাথরের চাইটা ঘুরে ঘুরে দেখল। তারপর দড়িটা রেখে পাথরের চাইটায় হাত লাগাল। শাঙ্কোও হাত লাগাল। দুজনে চাইটা ওঠাবার চেষ্টা করল। পারল না। একটু উঠেই চাইটা পড়ে গেল।
দলপতি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
শাঙ্কো দলপতিকে বলল–আসুন। হাত লাগান। হাতে ধুলো না লাগিয়ে সোনার খনি পাবেন তা হয় না। দলপতি এল। এবার তিনজনে মিলে পাথরের চাইটা টানল। আস্তে আস্তে পাথরের চাইটা শব্দ করে উঠে গেল। চাঁদের আলোয় দেখা গেল স্পষ্ট কুঁদে-তোলা দাগ। ঠিক চিহ্নটা পাওয়া গেল।
এবার ফ্রান্সিস চামড়ার ঝোলা থেকে চকমকি পাথর বের করল। একটা মশালও বের করল। অন্য মশালটা শাঙ্কোকে দিল। বেশ হাওয়া বইছিল। তার মধ্যেই ফ্রান্সিস চমকি ঠুকে আগুন জ্বালল। মশাল জ্বলে উঠল। শাঙ্কোর হাতের মশালটাতেও আগুন ধরিয়ে দিল।
ফ্রান্সিস দড়ির এক মাথা কোমরে বাঁধল। তারপর জ্বলন্ত মশালটা গুহার অন্ধকার গর্ভে ছুঁড়ে দিল। একটু ভেতরে মশালটা পড়ল। দেখা গেল গুহামত। একজন মানুষ ঢুকতে পারে এরকম গুহা।
ফ্রান্সিস গুহামুখ দিয়ে নামতে লাগল। মশালটার কাছে পৌঁছে আবার মশালটা ছুঁড়ল। মশালটা পড়ে গেল। ফ্রান্সিস বুঝল মশালটা নিচে কোথাও পড়ে গেল। নিশ্চয়ই নিচে গহুরমত কিছু আছে। ফ্রান্সিস বুক দিয়ে প্রায় হিঁচড়ে টেনে চলল। বুকে পিঠে এবড়ো খেবড়ো পাথরের গা লাগছে। কেটেও গেছে বোধহয়।
কিছুটা এগোতেই দেখল গুহা। নিচে একটা গোলামত জায়গা। মশালটা ওখানেই পড়েছে। ফ্রান্সিস গুহামুখ থেকে বেরিয়ে গোলমত জায়গাটায় নামল। বেশি নিচে নয়।
ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ হাঁপালো। ততক্ষণে শাঙ্কোও নেমে এল। দলপতি নামল না। অবশ্য দলপতি ওর ভুড়ি আর মোটা শরীর নিয়ে গুহার মধ্যে দিয়ে আসতে পারতো না। তাই ও নিজেই সাহস করে নামেনি।
দুজনে জ্বলন্ত মশাল তুলে ধরল। দেখা গেল ডানপাশে একটা বড় ঘরের মত জায়গা। দুজনে মশাল নিয়ে সেখানে ঢুকল। দেখল একপাশে স্তূপীকৃত পিণ্ডের মত। একটা পিণ্ড তুলে নিল ফ্রান্সিস। একটা পিণ্ড তুলল। মশালের আলোয় পাথরের গায়ে সোনালি গুঁড়ো চিক্ চিক্ করে উঠল। বুঝল–পাথরের গায়ে গুঁড়ো সোনা। এইসব পাথরের গায়ের সোনা পাথর গালিয়ে বের করা হয়।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–শাঙ্কো এইসব পাথর গালালেই সোনা পাওয়া যাবে।
পাথরের স্তূপ দেখে ডানদিকে ঘুরল। দেখল সোনার পিণ্ড ডাঁই করে রাখা। মশালের আলো পড়তে পিণ্ডমত সোনা চিচিক্ করে উঠল।
শাঙ্কো হেসে ধ্বনি তুলল–ও–হো–হো। ফ্রান্সিস বলে উঠল–কী পাগলামি করছে। এখানে সামান্য শব্দ হলেও ওপরে শোনা যাবে।
এখন কী করবে? শাঙ্কো বলল।
–ওপরে উঠবো।
–এত সোনা–নেবে না? শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। জামা খোল। জামায় যতগুলি পিণ্ড নেওয়া যায় ততটাই নাও।
দুজনে জামা খুলল। সোনার পিণ্ডমত যা পাওয়া গেল তাই ভোলা জামায় বেঁধে দিন।
দুজনে মশাল নিয়ে গুহামুখের দিকে চলল। মশাল ছুঁড়ে দিয়ে প্রথমে ফ্রান্সিস গুহায় ঢুকল। মশালের কাছে গিয়ে আবার ছুঁড়ে দিল মশালটা। সেই আলোয় বুক পিঠ বাঁচিয়ে আস্তে আস্তে উঠতে লাগল। গায়ে জামা নেই। এবড়ো খেবড়ো পাথরের ঘষা খেল। কেটে গেল পিঠ বুক। রক্ত পড়তে লাগল। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো দুজনেরই এক হাল।
গুহামুখ থেকে দুজনে বেরিয়ে এল। দেখল ওল্টানো পাথরে দলপতি বসে আছে। ওরা উঠতেই দলপতি এগিয়ে এল। বলল–সোনার খনি পেয়েছেন?
–হু। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। সোনার একটা পিণ্ড জামার পুটুলি থেকে বের করে দলপতিকে দিল। চাঁদের আলোয় সোনার পিণ্ডটা ঝিকমিক্ করে উঠল। দলপতির মুখ হাঁ।
ফ্রান্সিস বলল–এখানেই পিণ্ডগুলো চামড়ার ঝোলায় ঢেলে রাখা। দুজনেই চামড়ার ঝোলায় সব সোনার পিণ্ড ঢেলে রাখল। ফ্রান্সিস একটা সোনার পিণ্ড দলপতিকে দিল। বলল–জামার ভেতরে রাখুন। দলপতি খুশিতে লাফিয়ে উঠল।
–এবার পাথরের চাঁই ওল্টাতে হবে। হাত লাগাও। ফ্রান্সিস বলল।
তিনজনে পাথরের চাইটা ঠেলে তুলে গুহামুখে উল্টে রাখল। গোল দাগটা ঢাকা পড়ে গেল।
ফ্রান্সিস দলপতিকে বোঝাল–গুহার মুখটা পাথরের চাই দিয়ে ঢেকে দিলাম। গোল দাগটা দেখা যাবে না। আমরা ঐ গুহামুখ থেকে গুহা পার হলাম। বেশ সরু গুহা। তবে বুক দিয়ে হেঁচড়ে হেঁচড়ে যাওয়া যাবে। তারপরেই একটা বড় জায়গা। একটা বেশ বড় ঘরের মত। প্রথমে পাওয়া যাবে স্তূপীকৃত সোনা মেশানো পাথর। সেইগুলো আর এক দফা গলালে সোনা পাওয়া যাবে। অঢেল সোনা।
ফ্রান্সিস থামল। তারপর বলল–বাঁদিকে একটা ঘরমত পাবেন। ওখানে পাথরগুলো থেকে সোনার পিণ্ড তৈরি করে রাখা হয়েছে। স্থূপীকৃত পড়ে রয়েছে সেইখান থেকে আমরা কিছু সোনার পিণ্ড নিয়েছি। এবার অসংখ্য সোনার পিণ্ড পাবেন। এই হল সোনার খনির রহস্য।
