–ফ্রান্সিস জলদস্যুর দল এখনো জানে না ও গাড়ি দু’টোয় কী আছে। সূর্য উঠলে ওরা হীরে দু’টো চিনে ফেলবে। সূর্য ওঠার আগেই আমাদের একটা উপায় বার করতে হবে, যাতে ওরা হীরের খন্ড দুটোকে না চিনে ফেলে।
–তুমি কিছু ভেবেছো? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–হ্যাঁ, বুদ্ধি করে হীরে দুটোকে ঢাকা দিতে হবে। হ্যারি বললো।
–কিন্তু কী করে?
-–তুমি ওদের বেঁটে সর্দারটাকে গিয়ে বলো, যে গাড়ি দু’টোয় বারুদ আছে। বৃষ্টি হলে বারুদ ভিজে যাবে। কাজেই ছেঁড়া পাল দিয়ে গাড়ি দু’টো ঢাকতে হবে।
ফ্রান্সিস একমুহূর্ত হ্যারির দিকে হেসে কাঁধে এক চাপড় দিলো–জব্বর উপায় বের করেছে। বলছি এক্ষুণি, কিন্তু ও ব্যাটা রাজি হবে কি?
–রাজি হবে। তুমি কিন্তু এরকম ভাব করবে যে ঢাকা দিলেও হয়, না দিলেও হয়। সাবধান বেশি আগ্রহ দেখাবে না। তাহলে ওদের মনে সন্দেহ হতে পারে।
–দেখি, ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসকে উঠে দাঁড়াতে দেখে একজন পাহারাদার তরোয়াল উঁচিয়ে ছুটে এলে। ফ্রান্সিস দু’হাত ওপরে তুলে দিল। পাহারাদার এসে বাজখাঁই গলায় বলল–কি হলো তোমার?
–আমাকে ক্যাপ্টেনের কাছে নিয়ে চলো, বিশেষ জরুরী কথা আছে।
–ক্যাপ্টেন এখন ঘুমুচ্ছে। যা বলবার কাল সকালে বলবে।
–না, এখুনি দেখা করতে হবে।
পাহারাদারটা মুখ ভেংচে উঠল–কোথাকার রাজা হে তুমি, যখন খুশী লা ব্রুশের সঙ্গে দেখা করতে চাও–তোমার ভাগ্য ভালো যে এখনো তোমার মাথাটা শরীরের সঙ্গে লেগে আছে, উড়ে যায় নি।
ফ্রান্সিস একবার ভাবলো, লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে উচিত শিক্ষা দেবে কিনা! পরমুহূর্তে ভাবলো, মাথা গরম করলে সব কাজ পন্ড হয়ে যাবে। আগে হীরে দুটোকে ঢাকতে হবে।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–ভাই তোমরা হচ্ছো বীরের জাত, আমাদের মত ভীতু-দুর্বল লোকেদের ওপর কি তোমাদের চোখ রাঙানো উচিত।
পাহারাদারটাও হেসে গোফমুচরে বলল তুমি বড় সর্দারের সঙ্গে কথা বলতে পারো।
ডোরাকাটা গেঞ্জী গায়ে বেঁটে লোকটাই বড় সর্দার। সে কথা কাটাকাটি শুনে এগিয়ে এসে মোটা গলায় বলল–কী হয়েছে!
ফ্রান্সিস বড় সর্দারকে হাত তুলে সম্মান দেখাল। তারপর বললো–দেখুন, একটা কি সমস্যার কথা বলছিলাম।
–কী সমস্যা?
হীরে রাখা গাড়ি দুটোর দিকে হাত দেখিয়ে ফ্রান্সিস বললো–ঐ গাড়ি দু’টোয় প্রচুর বারুদ রাখা আছে। বৃষ্টি হলে সব বারুদ ভিজে যাবে। যদি ছেঁড়া পাল টাল দিয়ে ঢেকে দেওয়ার অনুমতি দেন তাহলে–
–পাগল নাকি? পরিস্কার আকাশ–বৃষ্টি হবে না–বড় সর্দার বললো।
–বলছিলাম, আপনি তো আমার চেয়েও অভিজ্ঞ, জানেন তো। ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি এসব জায়গায় কখন মেঘ করে, কখন ঝড় হয়, বৃষ্টি হয়, মা মেরীও তা জানেন না।
বড় সর্দার ভেবে বললো, হুঁ।
–তাছাড়া ভেবে দেখুন, আমি শুধু আমাদের জন্য বলছি না, আমাদের আর বারুদ দিয়ে কি হবে কিন্তু আপনাদের তো যুদ্ধ-টুদ্ধ করতে হবে, ভেজা বারুদ নিয়ে।
কিন্তু আপনাদের তো যুদ্ধ-টুদ্ধ করতে হবে। তখন কী করবেন?
–হুঁ, তা ঠিক। বড় সর্দার মাথা ঝাঁকাল–কিন্তু তোমরা কেমন বেআক্কেলে হে, যে খোলা ডেকে বারুদ রেখেছো?
–ভিজে গিয়েছিল তাই শুকোতে দিয়েছিলাম।
–অ। যাও, ঢাকা দিয়ে দাও।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে ডাকল। হ্যারি কাছে এলে চোখ টিপে বললো–কেল্লা ফতে! ক্যাপ্টেন রাজী হয়েছে।
ও আরো কয়েকজনকে ডাকল। তারপর গুদোম ঘর থেকে দুটো বড়-বড় ছেঁড়া পালের অংশ এনে ঢাকা দিতে শুরু করলো। বড় সর্দার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। প্রায় অন্ধকারে ও কিছুই বুঝতে পারছিল না। পাল ঢাকা দিয়ে ফ্রান্সিসরা দড়িদড়া দিয়ে শক্ত করে হীরেটাকে গাড়ির সঙ্গে বেঁধে দিলো। ওদের কাজ সারতেই ভোর হয়ে গেল। ভাইকিংদের মধ্যে যারা জেগে ছিল, তারা হীরের গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু আর আলোর খেলা দেখা গেল না। পাল দিয়ে ঢাকা হীরে থেকে দ্যুতি বেরোবে কি করে? জলদস্যুরাও গাড়ি দু’টো বারুদের গাড়ি ভেবে তাকিয়ে দেখলো না। ফ্রান্সিস আর হ্যারির মুখে সাফল্যের হাসি ফুটে উঠলো। যাক্–হীরে দু’টোকে জলদস্যুদের হাত থেকে এখন আপাততঃ বাঁচানো গেছে।
সকাল হলো। এবার জলদস্যুদের ক্যারাভেল জাহাজটা দেখা গেল! পালের গায়ে ক্রশ চিহ্ন। মাস্তুলের মাথায় পতাকা উড়ছে। কালো কাপড়ের মাঝখানে মানুষের কঙ্কাল আঁকা। ফ্রান্সিসদের জাহাজের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা।
একটু বেলা হতেই পাহারাদার জলদস্যুদের মধ্যে ব্যস্ততা দেখা গেল। বড় সর্দার একবার দ্রুত ওদের জাহাজে গেল। তারপর দ্রুত পায়ে ফিরে এলো। জলদস্যুদের মধ্যে বেশ একটা সাজো সাজো রব পড়ে গেল। একটু পরেই কাঠের পায়ে ঠক্ঠক্ শব্দ তুলে একটু খোঁড়াতে-খোঁড়াতে এই জাহাজে এলো লা ব্রুশ। মাথায় বাঁকানো টুপী। গালপাট্টা দাড়ি গোঁফ। কালো জোবরা পরনে, তাতে সোনালী জরির কাজ করা, গলায় ঝুলছে একটা হাঁসের ডিমের মত মুক্তোর লকেট। কোমরে মোটা বেল্ট। তাতে হাতীর দাঁতে বাঁধানো বাঁটের তরোয়াল ঝোলানো। পায়ে হাঁটু অবধি ঢাকা বুট, অন্য পা-টা কাঠের। ডানহাতে ধরা একটা শেকল। শেকলে বাঁধা একটা বাচ্চা চিতাবাঘ। লা ব্রুশ খুব ধীর পায়ে এসে এই জাহাজের ডেক-এ দাঁড়াল। জলদস্যুরা সব চুপ করে পুতুলের মত দাঁড়িয়ে রইলো। লা ব্রুশ একবার চোখ পিটপিট করে চারদিকে তাকিয়ে নিলো। তারপর ভাইকিংদের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমরা ভাইকিং, ভালো জাহাজ চালাও, ভালো যুদ্ধ করো, কিন্তু তোমরা, বড় দরিদ্র, তোমাদের এই জাহাজে মূল্যবান কিসু পাবোনা।
