–হ্যাঁ। কেন? কী ব্যাপার? ফ্রান্সিস বলল।
–আমার পেছনে পেছনে এসো। কোনরকম শব্দ করবে না।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। পাহারাদারের পেছনে পেছনে দরজার কাছে এল। পাহারাদারটি আস্তে দরজা খুলে দিল। দুজনে বাইরে এল। পাহারাদার বলল কোনরকম শব্দ না করে পালিয়ে যাও। ও দেখল একজন পাহারাদার পাথরের দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুচোখ বোঁজা।
ফ্রান্সিস বারান্দা থেকে নিচে নামল। তারপর দ্রুত প্রায় ছুটে চলল মাঠের শেষের দিকে। জ্যোৎস্না কুয়াশা ঢাকা। তার জন্যে আশপাশ সব অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
মাঠ ছাড়িয়ে রাস্তায় এল। ফ্রান্সিস বেশ হাঁপাচ্ছে তখন।
একসময় থামল। ভীষণ হাঁপাতে লাগল।
তখনই দেখল সেই প্রহরী ছুটে আসছে। গলা চড়িয়ে বলল–ভয় পাবে না। আমি বন্ধু।
ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে রইল। প্রহরী কাছে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–তুমি বিভাদাভিয়া যাবে। ঐখানে তোমার এক বন্ধু আছে।
–নাম কী? শাঙ্কো?
–তা জানি না। বিভাদাভিয়া যেতে হলে এই রাস্তা দিয়ে যাবে। এই একটা রাস্তাই সোজা গেলে বিভাদাভিয়া পাবে। এই রাস্তা ওখানেই শেষ। প্রহরী চলে গেল।
ফ্রান্সিস হাঁটতে লাগল।
যেতে যেতেই ভোর হল।
রোদ ছড়ালো। চারদিক আলোয় আলোময় হয়ে উঠল। চারদিকে টানা শস্যক্ষেত। চাষীদের বাড়িঘরদোর।
দুপুর হল। খিদেও পেয়েছে। জল তেষ্টাও পেয়েছে। এক চাষীর বাড়ির সামনে এল। দরজায় আস্তে শব্দ করল। ভেতর থেকে কে বলল–কে?
–আসুন। কথা হবে। ফ্রান্সিস বলল। দরজা খুলে গেল। এক মহিলা দাঁড়িয়ে। বলল–বলুন–কী কাজে এসেছেন।
–আমি বেশ দূর থেকে হেঁটে আসছি। যাবো বিভাদাভিয়া। বড্ড খিদে পেয়েছে। যদি
–আসুন–আসুন। আপনি আমাদের অতিথি। মহিলাটি সরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস ঢুকল। দরজা বন্ধ করে মহিলাটি এসে বলল–এই ঘরে আসুন। একটা ঘরে ফ্রান্সিস ঢুকল। কাঠের পাটাতন পাতা।
–শুয়ে বিশ্রাম করুন। মহিলাটি চলে গেল।
ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। খুব পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে। সারারাত হেঁটেছে পরিশ্রম হবেই। একটা চিন্তা হল। আমি কত হাজার মাইল পার হয়ে এখানে এসেছি। কত রকম মানুষ দেখলাম। কত মানুষ আমাকে অতিথি বলে সাদরে গ্রহণ করেছে। দ্বীপ দেশ এর পার্থক্য আছে কিন্তু মানুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি দয়াহীন কুচক্রী মানুষ যেমন আছে তাদের চেয়ে হাজারগুণ ভালো মানুষেরাও আছে।
কিছুক্ষণ পরে মহিলাটি ফ্রান্সিসকে খেতে দিল। এক গোঁফওয়ালা মধ্যবয়সী লোক ঘরে ঢুকল। বলল-পেট পুরে খাবেন। পাতে যেন কিছু পড়ে না থাকে। ফ্রান্সিস হেসে বলল–আমি খুব ক্ষুধার্ত। আমাকে পেট পুরে খেতেই হবে।
খাওয়া শেষ। মহিলাটি বলল এবার একটু শুয়ে বিশ্রাম করে এখানেই থাকুন রাতটা।
–উপায় নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে বিভাদাভিয়াতে পৌঁছুতে হবে। আচ্ছা–চলি। ভদ্রলোক বললেন–ফেরার পথে এখানে খেয়ে যাবেন।
-ঠিক আছে।
ফ্রান্সিস বাড়ির বাইরে এল। আবার হাঁটা। পরের দিনটাও পথে কাটল। সন্ধ্যের সময় বিভাদাভিয়ায় পৌঁছল। নগরে ঢুকছে তখনই একজন ওর কাছে এল। বলল–আপনি বিদেশি? ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল–হ্যাঁ।
–আপনি ফ্রান্সিস?
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলল।
–শাঙ্কো আপনার বন্ধু? লোকটি বলল।
–হা–শাঙ্কো কোথায়? ফ্রান্সিস বলল।
–আমার সঙ্গে আসুন। লোকটি বলল।
–আপনি কে? মানে-ফ্রান্সিস বলল।
–ভয়ের কিছু নেই। আপনি আমাদের রাজা ব্রাপেন-এর অতিথি। লোকটি বলল।
–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।
একসময় দুজনে বড় মাঠটায় এল। চলল কয়েদঘরের দিকে। কয়েদঘরের কাছাকাছি পৌঁছতেই শাঙ্কো চিৎকার করে উঠল–ওহহহহ। ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। দুজনের চোখেই জল।
রাজা ব্রাপেন-এর কাছে খবর পৌঁছল। রাজা ব্রাপেন ঘোড়ায় চড়ে এলেন।
ফ্রান্সিসদের কাছে এসে ঘোড়া থামালেন। শাঙ্কোকে বললেন
কী? তোমার বন্ধুকে পেয়েছো?
–হ্যাঁ। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। শাঙ্কো বলল।
–আর কী চাও? রাজা ব্রাপেন জানতে চাইলেন।
–যোদ্ধাদের আবাসে আমাদের জন্যে একটা ঘর দিন। শাঙ্কো বলল।
–বেশ। আর কী চাও? রাজা ব্রাপেন জানতে চাইলেন।
–এখন কিছু চাইবার নেই। বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাবো সব।
-বেশ। রাজা ব্রাপেন বিরাট মাঠটা পার হয়ে চলে গেলেন রাজবাড়ির দিকে। শাঙ্কো বলল।
দলপতিকে শাঙ্কো দেখল। দলপতি এগিয়ে এসে বলল–এবার তোমাদের একটা ঘর দিতে হবে। আমার সঙ্গে এসো।
দলপতি মাঠ পার হতে লাগল। পেছনে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো। দলপতি একটা ঘর দেখিয়ে বলল–এটাই তোমাদের ঘর। দলপতি চলে গেল।
ঘরে ঢুকল দুজনে। মোটামুটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘর। ঘাসের বিছানায় বসল দুজনে। শাঙ্কো আস্তে আস্তে ওর সব কথা বলল। ফ্রান্সিস বলল–আমার তো কয়েদঘরে দিনরাত কেটেছে। বলবার মত তেমন কিছু নেই। তবে ঠিক বুঝছি না এই রাজা ব্রাপেন আমাকে নিয়ে এল কেন?
–আমি বলেছিলাম তাই।
–আমার মনে হয় রাজার নিশ্চয়ই কিছু কাজ আছে যেজন্যে আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন আছে।
–হ্যাঁ রাজা ব্রাপেনের লক্ষ্য–সোনার খনি দখল করা। ফ্রান্সিস বলল।
–এখনও তো সোনার খনির হদিশই পাওয়া গেল না। এখনই তার দখল চাই? শাঙ্কো বলল।
–সোনার লোভ বুঝতেই পারছো। এখন আমরা কী করবো? ফ্রান্সিস থামল। তারপরে বলল
সমস্ত ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে–এরকম–সোনার খনি উদ্ধার করতে চাইছে–এই রাজা ব্রাপেন আর হুয়াল্পা আর আত্তারিয়া। কিন্তু আমরা একটা নকশা পেয়েছি। একমাত্র রাজা হুয়াল্পাই আমাদের কাছ থেকে নকল নকশাটা পেয়েছে। অন্য দুজন কোন খোঁজই জানে না। ওরা চায় আমরা উদ্ধার করি আর সোনার খনি ওদের দিয়ে দিই। খনি উদ্ধার করতে পারলে কোন রাজাকে খনির, অধিকার দেব জানি না। তখন এই ব্যাপারটা নিয়ে সাংঘাতিক সমস্যা দেখা দেবে।
