–এই রাস্তা ধরে সোজা চলে যান। যেতে যেতে ডানদিকে তাকাতে তাকাতে যাবেন-দেখবেন একটা মধুবিক্রির দোকান। থামবেন। দেখবেন কাঠ আর পাথরের তৈরি একটা বড় বাড়ি। ওটাই রাজবাড়ি।
যাই সব দেখেশুনে আসি। শাঙ্কো বলল। তারপর রাস্তায় এলো। মালিকের নির্দেশমত চলল। বেশ কিছুটা আসার পর দেখল একটা মধুর দোকান। বেশ ভিড় দোকানে।
এবার শাঙ্কো দোকানের উল্টোদিকে তাকাল। ঠিক। কাঠপাথর আর শুকনো ঘাসের ছাউনি। ও চলল। রাজসভার ফটকের কাছে দু’জন বর্শাধারী প্রহরী।
রাজসভাঘরে ঢুকতে যাবে তখনই একজন প্রহরী হাত বাড়িয়ে শাঙ্কোকে আটকালো। বলল–তুমি বিদেশী। এখানে কী চাই?
–আমি রাজসভা দেখতে এসেছি।
–হুঁ। যাও। প্রহরী ওকে ছেড়ে দিল।
শাঙ্কো রাজসভার কাছে এল। রাজার বিচার করা চলছে। রাজা একটু বয়স্ক। গায়ে ঢোলা আলখাল্লার মত দামি কাপড়ে তৈরি। গলায় দামি ছোট ছোট পাথর। মাঝখানে একটা মুক্তো বসানো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজসভার কাজ শেষ হল। শাঙ্কো চলল সদর দরজার দিকে। তখনই দেখল একজন প্রহরী ছুটে এল শাঙ্কোর কাছে।
–এই বিদেশী–প্রহরী ডাকল। শাঙ্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রহরীটা বলল—
–চল। মাননীয় রাজা ডাকছেন।
শাঙ্কো অবাক। এখানে তো সরাইওয়ালা ছাড়া আমাকে কেউ দেখেই নি। সেখানে স্বয়ং রাজা ওকে ডাকবে এতো কল্পনাই করা যায় না। শাঙ্কো বলল–চল।
রাজা ব্রাপেন-এর সামনে এসে শাঙ্কো মাথা একটু নোয়াল।
তুমি বিদেশি? রাজা ব্রাপেন জিজ্ঞেস করলেন।
আজ্ঞে হ্যাঁ। আমার নাম শাঙ্কো। শাঙ্কো বলল।
তুমি কি এখানে একা এসেছো? রাজা বললেন।
–না। আমার বন্ধুরাও আছে। শাঙ্কো বলল।
–কী মতলব নিয়ে এসেছো? রাজা বললেন।
–আমরা দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতেই ভালোবাসি। আর একটা কাজ আমরা করি কোন গুপ্তধনের খবর পেলে আমরা সেই গুপ্তধন উদ্ধার করি।
হুঁ। শোন আমার গুপ্তচরেরা ছড়িয়ে আছে। তাদের মারফৎ সব খবরই আমি পাই। যেমন–গতরাতে তুমি একটা সরাইখানায় ছিলে। তার কাছেও বলেছো যে তোমরা গুপ্তধন খোঁজো। তেমন খবর পেলেই তোমরা তা উদ্ধার করতে লাগো। ঠিক কিনা?
শাঙ্কো একটু অবাক হল। রাজা তাহলে ওদের খবরও জানে। বলল–
-হ্যাঁ। আপনি ঠিকই বলেছেন। শাঙ্কো বলল।
–তোমরা উদিন্না পাহাড়ের সোনার খনি আবিষ্কার করার চেষ্টায় আছো। রাজা বললেন।
–হ্যা–রাজা আত্তারিয়া এই খোঁজাখুঁজির ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করবেন। শাঙ্কো বলল।
–সেই জন্যেই তোমাকে আমাদের কয়েদখনায় বন্দী করে রাখবো। রাজা বললেন।
–আমার বন্ধুরা তো আছে। শাঙ্কো বলল।
–আমি তাদের জানতেও দেব না। কেউ বুঝতেও পারবে না যে তুমি আসলে বন্দী। রাজা বললেন।
–ঠিক বুঝলাম না। শাঙ্কো বলল।
–মানে তুমি সকাল থেকে সারাদিন এখানে ওখানে নির্দেশমত কাজ করবে সন্ধ্যে হলেই কয়েদখানায় তোমাকে ঢোকানো হবে। রাজা বললেন।
-তারপর? শাঙ্কো বলল।
–কেউ বুঝতেও পারবে না তুমি বন্দী। রাজা বললেন।
–আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন কেন? শাঙ্কো বলল।
-না-না। তোমাকে মরতে দেওয়া হবে না। জীবিত তোমাকেই আমার প্রয়োজন। রাজা বললেন।
–আমি তো সোনার খনি সম্পকে কিছুই জানি না। শাঙ্কো বলল।
–জানবে। তোমাকে সময় আর সুযোগ দেওয়া হবে। রাজা বললেন।
শাঙ্কো কী করবে বুঝে উঠতে পারল না।
–সোনার খনি সম্পর্কে কী জানতে পেরেছো? রাজা বললেন।
–এটা আমার এক প্রাণের বন্ধু ফ্রান্সিস সব জানে ও। শাঙ্কো বলল।
–সে কোথায়? রাজা বললেন।
—রাজা হুয়াল্পার কয়েদঘরে। শাঙ্কো বলল।
–তোমাদের ফ্রান্সিসকে এখানে আনার ব্যবস্থা করছি। রাজা বললেন।
পারবেন? শাঙ্কো বলল।
রাজা হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন–কয়েদীঘরের প্রহরীরা সব যীশু না। একটা সোনার আধখানা চাকতি দিয়েই তোমার বন্ধু মুক্তি পাবে। আমি সেই ব্যবস্থা করছি। তুমি যদি চাও তোমার বন্ধুকে প্রহরী এখানে পৌঁছে দিয়ে যাবে। রাজা বললেন।
–না–না। ও একা এলেই হবে। আপনার রাজত্বে আসতে পারলেই হল। শাঙ্কো বলল।
–ঠিক আছে। তাই হবে। তোমার বন্ধু আসুক। তারপর গুপ্তধন উদ্ধারের জন্য তোমাদের কাজে নামতে হবে। রাজা বললেন।
-বেশ। তবে আমার ঐ বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেই আমি আমাদের মত বলবো। শাঙ্কো বলল।
-খুব ভালো কথা।
রাজা ব্রাপেন আস্তে দুহাত দিয়ে শব্দ করলেন। একজন ন্যাড়ামাথা লোক রাজার কাছে এল। মাথা একবার নুইয়ে সম্মান জানাল।
–শোন–রাজা বললেন–এ একজন গুপ্তচর। অনেক কঠিন কঠিন কাজ করেছে। এবার ওকে বল তোমার বন্ধু কোন কয়েদঘরে বন্দী হয়ে আছে। দেখতে কেমন পোশাক কেমন এসব বলে দাও।
শাঙ্কো সব বলল। গুপ্তচর মাথা নেড়ে বলল–ঠিক আছে।
গুপ্তচর রাজা ব্রাপেনকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে চলে গেল।
শাঙ্কো অনেকটা নিশ্চিন্ত হল। ও নিজে এখানে পড়ে আছে। ফ্রান্সিস একা। সহজে পালাতে পারবে না। সময় লাগবে। আর জাহাজে ফিরতে দেরি করা চলবে না। রাজকুমারী, বন্ধুরা দুশ্চিন্তায় পড়বে। যা হোক–এখন তো এই রাজা ব্রাপেন ফ্রান্সিসকে মুক্ত করিয়ে আনতে পারে কিনা দেখি।
ওদিকে দু’দিন পরে ফ্রান্সিস রাতে কয়েদঘরে শুয়ে আছে। রাত বাড়ছে। ওর ঘুম আসছে না এখন মাঝে মাঝেই ওর বিনিদ্র রাত কাটে।
রাত গভীর। ফ্রান্সিস চোখ বুজে শুয়ে আছে। হঠাৎ দেখল এক পাহারাদার আস্তে দরজা খুলল। পাহারাদার সোজা ওর কাছেই এল। মুখ নুইয়ে বলল–তুমিই তো ফ্রান্সিস?
