ওর মধ্যেই ভাগ ভাগ করে যোদ্ধারা খেয়ে এল। শাঙ্কোও খেয়ে নিল।
রাত বাড়তে লাগল।
শাঙ্কো শুতে পারল না। একটা চেয়ে পাওয়া বর্শা হাতে নিয়ে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। তারপর ক্লান্ত হয়ে বিছানায় বসে পড়ল।
বেশ কিছু পরে ভোর হল। পাখির ডাক শোনা গেল।
শাঙ্কোর একটু তন্দ্রামত এসেছিল। পাখির ডাক শুনে লাফ দিয়ে উঠল। বাইরে তাকিয়ে দেখল সেনাপতি ঘোড়ায় চেপে এসেছে। গলা চড়িয়ে সার বাঁধা যযাদ্ধাদের বলল–তোমরা সেনা ছাউনিতে গিয়ে বিশ্রাম কর। তবে খালি হাতে থেকো না। সঙ্গে বর্শা রাখবে। তরোয়ালও কোমরে ঝোলানো থাকবে যাতে আক্রান্ত হলে আমরা লড়তে পারি। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সেনাপতি বলল তোমাদের তরোয়াল চালানো শেখা হয়েছে বর্শা আর তরোয়াল দুটোই কাজে লাগবে। যাও। সেনাপতি থামল।
শাঙ্কো এবার তৈরি হতে লাগল। বাইরের দিকে চোখ রেখে কাপড়জামা বদলাল। দেখল–সকালের খাবার নিয়ে দুজন পাহারাদার আসছে।
শাঙ্কো আর দাঁড়াল না। আস্তে আস্তে মাঠ পার হল। রাস্তায় আসতেই শাঙ্কো খুব দ্রুত হাঁটতে লাগল। এক নজর পেছনে তাকিয়ে দেখল ওর ঘরের সামনে কোন যোদ্ধাই দাঁড়িয়ে নেই। ঠিক তখনই দেখল সেনাপতি ওর ঘরের সামনে এসেছে। সঙ্গে দু’জন যোদ্ধা।
শাঙ্কো প্রায় ছুটে চলল। এক নাগাড়ে হাঁটতে লাগল। একবারও থামল না।
দুপুর হতে শাঙ্কো একটা ছোট শহরমত জায়গায় এল। খাবারের দোকান হাতের কাছেই পেল। দোকানে ঢুকে বসল। কাজের ছেলেটা এল। শাঙ্কো রুটি মাংসের বড়া চাইল। ছেলেটি খাবার নিয়ে এল। ও পরপর দু গ্লাশ জল খেল। তারপর খাবার খেতে লাগল। খাবার শেষ। শাঙ্কো আরো খাবার চাইল। ছেলেটি দিয়ে গেল। সেটাও খেয়ে ফেলার পর ঢ ঢক্ করে আরো দু’গ্লাশ জল খেল। এবার উঠে দাঁড়াল। দোকান মালিকের কাছে এল। একটা সোনার চাকতি দিল। দোকান মালিক সোনার চাকরি রেখে ফেরৎ মুদ্রা দিল। বলল–আবার আসবেন। শাঙ্কো বলল– হ্যাঁ আসবো। এবার বলুন তো সামনে কোন রাজ্য আছে।
–ডিসিয়াডো।
–হেঁটে কতক্ষণে ওখানে পৌঁছবো? শাঙ্কো জানতে চাইল।
রাত হয়ে যাবে।
–হুঁ।
শাঙ্কো রাস্তায় নামল। এতদূর দ্রুতগতি রেখে হেঁটে এসে খুবই ক্লান্ত লাগছে নিজেকে। হাঁটতে লাগল তবু।
যখন ডিসিয়াডো পৌঁছল, তখন বেশ রাত। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে একটা সরাইখানা পেল। সরাইখানায় ঢুকল। মালিক একটা পাটাতনে বসে আছে। হেসে বলল–আসুন।
–খাবো থাকবো। শাঙ্কো বলল। তারপর পাটাতনে বসল। মালিক উঠে দাঁড়াল।
–একটু খোঁজ নিয়ে আসি কেমন খাবার আছে। মালিক বলল। তারপর উঠে দাঁড়াল। ভেতরে চলে গেল। ফিরে এসে বলল–মাংস বেশি নেই। তরিতরকারির খাবার যা আছে বোধহয় আপনার হয়ে যাবে।
–আমি কোথায় থাকবো দেখিয়ে দিন। শাঙ্কো বলল।
মালিক শাঙ্কোকে নিয়ে পেছনের ঘরে এল। প্রায় ছ’সাতজন লোক পাটাতনে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। মালিক বলল–
–যেখানে খুশি শোবেন।
–হুঁ। আমি হাত মুখ ধুতে যাচ্ছি। এসেই যেন খাবার পাই। শাঙ্কো বলল।
নিশ্চয়ই পাবেন। মালিক দেখে বলল।
পেছনে জলের জায়গাটা মালিক শাঙ্কোকে দেখিয়ে দিয়েই চলে গেল।
শাঙ্কো বেশ ভালো করে হাতমুখ ধুলো। মুখে গলায় ধূলোয় ঢাকা ছিল যেন। শাঙ্কো আস্তে আস্তে ফিরে এল।
–আসুন–আসুন। মালিক একটা পাটাতন দেখিয়ে দিল। শাঙ্কো খেতে বসল। রুটির সঙ্গে মাংস খুব কমই দিল। শাঙ্কো ওসব আর ভাবল না। খেতে লাগল। এক দফা শেষ করে আবার খাবার চাইল। মাংস নেই। তরকারিমত জিনিস খেতে দিল। শাঙ্কো সেটাই গপ গপ্ খেতে লাগল।
খাওয়া শেষ। মালিক ওকে যে শোবার জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছিল সেখানেই শাঙ্কো এল। তারপর শুয়ে পড়ল।
লোকজনের কথাবার্তায় ওর ঘুম ভাঙল। শাঙ্কো উঠে বসল। হাতমুখ ধুয়ে সকালের খাবার খেতে খেতে মালিকের কাছে এল। বলল–এটাই তো ডিসিয়াডো দেশ।
হা। আপনি কোত্থেকে এসেছেন? সরাইওয়ালা জানতে চাইল।
–য়ুরোপ থেকে। শাঙ্কো বলল।
–বলেন কি? সরাইওয়ালা চমকে উঠল।
–আমরা নতুন নতুন জায়গায় যেতে ভালোবাসি। বিশেষ করে গুপ্তধনটনের। খোঁজ পেলে আমরা তা উদ্ধার করি। এরকম জীবনই আমরা ভালোবাসি। শাঙ্কো বলল।
–ও। তা আপনি একাই–সরাইওয়ালা বলতে গেল তার আগেই শাঙ্কো বলল–না-না। আমার বন্ধুরাও আছে। গ্যালিভাস বন্দরে আমাদের জাহাজ নোঙর করে আছে। আমরা গেলেই জাহাজ ভাসাবো স্বদেশের দিকে।
–ও। সরাইখানার মালিকের হাঁ মুখ বন্ধ হল।
ঘাসপাতার বিছানায় শুয়ে শাঙ্কো ভাবতে লাগল কী করবে এখন। রাজা আত্তারিয়া বা রাজা হুয়াল্পার দেশে যাওয়া অসম্ভব। আমাকে ধরতে পারলে ফাঁসিও দিতে পারে। একমাত্র উপায় পালিয়ে পালিয়ে গ্যালিগাস যাওয়া। কিন্তু ফ্রান্সিস মুক্তি পেলেই সব ভাবা যাবে। এখন জাহাজে ফিরে যাওয়ার চেয়েও প্রয়োজন উদিন্না পাহাড়ের সোনার খনি উদ্ধার করা। এই খনি আবিষ্কার না করে ফ্রান্সিস এক পাও যাবে না। তবে ফ্রান্সিসের অভিমত কী সেটা জানা না গেলে কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন সামনে একটাই কাজ–ফ্রান্সিসকে কয়েদঘর থেকে মুক্ত করা। কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব? ফ্রান্সিস অবশ্য একটা চেষ্টা করে মুক্তি আদায় করতে পারবে। শাঙ্কো জোরে একটা শ্বাস ছাড়ল। ও দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
সকালের খাওয়া খেয়ে শাঙ্কো তৈরি হল। রাজা রাজসভা সব দেখে আসি। শাঙ্কো মালিকের কাছে এল। বলল-রাজসভা দেখতে যাবো। কী করে যাবো?
