সকালের খাবার খাওয়া হয়েছে তখনই দলপতি ঢুকল। বলল–কী ব্যাপার আমার সঙ্গে তুমি দেখা করতে চেয়েছো কেন?
–আমাকে একটা অনুমতি দিতেই হবে। শাঙ্কো বলল।
–কীসের অনুমতি। দলপতি বলল।
–আমার এক বন্ধু কয়েদঘরে রয়েছে। বন্দী। শাঙ্কো বলল।
–ও। হা, হা একজন বিদেশী আছে বটে। দলপতি বলল।
–বন্ধুর সঙ্গে আমি কথা বলবো। অল্পক্ষণ। শাঙ্কো বলল।
–কী নিয়ে কথা বলবে। দলপতি বলল।
–কবে এখান থেকে চলে যাবো। গ্যালিগস বন্দর শহরে আমাদের জাহাজ নোঙর করে আছে। আমাদের জাহাজে যাবো। তারপর স্বদেশের দিকে যাত্রা শুরু করব। শাঙ্কো বলল।
–আগে দেখ–রাজা কী বলেন। তুমি না হয় ছাড়া আছে কিন্তু তোমার বন্ধু। তো কয়েদঘরে। ও তো ছাড়া পাবে না। সেনাপতি বলল।
বন্ধুকে মুক্তি দিতে রাজাকে রাজি করাবো। শাঙ্কো বলল।
–দেখ চেষ্টা করে। দলপতি বলল।
–এবার আমার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দিন। শাঙ্কো বলল। দলপতি মাথা নিচু করে কী ভাবল। মাথা তুলে বলল–এরকম অনুমতি দেওয়া খুবই বিপজ্জনক। আমি তোমাদের দেখা করতে অনুমতি দিয়েছি এটা জানাজানি হলে আমি বিপদে পড়বো। সবচেয়ে ভালো হয় প্রহরীদের একজন নিমতা রাত বারোটার পর একা থাকে। নিমতাকে যদি রাজি করাতে পার তাহলে ও তোমার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। এ ছাড়া অন্য কোনভাবে হবে না। দলপতি বলল।
–ঠিক আছে। আজকেই নিমতার সঙ্গে কথা বলবো। শাঙ্কো বলল।
–দেখ বলে। দলপতি চলে গেল।
শাঙ্কো নিজের ঘরে এল। কী ভাবে নিমতাকে পাওয়া যাবে? বিছানায় শুয়ে পড়ল শাঙ্কো। ভাবতে লাগল কীভাবে নিমতার সঙ্গে কথা বলবে।
রাতে খাওয়াদাওয়ার পর শাঙ্কো শুয়ে পড়ল। একটু ঘুমিয়ে নিতে হবে। শাঙ্কো ঘুমোবার চেষ্টা করল। কিন্তু ঘুম এল না।
রাত গভীর হচ্ছে। শাঙ্কো মাঝে মাঝেই উঠে দরজায় এসে দাঁড়াতে লাগল। নিমতা কখন একা হয়।
প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পরে বাইরে এসে দেখল নিমতা একা কয়েদঘরের সামনে বর্শা হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
শাঙ্কো একরকম ছুটে এল নিমতার কাছে। নিমতা শাঙ্কোকে দেখে অবাক–এত রাতে কে এল রে বাবা। পরক্ষণেই বুঝল বিদেশী লোকটা এসেছে। নিমতা বলল– কী ব্যাপার? এত রাতে এখানে এসেছো কেন? শাঙ্কো ডাকল–
–নিমতা?
—হুঁ বল। নিমতা বলল।
–আমার এক প্রাণের বন্ধু এইখানে বন্দী হয়ে আছে। শাঙ্কো বলল।
–হুঁ। নিমতা মুখে শব্দ করল।
–তার সঙ্গে আমি একটু কথা বলতে চাই। শাঙ্কো বলল।
দলপতির লিখিত হুকুম এনেছো? নিমতা বলল।
–না। শাঙ্কো বলল।
তবে তো দেখা হবে না। নিমতা বলল।
–বলছি–নিমতা–ভাই তুমি এ কাজ না পারলে আর কেউ পারবে না। রাজা তোমার কথায় ওঠেন বসেন। শাঙ্কো বলল।
–এটা কোত্থেকে শুনলে? নিমতা বলল।
–এসব সবাই জানে। শাঙ্কো বলল।
–তা হতে পারে। অনেক ব্যাপারেই রাজা হুয়াল্পা আমার সঙ্গে কথা বলেন। এই যে শোনা যাচ্ছে রাজা আত্তারিয়া আমাদের দেশ আক্রমণ করবে এই নিয়েও রাজা আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। নিমতা বলল।
–তাহলে ভাই তুমি অনুমতিটা দাও। শাঙ্কো বলল।
–হুঁ। বারান্দায় এসে দাঁড়াও। সাবধান–এই ব্যাপারটা পাঁচকান না হয়। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে বারান্দায় উঠে দাঁড়াল।
–নাম কী? নিমতা বলল।
ফ্রান্সিস। শাঙ্কো বলল।
–ও। এবার গলা চড়িয়ে বলল–ফ্রান্সিস নামে কে আছো-দরজার কাছে এসো।
ফ্রান্সিস তখনও জেগে। রাতের ঘুমটা কমে গেছে। নিমতার ডাক শুনেই ও তাড়াতাড়ি দরজার কাছে এল। মশালের আলোয় শাঙ্কোকে দেখে ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওঃ একটা সাংঘাতিক দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচলাম।
–বেশিক্ষণ কথা বলা যাবে না। শাঙ্কো বলল।
–তুমি কী করে বন্দীদশা এড়িয়ে গেলে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
লড়াইয়ের ব্যাপারে সংবাদ দিলাম। রাজা হুয়াল্পা খুব খুশি। আমাকে ভালোভাবে যোদ্ধাদের আবাসে আমার থাকার ব্যবস্থা করেছেন। শাঙ্কো বলল।
-বলেছো-সোমবার রাতে আত্তারিয়া আক্রমণ করবে? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ–সে সব বলেই বন্দীদশা এড়াতে পারলাম। শাঙ্কো বলল।
সময় হয়ে গেছে–সময় হয়ে গেছে নিমতা কথাটা বলতে বলতে বারান্দায় পায়চারি করতে লাগল। দরজায় লোহার ফাঁকের মধ্যে দিয়ে শাঙ্কো হাত বাড়াল। ফ্রান্সিস ওর হাত চেপে ধরল। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। শাঙ্কোর দু’চোখ জলে ভরে উঠল। ফ্রান্সিস দেখল সেটা। বলল–শাঙ্কো–মনের দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ো না। মন শক্ত কর।
সময় হয়ে গেছে–সময় হয়ে গেছে–বলতে বলতে নিমতা তখনও পায়চারি করতে লাগল।
–ফ্রান্সিস–যাচ্ছি। খুবই দুশ্চিন্তায় আছি। সোমবার রাতে যদি রাজা আত্তারিয়া আক্রমণ না করে তাহলে মিথ্যে কথা বলার জন্যে রাজা হুয়াল্পা আমাকে ফাঁসি পর্যন্ত দিতে পারে। শাঙ্কো বলল।
–যদি আক্রমণ না করে তুমি পালিয়ে যেও ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ–উত্তরের ভিসিয়াভো রাজ্যে চলে যাবো।
তাহলে চলি ফ্রান্সিস। শাঙ্কো বলল।
শাঙ্কো বারান্দা থেকে নেমে এল। চলল নিজের ঘরের দিকে। ফ্রান্সিস নিজের জায়গায় এসে শুয়ে পড়ল।
সোমবার এল। শাঙ্কো দুশ্চিন্তায়। কী হবে কে জানে। রাজা আত্তারিয়া তার যোদ্ধাবাহিনীকে নিয়ে রাজা হুয়াল্পার দেশ আক্রমণ করে কিনা এখন সেইটেই দেখার।
সারাদিন কাটল। সন্ধ্যে থেকে যোদ্ধাদের তোড়জোড় শুরু হল। লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হল যোদ্ধারা।
