–আমরা পালাই নি। রাজা হুয়াল্পার যোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়েছিলাম। কয়েকদিন কয়েদখানায় কাটাতে হয়েছিল। শাঙ্কো বলল।
–এখানেও কয়েদখানায় থাকতে হবে। অবশ্যই মাননীয় রাজা যদি তোমাদের মুক্তি দেন–সেটা আলাদা কথা। সেনাপতি বলল।
–দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
–যে নকশাটা তুমি দিয়েছো–সেটা আমরা খুব মনোযোগের সঙ্গে তা দেখেছি। বুঝেছি–ওটা জাল নকশা। তুমি আমাদের ধোঁকা দিয়েছে। সেনাপতি বলল।
–আমি বলছি নকশাটা জাল না। আমি সেটা প্রমাণও করবো। ফ্রান্সিস বলল।
–রাজা আত্তারিয়া বোধহয় তোমাকে সেই সুযোগ দেবে না। সেনাপতি বলল।
–সেই ক্ষেত্রে আমরা জাহাজে ফিরে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–সেই সুযোগটাও তোমাদের হয়তো দেওয়া হবে না। সেনাপতি বলল।
–হাতে তরোয়াল থাকলে আমি শয়তানকেও ভয় করি না। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে, আগে দেখা যাক রাজা তোমাদের কি শাস্তি দেন। সেনাপতি বলল।
–আমরা কোন অন্যায় করিনি অপরাধ করিনি যে আমাদের শাস্তি দেবেন। শাঙ্কো বলল।
রাস্তার একটা মোড়ের কাছে এসে সেনাপতি বলল
–আমাকে একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে। আমি যাচ্ছি।
সেনাপতি দলপতির দিকে তাকিয়ে বলল–এদের কয়েদখানায় ঢোকাবি। কাল রাজসভায় এদের আনা হবে। সাবধান–পালিয়ে না যায়।
সেনাপতি ডানদিকের রাস্তার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
এবার ফ্রান্সিস শাঙ্কোর কাছে সরে এল। ফিফিস্ করে বলল–সামনে দেখ। একটা বিরাট শিশুগাছ। জায়গাটায় অন্ধকার বেশি। লাফ দিয়ে পালাব। রাজা হুয়াল্পার কাছে যাব। লড়াইয়ের ব্যাপারে আমরা যা জেনেছি সব বলবে। পেছন থেকে দলপতি বলল–ফিস্ ফিস্ করে কী কথা হচ্ছে?
–আমার বিয়ের ব্যাপারে। শাঙ্কো বলল।
–তাহলে বলতে পারো। বিয়ে বলে কথা। দলপতি হেসে বলল।
দুজনেরই হাত বাঁধা। সবাই তখন শিশুগাছের কাছে এসেছে। শাঙ্কো দুহাত তুলে রাস্তা থেকে লাফ দিয়ে শিশুগাছটার গোড়ায় গিয়ে পড়ল।
তখনই দলপতি শাঙ্কোকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুঁড়ল।
বর্শাটা গাছটার গায়ে বিধে গেল। শাঙ্কো ততক্ষণে জংলা গাছের জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে।
দলপতির নির্দেশমত এক প্রহরী গিয়ে বর্শাটা গাছের গা থেকে খুলে আনল।
দলপতি গলা চড়িয়ে বলল–সব সাবধান। এরা কিন্তু ধুরন্ধর। সুযোগ পেলেই পালাবে।
ভোর হল। তখনও ফ্রান্সিসরা চলেছে।
বেশ বেলায় কয়েদঘরের সামনে পৌঁছল। সেই প্রহরীরা এগিয়ে আসা। সেই– ঢডাংটং শব্দে কয়েদঘরের দরজা খোলা হল। সেই বন্দী জীবন! কিছুই করার নেই। তবে ফ্রান্সিস ভাবে পালানোর ফন্দী নকশার অর্থ এসব ভাবব।
একটু বেলায় খাওয়াদাওয়া হল। সারা সন্ধ্যে দরজার ফাঁক দিয়ে মাঠের সবুজ ঘাসের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কাটাল। একটা চিন্তা কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। সেটা হল শাঙ্কোর কথা। পালাতে পেরেছে। কিন্তু পরের কাজগুলো করতে পেরেছে। কিনা। রাজা হুয়াল্পাকে সব কথা বলতে পেরেছে কিনা কোথাও আশ্রয় পেয়েছে। কিনা। ফ্রান্সিস ভাবল–এখানে তো লড়াই শুরু হবে সামনের সোমবার। লড়াইয়ের সময় মারামারি কাটাকাটি চলবে। সেই সুযোগে ও হুয়াল্পার রাজত্বে চলে যাবে। শাঙ্কোকে খুঁজে বের করবে। তারপর দুজনে মিলে সোনার খনি আবিষ্কার করবে।
পরদিন একটু সকালের খাবার খাচ্ছে তখনই দলপতি কয়েদঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিসের কাছে গিয়ে বলল–তোমার এক বন্ধু তো পালিয়েছে। তুমি কী করবে?
রাজা হুয়াল্পার সঙ্গে কথা বলে স্থির করবো। ফ্রান্সিস বলল।
–হুঁ। যাকগে তুমি রাজসভায় চল। দলপতি বলল।
–চলুন। ফ্রান্সিস বলল।
মাঠ পার হয়ে রাজবাড়িতে এল দুজনে। রাজসভায় ঢুকল। তখন বিচারের কাজ চলছে। ফ্রান্সিস বার বার চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। শাঙ্কোকে দেখতে পেল না। ভেবে পেল না শাঙ্কো কোথায় আছে? শাঙ্কো পালিয়েছে। বন্দী হলে কয়েদঘরেই থাকতে হত। মনে হয় শাঙ্কো যে অবশ্য প্রয়োজনীয় খবর রাজা হুয়াল্পাকে দিয়েছে তাতেই ও ধরা পড়লেও মুক্তি পেয়েছে।
ফ্রান্সিসের ডাক পড়ল। সেনাপতি ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে বলল–এই বিদেশী গুপ্তখনি সম্পর্কে বেশ কিছু জানে। একে বন্দী করতে হবে। ওর কথা ফাঁস হয়ে গেলে সোনার খনি কোনদিনই খুঁজে পাওয়া যাবে না।
মাননীয় রাজা–যে সব সংবাদ আপনি জানতে চেয়ে আমাদের পাঠিয়েছিলেন সেই সংবাদ আমার বন্ধু দিয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ দিয়েছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। সেইজন্য তোমার বন্ধুকে যোদ্ধাদের আবাসে রেখেছি। রাজা বললেন।
–আমি বন্ধুর কাছে যেতে পারি। ফ্রান্সিস বলল।
–দুজনে একত্র হলে পালাবে। রাজা বললেন।
–না। পালাবো না। পালাতে হলে অনেক আগেই পালাতাম। ফ্রান্সিস বলল।
কিছু পরে ফ্রান্সিসকে দলপতি কয়েদঘরে নিয়ে এল।
ওদিকে শাঙ্কো তো পালাল। জংলা গাছপালা দুহাতে সরিয়ে সরিয়ে শাঙ্কো একটু দূরেই চলে এল। কান পাতল। দলপতির দল থেকে কারো কোন কথা শুনতে পেল না।
জংলা গাছ সরিয়ে সরিয়ে এল। শরীরের অনেক জায়গা ছড়ে গেছে। দু এক এক জায়গা কেটে গেছে।
দুদিকে ভালো করে দেখে শাঙ্কো রাস্তায় নামল।
চলল। আজ আর রাজার সঙ্গে দেখা করা যাবে না। কাল সকালে দেখা করবে রাজসভায় নয়। অন্য কোন ঘরে। লড়াইয়ের যে খবর ও এনেছে সেটা অত্যন্ত গোপনে রাজাকে জানাতে হবে।
একটা সরাইখানা খুঁজতে লাগল। পেয়েও গেল। শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি আলগা করে তিনটি স্বর্ণমুদ্রা পেল। যাক দিন কয়েক বেশ চলে যাবে।
