পরদিন সকালের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিস আবার শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো বসে ছিল। বলল–ফ্রান্সিস কী করবে এখন?
–সোনার খনি খুঁজবো। ফ্রান্সিস বলল।
–রাজা হুয়াল্পা তো তোমার দেওয়া নকশা ছিঁড়ে ফেলল।
–তাতে কী? আমার মনে নকশা অমলিন। মনে করলেই চোখের সামনে ভাসে। সোনার খনি আমি আবিষ্কার করবই। শুধু সময়ের অপেক্ষা। একটু পরে বলল–
এরপরেও আমি খোঁজ চালিয়ে যাবো।
–দুই রাজা কি এখনও তোমাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করবে? শাঙ্কো বলল।
–হুয়াল্পা চটেছে। আত্তারিয়া আমাকে সুযোগ দেবে। সোনার লোভ কিন্তু সাংঘাতিক। এই লোভ কেউ এড়াতে পারে না। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো মাথা ঝাঁকিয়ে বলল–সোনার খনির কথা ভুলে যাও। চলো দেশে ফিরি।
–আগেও বলেছি। এখনও বলছি দেশে এখনই ফেরার ইচ্ছে আমার নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–যাক গে–তুমি যা ভালো বোঝে। শাঙ্কো বলল।
–এখন শুধু বিশ্রাম কর। ফ্রান্সিস বলল।
কিন্তু ওদের কপালে বিশ্রাম ছিল না। স্বয়ং সেনাপতি কয়েদঘরে এসে হাজির হল। ঢং ঢং শব্দ তুলে লোহার দরজা খুলে গেল। সেনাপতি ঢুকল। ফ্রান্সিসদের কাছে এল। গলা চড়িয়ে বলল–মহামান্য রাজা তোমাদের ডেকে পাঠিয়েছেন। চল।
ফ্রান্সিস শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। সেনাপতির পেছনে পেছনে চলল।
মাঠ পার হয়ে রাজবাড়িতে এল। ওরা দেখল আজ রাজসভায় ভিড় নেই। বিচার চলছে। ওরা অপেক্ষা করতে লাগল।
বিচারের কাজ শেষ হল। সবাই চলে গেল। রাজা হুয়াল্পা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকালেন। বললেন, আমি নিশ্চিত যে তোমরা রাজা আত্তারিয়াকে আমাদের রণসজ্জা যোদ্ধাবাহিনী সম্পর্কে সব খবর পৌঁছে দিয়েছে।
–আপনি ভুল কথা বলছেন। আসন্ন লড়াই সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণাই নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা যাই বল তোমরা যে গুপ্তচরের কাজ করেছে এ সম্পর্কে আমি নিশ্চিত। রাজা বললেন।
–তাহলে তো আমাদের মুক্তির কোন আশাই নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা দুজন যে এখনও বেঁচে আছো তার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও। রাজা বললেন।
–তার প্রয়োজন নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–কেন? রাজা বললেন।
কারণ আমরা গুপ্তচরের মত নিন্দনীয় কাজ করিনি–করবোও না। ফ্রান্সিস বলল।
–ওসব কথা বলে কী লাভ? এই কাজটা করার জন্যে তোমাদের মুক্তি দেওয়া হবে। সোনার খনি খুঁজতে দেওয়া হবে।
–গুপ্তখনি পেলে যতটা সোনা পাবো তার অর্ধেক তোমাদের দেওয়া হবে। রাজা ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফ্রান্সিস আস্তে বলল শাঙ্কো কী করবে?
–মুক্তি তো পাবো। তারপরে দেখা যাক। শাঙ্কো বলল।
ফ্রান্সিস একটু ভেবে বলল–এধরনের কাজ আমরা কখনও করিনি। কিন্তু আজ এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আমাদের মুক্তির প্রশ্ন। আমরা এখন মনেপ্রাণে চাইছি মুক্তি আর সোনার খনি খুঁজে বের করার কাজ।
–ঠিক আছে। দুটোই পাবে। তাহলে তোমরা আজই যাও। আজই রাতে। দেরি করো না। আমি দুটি কথা জানতে চাই। কোনদিন আত্তারিয়া আক্রমণ করবে আর কবে আক্রমণ করবে।
–বেশ। আমরা এখন সৈন্যাবাসে থাকবার জন্যে যে ঘর পেয়েছিলাম সেই ঘরটায় আমাদের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস পড়ে আছে। সে সব নেব। তারপর রাজা আত্তারিয়ার রাজ্যে যাবো।
–বেশ। তাহলে আমাদের সঙ্গে এসো। সেনাপতি বলল।
সেনাপতির পেছনে পেছনে ওরা কয়েদঘর থেকে বাইরে এল। মাঠ পার হয়ে চলল। সেনাপতি চলে গেল। সঙ্গের এক প্রহরী আগের ঘরটার সামনে এল। দরজার তালা খুলে দিল।
ফ্রান্সিসরা ঘরে ঢুকল। প্রহরী বলল–কিছু প্রয়োজন পড়লে জানাবেন। প্রহরী চলে গেল। বিছানায় বসে শাঙ্কো বলল–কখন রওনা হবে?
–আজ রাতে। খাওয়া-দাওয়ার পর। ফ্রান্সিস বলল।
–ভাবছি কী করে খবরটা বের করবে। শাঙ্কো বলল।
–দেখি চেষ্টা করে। দলপতিকে জিজ্ঞেস করবো ভাবছি! ফ্রান্সিস বলল।
–দলপতি যাতে বলে তার চেষ্টা করতে হবে। শাঙ্কো বলল।
–হুঁ। ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে। দেখা যাক–খবরটা জানা যায় কিনা।
রাতের খাওয়া হল। একটু বিছানায় শুয়ে নিয়ে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল– শাঙ্কো–চল।
দুজনে যখন ঘর থেকে বেরিয়ে এল তখন গভীর রাত। আকাশে ভাঙা চাঁদ। জ্যোৎস্না উজ্জ্বল নয়। চারপাশ বেশ অন্ধকার। ওরা হাঁটতে লাগল।
ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। ভালোই লাগছিল হাঁটতে।
ভোর ভোর সময়ে গ্যালিগাস পৌঁছল। তখনও রাস্তায় তেমন লোক চলাচল শুরু হয় নি। ফ্রান্সিস বলল–চল–একটা সরাইখানা খুঁজি। দিনকয়েক থাকতে হবে।
কিছুদূর হাঁটতেই ডানদিকে একটা সরাইখানা দেখতে পেল। ফ্রান্সিসরা সরাইখানায় ঢুকল। মালিক হেসে বলল- আসুন-আসুন। সব রকম খাবারের ব্যবস্থা আছে।
ফ্রান্সিসরা সরাইখানায় ঢুকল। মালিক পেছনে পেছনে এল।
–আমরা হাতমুখ ধুয়ে আসছি। সকালের খাবার পাঠিয়ে দিন। ফ্রান্সিস বলল।
–অবশ্যই অবশ্যই। মালিক হেসে বলল।
–শুনুন–এখানে আমরা দু’চারদিন থাকবো। ব্যবসার কাজে।
–হা হা। মালিক মাথা ঝাঁকাল।
–কেনাকাটার ব্যাপার–বুঝলেন তোতা? ফ্রান্সিস বলল।
–হা হা। মালিক আবার মাথা ঝাঁকাল।
–ঠিক আছে আপনি যান। খাবার পাঠিয়ে দিন। সরাইওলা চলে গেল।
ফ্রান্সিস দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসল। বলল–শাঙ্কো আজ থেকেই কাজ শুরু করি। দেরি করবো না।
–দুপুরের খাবার খেয়েই চল। শাঙ্কো বলল।
— চল। প্রথমে সৈন্যাবাসের এলাকায় চল। কোন যোদ্ধাকে একা পেলে ভেতরের খবরটা নিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ চল। শাঙ্কো বলল–তবে আরো কয়েকটা উপায় ভেবে রাখো। শাঙ্কো বলল।
