–আমি এটা মানতে রাজি নই। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস নকশাটা বের করল এটা আসল নকশা নয়। ফ্রান্সিস নকল করে রেখেছে এটা। মশালের আলোয় নকশাটা বোঝাতে লাগল। বলল–দুটো জিনিস লক্ষ্য কর। একটা চারা গাছ–নিষপত্র মানে পাতা ঝরা গাছ। দ্বিতীয়টা হল– একটা পাথরের পাটায় গোল চিহ্ন। বোঝাই যাচ্ছে পাথর কুঁদে কুঁদে এই গোল দাগটা করা হয়েছে।
–গোল দাগটা অর্থহীন। শাঙ্কো বলল।
–তাহলে তো পুরো নকশাটাই অর্থহীন হয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
–যাই বল–এটা একটা ভূতুড়ে নকশা। শাঙ্কো বলল।
–আমার তা মনে হয় না। কিছুটা এগোই তখন বুঝতে পারবো। এটা ভূতুড়ে নকশা না অর্থ আছে এমন নকশা। ফ্রান্সিস বলল।
হবে হয়তো। শাঙ্কো বলল।
–এখন ঘুমোও। কালকে খোঁজাখুঁজি আছে। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো ঘুমিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস বিছানায় দুচারবার এপাশ-ওপাশ করে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে ফ্রান্সিসরা সবেমাত্র সকালের খাবার খেয়েছে সেনাপতি ঢুকল। বলল–মাননীয় রাজা হুয়াল্পা তোমাদের ডেকে পাঠিয়েছেন। চল।
–হঠাৎ রাজা ডেকে পাঠালেন–কী ব্যাপার বলুন তো। শাঙ্কো বলল।
–রাজা হুয়াল্পা কেন তোমাদের ডেকে পাঠিয়েছেন–আমি জানি না। তবে এখন থেকে তোমরা কয়েদঘরে থাকবে এই খবরটা আমাকে জানানো হয়েছে। আমি এইটুকুই জানি–দেরি না–চল। সেনাপতি বলল।
-কী অপরাধ করলাম–বলতে বলতে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। শাঙ্কোও উঠল।
সেনাপতির পেছনে পেছনে ওরা চলল রাজবাড়ির দিকে।
রাজার রাজসভায় এল তিনজনে। তখন বিচার চলছিল। রাজা ফ্রান্সিসদের দেখল। কিছু বলল না। বিচারের রায় দিলেন রাজা। তারপর গলা চড়িয়ে বললেন- আজকে আর বিচার হবে না। সভা এখানেই শেষ।
রাজসভা থেকে লোকেরা চলে যেতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সভায় রইল রাজা মন্ত্রী অমাত্য আর প্রহরীরা। আর রইল সেনাপতি ও ফ্রান্সিসরা।
–তোমাদের কয়েদঘরে পাঠানো হবে। মন্ত্রী বললেন।
–কেন? কী অপরাধ করেছি আমরা? শাঙ্কো বলল।
এবার রাজা হুয়াল্পা বললেন–উত্তর দিকে এক ছোট দেশে আমার এক বন্ধু। ওখানকার রাজা। ওখানে গৃহযুদ্ধ চলছে। বন্ধু যোদ্ধা চেয়ে অনুরোধ জানিয়েছে। ওখানে একশ যোদ্ধা পাঠিয়েছি আট দশদিন আগে। ঠিক এই সময়ই রাজা আত্তারিয়া আমার দেশ আক্রমণ করতে তৈরি হচ্ছে। আত্তারিয়া কী করে জেনেছে যে আমার যোদ্ধা সংখ্যা কমে গেছে। এটা নিশ্চয়ই তোমাদের কাজ। তোমরাই আত্তারিয়াকে খবরটা জানিয়েছে। রাজা আত্তারিয়া এই সুযোগটাই খুঁজছিল। তোমাদের জন্যই রাজা আত্তারিয়া আমার দেশ আক্রমণ করার জন্য তৈরি হয়েছে। বন্ধুকে পাঠানো যোদ্ধারা ফিরে আসার আগেই আত্তারিয়া আক্রমণ করবে।
–আপনি আমাদের ভুল বুঝেছেন। এসব ব্যাপারের সঙ্গে আমাদের কোনরকম যোগ নেই। একশ যোদ্ধা পাঠিয়েছেন এটা আপনার মুখ থেকেই প্রথম জানলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–মিথ্যে কথা। সব মিথ্যে। তোমরা সব জানো। রাজা বললেন।
–আমাদের বিশ্বাস করুন। ফ্রান্সিস বলল।
-না। তোমাদের আমি বিশ্বাস করি না। হুয়াল্পা কথাটা বলে সেনাপতির দিকে তাকালেন। বললেন–এই দুই গুপ্তচরকে কয়েদখানায় ঢোকাও। সেনাপতি এগিয়ে এল।
একটু চুপ করে থেকে ফ্রান্সিস বলল–কিন্তু সোনার খনির অনুসন্ধান করা–। ফ্রান্সিসদের কথাটা শেষ হবার আগেই রাজা হুয়াল্পা যেন গর্জন করে উঠলেন : সোনার খনি–মিথ্যে–আমাকে ভুল বোঝানো হয়েছে। রাজা মন্ত্রীর দিকে হাত বাড়াল। মন্ত্রী নকশাটা রাজাকে দিল। রাজা নকশাটা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেললেন।
–তাহলে তো আমাদের আর এই দেশে থাকার কোন অর্থ হয় না। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ কিছুদিন দণ্ডভোগের পর তোমরা এ দেশ ছেড়ে চলে যাবে–আমার হুকুম। রাজা হুয়াল্পা বললেন।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকাল। তারপর আস্তে বলল
–মাননীয় রাজা আপনি আমাদের মিথ্যে সন্দেহ করে আমাদের দুঃখ দিলেন। সোনার খনি মিথ্যে নয়। আমাকে অনুসন্ধান করতে দিলে আমি সোনার খনি উদ্ধার করে দেখাতাম আপনাকে ভুল বোঝাইনি। এই উদিন্না পাহাড়েই আছে সোনার খনি।
–ওসব বলে লাভ নেই। তোমাদের দণ্ডভোগ করতেই হবে। রাজা বললেন।
সেনাপতি ফ্রান্সিসদের কাছে এসে বলল–চল।
ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরের দরজার কাছে এল। সেনাপতি ইঙ্গিত করল। প্রহরী দরজা খুলে দিল। লোহার দরজা ঢংঢং শব্দে খুলে গেল। ফ্রান্সিসরা ঢুকল। দুজনে পাথরের দেওয়ালে পিঠ রেখে বসল। কেউ কোন কথা বলল না।
রাতের খাবার একটু তাড়াতাড়িই এল। ফ্রান্সিসরা খেয়ে নিল।
দুজনেই ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস পালাতে হবে।
–সে তো হবেই। কিন্তু কয়েকটা দিন অপেক্ষা করি। রাজা আত্তারিয়া এই দেশ আক্রমণ করবেই। আমরা লড়াইয়ের ডামাডোলের মধ্যে পালিয়ে যাবো।
–পালিয়ে কোথায় যাবে? জাহাজঘাটে? শাঙ্কো বলল।
–না। রাজা আত্তারিয়ার রাজত্বে লুকিয়ে থাকবো। তারপর নকশার অর্থ বের করে সোনার খনির হদিশ বের করব। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে তো আরো কিছুদিন এখানে থাকতে হবে। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। তা তো হবে। আমি নিশ্চিত নকশাটা সত্যি। ভূতুড়ে নকশা নয়। ফ্রান্সিস বলল।
অল্প দিনের মধ্যেই সোনার খনি উদ্ধার করতে হবে। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। শাঙ্কো–এখন ঘুমোও। শরীর সুস্থ রাখতে হবে। অসুস্থ হয়ে পড়লে সব মাটি। ফ্রান্সিস বলল।
