অল্পক্ষণের মধ্যেই সভার পরিবেশ শান্ত হল। রাজা তখন মন্ত্রীকে পাশে বসিয়ে নকশা দেখতে লাগলেন। মন্ত্রী নিবিষ্ট মনে নকশাটা দেখতে লাগলেন। রাজার নির্দেশে দুজন অমাত্যও মন্ত্রীর কাছে এলেন নকশা দেখতে লাগলেন। ফ্রান্সিস রাজাকে মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলল-নকশাটা তো দিয়ে দিয়েছি। তাহলে আমরা এখন যাবো?
–বেশ। যাও। রাজা বললেন।
–কিন্তু কোথায় যাবো? কয়েদখানায়? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–না-না। তোমরা সৈন্যাবাসে থাকবে। ওখানে তোমাদের নজরে রাখা যাবে। রাজা এবার সেনাপতির দিকে তাকালেন। বললেন–সেনাপতি এই দু’জন বন্দীর থাকার জন্যে সৈন্যাবাসের একটা ভালো ঘর দিন। লক্ষ্য রাখবেন যেন পালাতে না পারে।
সেনাপতি মাথা নিচু করে মাথা তুলল। ফ্রান্সিসদের ইঙ্গিত করল পেছনে পেছনে আসার জন্যে।
ফ্রান্সিসরা সেনাপতির পেছনে পেছনে চলল। সৈন্যাবাসে বেশ ভাল ঘর দেওয়া হল ওদের। সেনাপতি বলল–এই ঘরে থাকতে তোমাদের অসুবিধে হবে না। প্রয়োজনে আমার কাছে এসো। সেনাপতি চলে গেল।
লম্বা লম্বা শুকনো ঘাস আর কোন গাছের ছোবড়া দিয়ে তৈরি বেশ পরিপাটি বিছানা।
ফ্রান্সিস ঘরটায় ঢুকেই বিছানায় শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো হেসে বলল– ফ্রান্সিস তোমার এই এক রকম। বিছানা পেলেই শুয়ে পড়।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গভীর চিন্তা করা চলে না। এইজন্যে চাই বিছানা আর সময়। এখানে দুটোই পাবো বলে ভরসা করছি। ফ্রান্সিস বলল।
দুপুরের খাওয়া শেষ হল। ফ্রান্সিস বলল–বেশ বেলা হয়ে গেছে। আজকে আর উদিন্না পাহাড় দেখতে যাবো না। আজ শুধু বিশ্রাম আর চিন্তা। কালকে থেকে কাজ শুরু করবো।
–মনে হয় উদিন্না পাহাড়টাকে বোধহয় দুই রাজা ভাগ করে রেখেছে। উত্তরের রাজা হুয়াল্পার অধীন। দক্ষিণদিকটা রাজা আত্তারিয়ার এলাকা। দুই রাজাই এই ভাগ মেনে নিয়েছে বোধহয়। শাঙ্কো বলল।
–হুঁ। তাহলে দুই রাজার কাছ থেকেই অনুমতি নিতে হবে। দুই রাজাই যদি অনুমতি দেয় তাহলে অনেক সমস্যার হাত থেকে বাঁচা যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখ কথা বলে। শাঙ্কো বলল।
পরের দিন দুপুরে ফ্রান্সিসরা তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল। তারপর চলল। প্রথমে উত্তর দিক থেকে যাবে ফ্রান্সিস এটা ভেবে রেখেছিল।
হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনে উদিন্না পাহাড়ের উত্তরে পৌঁছল।
ফ্রান্সিস বলল–প্রথমে দক্ষিণ দিক থেকে দেখেছি একটা বড় ওক গাছ। ঐ গাছটার একটা ডাল ভেঙে রেখেছি যাতে পরে বুঝতে পারি।
উত্তরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলল। খুঁজতে লাগল একটা গাছ। পেল একটা বড় চেস্টনাট গাছ। ফ্রান্সিস গাছটায় উঠে একটা ডাল ভেঙে রাখল।
গাছ থেকে নেমেই দেখল মন্ত্রী আর সেনাপতি কয়েকজন যোদ্ধার সঙ্গে আসছে। ফ্রান্সিস শাঙ্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। মন্ত্রী ওদের কাছে এল। জিজ্ঞেস করল– তোমরাও খোঁজাখুঁজি করছে।
-নকশাটাতে যে ইঙ্গিত পেয়েছি সেটাই সম্বল করে সোনার খনি উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
–কিছু তথ্য-টথ্য পেলে? মন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন।
–তেমন কিছু না। ফ্রান্সিস বলল।
–আচ্ছা–একটা কথা জানার আছে। মন্ত্রী নকশাটা মেলে ধরে বললেন –এই আঁকাবাঁকা জিনিসটা কী?
–আপনার কী মনে হয়? ফ্রান্সিস বলল।
–এটাও একটা নকশা। কিন্তু এই দুর্বোধ্য নকশা ঠিক কী বলছে বুঝতে পারছি না। মন্ত্রী বললেন।
–এটা বড় নকশার একটা অংশ। ফ্রান্সিস বলল।
–পাহাড়টা বুঝেছি। কিন্তু এই নকশাটা বুঝতে পারছি না। মন্ত্রী বললেন।
ফ্রান্সিস সাবধান হল। ভাবল–ওটা যে একটা চারাগাছ একথা বললে মন্ত্রীর সন্দেহ হবে। ধরে নেবে আমরা অনেকটা অর্থোদ্ধার করতে পেরেছি। আমরা বিপদে পড়বো।
ফ্রান্সিস বলল–ঐ ছোট নকশাটা আমরাও বুঝিনি তবে বুঝতে চেষ্টা করছি–ওটা নিয়ে ভাবছি।
–ঠিক আছে–মন্ত্রী বললেন–তোমরা তোমাদের মত খোঁজ আমরা আমাদের মত খুঁজি। হয়তো আমরা একই সিদ্ধান্তে উপনীত হব। মন্ত্রী বললেন।
তাহলে তো সব চুকেই গেল। ফ্রান্সিস বলল।
–চলি। মন্ত্রীমশাই কথাটা বলে হাঁটতে শুরু করলেন।
ফ্রান্সিস শাঙ্কো আবার পাহাড়ের গা ঘেঁষে গাছ খুঁজতে লাগল।
আর একটা শিশুগাছ পেল। শাঙ্কো গাছটার একটা ডাল ভেঙে চলে এল। ফ্রান্সিস বলল
–এই গাছটা পাহাড়ের দক্ষিণাংশে। তার মানে রাজা আত্তাদিয়ার রাজত্বের মধ্যে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা আসছে তখনই আত্তারিয়ার সেনাপতিকে আসতে দেখল। ও বুঝল, ওরা দক্ষিণাংশে চলে এসেছে।
সেনাপতি কাছে এল। ফ্রান্সিসকে দেখে বলল–তোমরা রাজা হুয়াল্পার রাজত্ব থেকে চলে গেছ। তোমরা আমাদের রাজা আত্তারিয়ার হয়ে সোনার খনি খুঁজলে না।
–আমরা রাজা আত্তারিয়া আর রাজা হুয়াল্পা দুজনের জন্যেই সোনার খনি খুঁজব। ফ্রান্সিস বলল।
–দুই রাজাকেই সন্তুষ্ট করতে পারবে? সেনাপতি বলল।
–দেখি। সোনার খনি আবিষ্কারের আশায় আছি। আবিষ্কার করতে পারলে তখন দেখবো। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা ফিরে এল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস গুপ্ত সোনার খনির কিছু হদিশ করতে পারলে?
–গাছ আর পাহাড় এই দুটো ঠিক ঠিক বুঝতে পারলে সব রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
-এখন কী করবে? শাঙ্কো বলল।
–খুঁজবো–সোনার খনি। ফ্রান্সিস বলল।
–আমার কিন্তু কখনও কখনও মনে হচ্ছে এই নকশা একটা কাঁচা হাতে আঁকা ছবি। অর্থহীন। শাঙ্কো বলল।
