খাওয়া শেষ হল। আর এক কোণায় বড় জালায় রাখা জল তুলে তুলে খেল। খিদেটা একটু কমল।
শাঙ্কো উঠে দরজার কাছে এল। সেই প্রহরীর হাত ধরল। দুজনেই হাসল। শাফা ফিরে এল। ফ্রান্সিসের পাশে বসল।
রাতের খাওয়া সেরে ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো তখনও বসে আছে। ফ্রান্সিস বলল-শাঙ্কো ভেবে দেখলাম আগেই পালাবার কথা ভাববো না। চলো দেখি কালকে রাজা হুয়াল্পা কী বলে। নকশাটা দেখালে হুয়াল্পা একেবারে লাফিয়ে উঠবে। সোনার খনি বলে কথা।
–তাহলে রাজা হুয়াল্পা কি আমাদের ছেড়ে দেবে? শাঙ্কো বলল।
উল্টোটা–আমাদের অন্য ভালো ঘরে থাকতে দেবে। প্রত্যেক দিনই খবর নেবে আমরা কতদূর এগোলাম।
-নকশাটা তো নিয়ে নিতে পারে। শাঙ্কো বলল।
–নকশাটা আমার মুখস্থ হয়ে গেছে অর্থাৎ চোখ বুজলেই নকশাটা দেখতে পাই। ফ্রান্সিস বলল।
–তবে তো আমাদের এখানেই থাকতে হবে। শাঙ্কো বলল।
–যে কদিন থাকবো রাজার হালে থাকবো। সোনার খনির লোভ–কেউ মাথা ঠিক রাখতে পারে না। রাজা হুয়াল্পাও পারবে না।
কালকে তো আমাদের রাজার কাছে নিয়ে যাবে। দেখা যাক কী করে রাজা। শাঙ্কো বলল।
পরদিন বেশ ভোরেই ফ্রান্সিসের ঘুম ভাঙল। দেখল শাঙ্কো চুপ করে বসে আছে। ফ্রান্সিস হেসে বলল–কী হল? এত তাড়াতাড়ি উঠলে?
–ঘুম আসছিল না। নানা কথা ভাবছিলাম। শাঙ্কো বলল।
ফ্রান্সিস উঠে বসল। বলল–চিন্তা তো হবেই। আমরা এখানে বন্দী হয়ে পড়ে আছি, মারিয়া বন্ধুরা জাহাজে। আমাদের ফেরার প্রতীক্ষা করছে। শাঙ্কো ভেবো না সব ঠিক হয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
সকালে খাওয়াদাওয়ার পরেই দলপতি লোহার দরজার কাছে এল। পাহারাদার দরজা খুলে দিল। ভেতরে ঢুকে দলপতি ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল–রাজসভায় চল। তোমাদের বিচার হবে।
ফ্রান্সিস ও শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। দলপতির পেছনে পেছনে বাইরে এল। সবাই চলল একটা বড় বাড়ির দিকে।
–ঐ বড় বাড়িটা বোধহয় রাজবাড়ি। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। দলপতি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
রাজার সভাঘরে ঢুকল সবাই। একটা কাঠের সিংহাসনে রাজা হুয়াল্পা বসে আছেন। পাশে মন্ত্রী অমাত্যরা বসে আছেন। একটু পাশে সেনাপতি বসেছেন।
বিচার চলছিল। রাজা হুয়াল্পা এক পক্ষকে শাস্তি দিলেন। বিচারপ্রার্থীরা চলে গেল।
দলপতি সেনাপতিকে গিয়ে কিছু বলল। তখনও রাজা কাউকে ডাকেননি। সেনাপতি রাজার কাছে এসে কী বলল। রাজা গলা চড়িয়ে বলল–বিদেশিরা এসো। দলপতি ফ্রান্সিসদের এগিয়ে যেতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা এগিয়ে এল। রাজা ফ্রান্সিসদের দেখে বললেন–তোমরা কোন্ দেশ থেকে এসেছো?
–আমরা ভাইকিংদের দেশ থেকে আসছি। শাঙ্কো বলল।
–এখানে কেন এসেছো? রাজা হুয়াল্পা বললেন।
–দেশ দেখতে, মানুষ দেখতে, প্রকৃতি দেখতে। ফ্রান্সিস বলল।
–তাতে কী লাভ? রাজা একটু হেসে বললেন।
–লাভক্ষতির কথা আমরা ভাবি না। এইসঙ্গে অবশ্য অন্য একটা কাজও আমরা করি। কোন দেশে গুপ্তধনভাণ্ডারের খোঁজ পেলে আমরা সেই গুপ্তধনভাণ্ডার বুদ্ধি খাঁটিয়ে খুঁজে বের করি। ফ্রান্সিস বলল।
–তারপর সেই ধনভাণ্ডার নিয়ে নিজেদের দেশে পালিয়ে যাও। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না।
–তা এখানে কি কোন গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছো? রাজা বললেন।
–হ্যাঁ। এই উদিন্না পাহাড়েই আছে সোনার খনি। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা কী করে জানলে? রাজা জিজ্ঞেস করলেন।
–রাজা আত্তারিয়ার কাছ থেকে। ফ্রান্সিস বলল।
–সেই সোনার খনি কী ভাবে উদ্ধার করা যায় তা জেনেছো? রাজা বললেন।
–হ্যাঁ জেনেছি। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা হুয়াল্পা সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন–সত্যি?
-হ্যাঁ সত্যি। ফ্রান্সিস ঘাড় কাত করে বলল।
–সেই সোনার খনি আবিষ্কারের জন্যে কোন উপায় পেয়েছো? রাজা বললেন।
–হ্যাঁ পেয়েছি। ফ্রান্সিস বলল।
–কী পেয়েছো? রাজা বললেন।
ফ্রান্সিস কোমরের ফেট্টি থেকে নকশাটা বের করে মেলে ধরল।
রাজা হুয়াল্পা প্রায় ছুটে এসে নকশাটা প্রায় কেড়ে নিলেন।
রাজা হুয়াল্পা হা হা করে হেসে উঠলেন। গলা চড়িয়ে বললেন–এই নকশা তোমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে না।
–বেশ। কিন্তু শুধু নকশা পেলে কী হবে। নকশার অর্থ তো বের করতে হবে। নকশার রহস্যটা তো ভেদ করতে হবে। রাজা হুয়াল্পা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল–তোমরা কি নকশাটার অর্থ বের করতে পেরেছো? রাজা সিংহাসনে বসলেন।
–এখনও সবই অনুমান। প্রকৃত রহস্যটা এখনও ভেদ করতে পারিনি। ফ্রান্সিস বলল।
–তা নকশাটা আমার কাছে থাক। আমার মন্ত্রী, অমাত্যরা রয়েছেন। তারা নিশ্চয়ই নকশার অর্থটা ভেদ করতে পারবেন। রাজা বললেন।
–এইসঙ্গে আমি বলি আমাদের দুজনকেও অনুমতি দিন নকশার রহস্য উদ্ঘাটনের জন্যে। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ তোমরাও চেষ্টা কর। মোট কথা সোনার খনি আমার চাই-ই চাই। রাজা গলা চড়িয়ে বললেন।
তাহলে আমাদের এই অনুমতি দিন–আমরা যখন যেখানে খুশি যেতে, পারবো। নকশার রহস্য উদ্ঘাটন করতে গেলে আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা চাই। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ তো। আমি সেনাপতিকে বলে দেব। রাজা বললেন।
রাজা হুয়াল্পা সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন–আজ আর আমি বিচারের করব না। সবাই চলে যাও।
বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। রাজার হুকুম। মানতেই হবে। সবাই আস্তে আস্তে সভাকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে লাগল।
