উদিন্না পাহাড়ের পাদদেশেই যা সবুজের সমারোহ। পাহাড়ের মাঝামাঝি থেকেই রুক্ষ ধূলোটে রঙের পাথর। ফ্রান্সিস বলল-নক্শার চারাগাছটিকে আগে খুঁজে পেতে হবে।
–চারাগাছটা আর চারাগাছ নেই। এখন মহীরুহ বিরাট গাছ। শাঙ্কো বলল।
-হ্যাঁ। সেটা হিসেবে রাখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে পাহাড়ের ঠিক পাদদেশ দিয়ে চলল। লক্ষ্য একটা বড় গাছ। দুজনে পাহাড়ের গা ঘেঁষে মাথা তুলে দাঁড়ানো বড় গাছ খুঁজতে খুঁজতে চলল।
এরকম দুটো গাছ ওরা পেল। ফ্রান্সিস গাছের কাণ্ড বেয়ে উঠে একটা ডাল ভেঙে রাখল। আর একটা গাছেরই ডাল ভাঙল।
তখন শেষ বিকেল। দুজনেই বেশ ক্লান্ত। বেশ জলতেষ্টা পেয়েছে। কিন্তু এখানে কোথায় জল?
হঠাৎ পেছনের ঝোঁপজঙ্গলে খখস্ শব্দ উঠল। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। মৃদুস্বরে বলল–শাঙ্কো–আমরা বিপদে পড়লাম। ফ্রান্সিসের কথা শেষ হয়েছে মাত্র পেছনে বেশ জোরে সরসর শব্দ উঠল। মুহূর্তে চারপাঁচজন যোদ্ধা বর্শা হাতে ছুটে এল। ফ্রান্সিস দুহাত তুলে বলল–আমরা বিদেশি ভাইকিং। তোমাদের ঝগড়া লড়াইয়ের মধ্যে আমরা নেই।
যোদ্ধারা আস্তে আস্তে বর্শা নামাল। এই যোদ্ধাদের পোশাক অন্যরকম। ওরা ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। বর্শা নামানো।
ফ্রান্সিস বলল–ভাই তোমরা কোন রাজার যোদ্ধা?
উত্তরের হুয়াল্পা রাজার যোদ্ধা আমরা। আমরা উদিন্না পাহাড়ের নিচে পাহারা দিই।
-কেন পাহারা দাও? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–এই উদিন্না পাহাড়ের কোথাও রয়েছে সোনার খনি। দলপতি যোদ্ধা বলল।
–এটা কি সত্যি? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ সত্যি। আমরা দক্ষিণ দিকটা পাহারা দিই না। ওটা দক্ষিণের রাজা আত্তারিয়ার যোদ্ধারা পাহারা দেয়। তোমরা উত্তরে এসেছো কেন? একজন বলল।
–এমনি। আমরা অনেক দেশে গেছি। কত ভালো ভালো মানুষ দেখেছি। আবার নৃশংস মানুষও দেখেছি। তবু সব মিলিয়ে পৃথিবীটা কী সুন্দর। এইজন্যেই মানুষ প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখবো বলে এখানে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা আর কিছু কর না? দলপতি যোদ্ধা বলল।
–হ্যাঁ গুপ্ত ধনভাণ্ডারের খোঁজ পেলে বুদ্ধি খাঁটিয়ে তা উদ্ধার করি। ফ্রান্সিস বলল।
তারপর ধনসম্পদ নিয়ে পালিয়ে যাও। যোদ্ধাটি বলল।
–এ কথাটা অনেকের মুখে শুনেছি। তারা আমাদের বিশ্বাস করে নি। এই নিয়ে কিছু বলবো না। ফ্রান্সিস বলল।
-হ্যাঁ বোঝা গেল। দলপতি বলল। তারপর গলা চড়িয়ে বলল–এদের হাতে দড়ি বাঁধে।
–তাহলে আমরা বন্দী হলাম। কোন অপরাধ না করে। শাঙ্কো বলল।
–রাজা হুয়াল্পা তোমাদের বিচার করবেন। রাজা যা বিচার করবেন তাই তোমাদের মেনে নিতে হবে। দলপতি বলল।
–কখন বিচার হবে? শাঙ্কো বলল।
–কাল সকালে রাজসভায়। দলপতি বলল। তারপর যোদ্ধাদের হুকুম দিল– এই বিদেশি দুজনকে নিয়ে চল। হাত বাঁধা অবস্থায় ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোকে ওরা নিয়ে চলল।
উত্তর দিকে বেশ কিছুটা হেঁটে রাজা হুয়াল্পার দেশে এল। নগরটি একটু বড়ই মনে হল ফ্রান্সিসের কাছে। লোকজনের ভিড় আছে। সন্ধ্যে হয়েছে। দোকানে বাড়িতে কাঁচটাকা আলো যতটুকু আলো ছড়াচ্ছে।
নগরের মধ্যে দিয়ে হাঁটিয়ে দুজনকে কয়েদখানার কাছে নিয়ে আসা হল। দলপতির নির্দেশে প্রহরীরা লোহার দরজা খুলল। ফ্রান্সিসদের ভেতরে ঢোকানো হল। একটু জোর খাটাল দুজন যোদ্ধা। ফ্রান্সিস একবার ওদের মুখের দিকে তাকাল। শাঙ্কো বুঝল ফ্রান্সিস ক্রুদ্ধ হয়েছে। ও বলে উঠল–ফ্রান্সিস ভাই সংযত হও। ফ্রান্সিস ঘরের এক কোণায় চলে এল। ছড়ানো শুকনো ঘাসপাতার ওপর শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো পাশে বসল। ফ্রান্সিস হেসে বলল-শাঙ্কো জীবনের কত দিন কয়েদঘরে কেটে গেল–হিসেব করিনি।
–তুমি তো এরকম জীবনই চাও। শাঙ্কো বলল।
–অবশ্যই চাই। এজন্যে আমার কোন দুঃখ নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–ফ্রান্সিস তুমি আমাদের মত নও। অন্যরকম। শাঙ্কো বলল।
–হবে। এসব ভাবিনি কোনদিন। ফ্রান্সিস বলল।
–আমার খুব খিদে পেয়েছে। শাঙ্কো বলল।
–আমারও। পাহারাদারদের বলে দেখতো? ফ্রান্সিস বলল।
–দেখি। শাঙ্কো উঠে লোহার দরজার কাছে গেল। বর্শা হাতে এক পাহারাদারকে হাতের ইঙ্গিতে ডাকল। প্রথম পাহারাদারটা মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। অন্য একজনকে ডাকল। সে এগিয়ে এল। বলল
–কী ব্যাপার? কী হয়েছে?
–আমরা দু’জন এইমাত্র এলাম। খুব খিদে পেয়েছে আমাদের। শাঙ্কো বলল।
–সেই রাতে খাবে। এখন নয়। পাহারাদার বলল।
–এটা রাজার হুকুম বোধহয়। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। পাহারাদারটি বলল।
উনি রাজা মানুষ। খিদে ব্যাপারটা কী উনি জানবেন কী করে। যাকগে তুমি কিছু রুটি চিনি আনন। শাঙ্কো বলল।
–আমি পারবো না। নিয়ম ভাঙলে আমি বিপদে পড়ে যাবো। প্রহরীটি বলল।
লুকিয়ে চুরিয়ে খাবার দিতে পারো। অবশ্য তোমার যদি ইচ্ছে হয়। শাঙ্কো বলল।
পাহারাদার বর্শা হাতে এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে পাহারা দিচ্ছিল। এবার থামল। তারপর শাঙ্কোর মুখের দিকে তাকাল। কী ভাবল। দরজার কাছেই দুটো মশাল জুলছিল। পাহারাদারটি আলো থেকে আস্তে সরে গেল। অন্ধকার বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল। হাতে পাতায় জড়ানো রুটি আর চিনি। সঙ্গের পাহারাদার দরজা থেকে সরে যেতেই ও দ্রুত দরজার কাছে এল। তখনও শাঙ্কো দাঁড়িয়ে ছিল। ও শাঙ্কোকে খাবার দিয়েই সরে এল।
শাঙ্কোও পাতায় মোড়ানো রুটি চিনি নিয়ে নিল। পেছন ফিরে ফ্রান্সিসের কাছে এল। এখানে ঘরের কোণায় মশালের আলো তেমন জোরালো নয়। শাঙ্কো আর ফ্রান্সিস রুটি ভাগ করে চিনি দিয়ে খেতে লাগল। একটু আড়াল দিয়ে।
