রাজা বললেন–তোমরা বিদেশি। তবে কেন গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িয়ে গেলে।
–মান্যবর রাজা–ফ্রান্সিস বলল–এটা আমরা বুঝতে পারছি না কে বা কারা আমাদের গুপ্তচর বলে ধরে নিল। মাত্র একরাত হল আমরা এই গ্যালিগসে এসেছি। যে দেশকে আমরা জীবনে কোনদিন দেখি নি সেখানে এসে গুপ্তচরবৃত্তি করতে যাব কেন? কী লাভ আমাদের? আমরা গুপ্তধনের খোঁজখবর নিয়ে চলে যাবো। গুপ্তধনের খোঁজ পেলে থাকবো। গুপ্তধন খুঁজে আবিষ্কার করব। এর বাইরে আমরা কোন কাজ করি না। এখানকার লড়াইয়ে আমরা জড়াতে যাবো কেন?
–অর্থ–অর্থ–প্রচুর অর্থ পাবেন সেই লোভে। রাজা বললেন।
মাননীয় রাজা–আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না কী অপরিসীম মূল্যবান গুপ্তধন আমরা আবিষ্কার করেছি। তার সামান্য অংশ আমরা আমাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনে নিয়েছি। কাজেই আমাদের অর্থাভাব নেই। আমরা যথেষ্ট ধনী। সামান্য অর্থের বিনিময়ে গুপ্তচরবৃত্তি করবো আমরা এতটা নীচ নই। রাজা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন–তোমাদের কথা শুনলাম। তবে লড়াইয়ের আগে তোমাদের মুক্তি দেওয়া হবে না। ঐ তাবুতেই তোমাদের থাকতে হবে। শাঙ্কো বলল
সমুদ্রতীরে আমাদের জাহাজ রয়েছে। আমরা বন্দী হয়ে থাকলে বন্ধুরা আমাদের খোঁজে আসবে। তখন আপনার যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াই হওয়া অসম্ভব নয়। ফ্রান্সিস বলল।
তোমাদের যোদ্ধারা তোমাদের মুক্ত করতে আসুক-হোক লড়াই দেখা যাক কী হয়। রাজা বললেন।
–মাননীয় রাজা–সেক্ষেত্রে আপনার দুটো লড়াই চালাতে হবে। হুয়াল্পার সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ একদিকে, অন্যদিকে আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে। এরকম লড়াই কি আপনি চালিয়ে যেতে পারবেন?
রাজা একটু ভেবে নিয়ে বললেন–দু’ জায়গাতেই আমরা লড়াই চালাবো।
–আপনারা হেরে যাবেন। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। দেখা যাক। রাজা বললেন।
–আপনারা তরোয়ালের নামই শোনেনি। এই যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে বন্ধুরা লড়াইয়ে নামবে। আপনার যোদ্ধারা এই যুদ্ধাস্ত্রের সামনে শুধু বর্শা নিয়ে দাঁড়াতেই পারবে না। ফ্রান্সিস বলল।
-হু। রাজা মুখে শব্দ করলেন। ফ্রান্সিস বলল–তার চাইতে আমাদের মুক্তি দিন আমরা আমাদের জাহাজে ফিরে যাই।
না। তোমাদের বন্দী হয়ে থাকতে হবে। রাজা বললেন রাজা যযাদ্ধাকে ইঙ্গিত করলেন ডান হাত তুলে। যোদ্ধা এগিয়ে বলল–চল সব।
ফ্রান্সিসরা তাবুর বাইরে বেরিয়ে এল। চলল তাবুর কয়েদখানার দিকে। তাঁবুতে ঢুকে ফ্রান্সিসরা বসল। শাঙ্কো বলল–পালাবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বোঝো ফ্রান্সিস এখানে লোহার গরাদ নেই।
হু। কিন্তু পাহারাদারদের দেখে বুঝেছি এরা ভীষণ সতর্ক। পালানো সহজ হবে না। ফ্রান্সিস বলল।
–সেটাই ভেবে উপায় ঠিক কর। বিস্কো বলল।
কাজটা হল–এখান থেকে যতদূর সম্ভব জোরে ছুটে জঙ্গলে ঢুকে পড়তে হবে। শাঙ্কো বলল।
–সেক্ষেত্রে প্রহরীরা বর্শা ছুঁড়ে মারবে। অল্প আলোতেও ওদের দৃষ্টি চলে। কাজেই নিখুঁত নিশানায় ওরা বর্শা ছুঁড়তে পারবে। আমরা মারাত্মক আহত হব অথবা মারা যাবো। কাজেই অপেক্ষা কর। দেখা যাক রাজা আত্তারিয়া আর হুয়াল্পার। সঙ্গে লড়াইটা কবে লাগে। যোদ্ধারা লড়াই নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আমরা সহজেই পালাতে পারবো। ফ্রান্সিস বলল।
প্রহরী রাতের খাবার নিয়ে এল। গোল রুটি আর কী পাখির মাংস। ক্ষুধার্ত দুজনেই গগপ করে খেল। খাওয়া শেষ। প্রহরী চলে গেল।
তিনি দিন কাটল। ফ্রান্সিসরা ফিরছে না। মারিয়া আর বন্ধুরা চিন্তায় পড়ল। শুধু জায়গাটা কী সেটা জানতে গেছে। এইজন্যে এতদিন লাগার কথা নয়। মারিয়ার শুকনো মুখ চোখ দেখে হ্যারি খুব দুশ্চিন্তায় পড়ল। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। বৈদ্য ভেন বয়েসে ফ্রান্সিসদের চেয়ে বড়। ভেনই মারিয়া হ্যারিকে সান্ত্বনা দেয়–কিচ্ছু ভেবো না–ফ্রান্সিসকে আটকে রাখার সাধ্য কারো নেই। হ্যারি একটু সান্ত্বনা পায়। মারিয়া কিছু বলে না।
দিন কয়েক কেটে গেল। ফ্রান্সিসদের পালানো হল না। ওরা গভীর রাতে উঠে দেখেছে প্রহরীরা বর্শা হাতে পাহারা দিচ্ছে। এরা কি রাতে ঘুমোয় না?
সেদিন শাঙ্কো বলল ফ্রান্সিস–চলো একবার পালাবার চেষ্টা করে দেখি।
লাভ নেই। উপরন্তু মরে যাব অথবা আহত হবো। ফ্রান্সিস বলল।
–আবার পালিয়েও যেতে পারি–অক্ষত। শাঙ্কো বলল।
-কতদিন এখানে পড়ে থাকবো? বিস্কো বলল।
–বেশ। চেষ্টা করে দেখা যাক্। ফ্রান্সিস বলল।
সেদিন রাতের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিসরা শুয়ে পড়ল না। বসে রইল।
রাত গভীর হচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো একবার আকাশটা দেখো তো। চাঁদের আলো কেমন? তাঁবুর বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখল শাঙ্কো। বলল– জ্যোৎস্না আছে। তবে খুব উজ্জ্বল নয়। কুয়াশাঢাকা।
–ঠিক আছে। তৈরি হও। পেছনের জঙ্গলটার দিকে ছুটতে হবে। একবার জঙ্গলে ঢুকতে পারলে নিশ্চিন্ত। ফ্রান্সিস বলল।
তিনজন উঠে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎই তিনজনে পেছনের জঙ্গলের দিকে ছুটল। প্রহরীরা কতটা সজাগ বোঝা গেল সেটা। দুজন প্রহরী ফ্রান্সিসদের পেছনে ছুটতে ছুটতে একজন বর্শা ছুঁড়ল ফ্রান্সিসদের লক্ষ্য করে। বর্শাটা ফ্রান্সিসের মাথায় প্রায় লেগেছিল। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে ফেলল। বর্শাটা সামনে মাটিতে গেঁথে গেল। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল।
আবার বর্শা ছুটে এসে শাঙ্কোর ডান পা ছুঁয়ে মাটিতে পড়ল। মাটিতে গেঁথে গেল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–শাঙ্কো থেমে যাও। শাঙ্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। বিস্কো ছুটে চলেছে। মাটিতে গাঁথা বর্শা তুলে নিয়ে মারতে প্রহরীটি দেরি করল। বর্শা ছোঁড়ার আগেই বিস্কো জঙ্গলের প্রথম গাছটা পেরিয়ে গেল। জঙ্গলে ঢুকে গেল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–বিস্কো–কেউ যেন না আসে। লড়াই নয়।
