লোকটা হাঁপাচ্ছে তখন। শাঙ্কোও হাঁপাতে লাগল।
ফ্রান্সিস ওদের কাছে এল। লোকটাকে দেখল। ওর গায়ে মোটা সুতোয় তৈরি পোশাক পরে আছে। মুখচোখে ভয়।
ফ্রান্সিস বলল–ভয় নেই। আমরা তোমার কোন ক্ষতি করবো না। থেমে বলল– এই জায়গার নাম কী?
–গ্যালিগস।
–এটা কোন দেশ?
লোকটি মাথা এপাশ ওপাশ করল। ফ্রান্সিস বুঝল লোকটি দেশের নাম বলতে পারবে না। অতটা জ্ঞানবুদ্ধি ওর নেই। এবার শাঙ্কো বলল–তোমাদের রাজার নাম কী?
—-আত্তারিয়া। লোকটি বলল।
-উনি কোথায় থাকেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–ঐখানে উদিন্না পাহাড়ের নিচে। লোকটি বলল।
ফ্রান্সিসরা কথা বলছে তখনই পেছনের ছোট টিলাটার মাথায় পাঁচ ছ’জন যোদ্ধাকে দেখল। তাদের হাতে বর্শা। ফ্রান্সিস বুঝল বিপদ। গলা চড়িয়ে বলল– শাঙ্কো বিস্কো পালাও।
ফ্রান্সিসরা দ্রুতপায়ে সমুদ্রতীরের দিকে ছুটল। তখনই দেখল সমুদ্রতীরের দিক থেকে কয়েকজন যোদ্ধা উঠে আসছে। দুদিক থেকে ফ্রান্সিসরা আটকে গেল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ডানদিকে। কিন্তু ওরা ডানদিকে দৌড়োতে যাবে তখনই দেখল ডানদিকের জংলা গাছের জঙ্গল থেকে কয়েকজন যোদ্ধা এগিয়ে আসছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–আমরা ধরা পড়ে গেছি। পালাবার চেষ্টা করো না। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাক।
যোদ্ধারা আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসদের ঘিরে ফেলল। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে রইল। টিলার দিক থেকে একজন ন্যাড়ামাথা বলিষ্ঠ লোক এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বুঝল এই দলপতি। দলপতির হাতে একটা লোহার বর্শা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ ভারী।
–তোমরা বিদেশী? দলপতি জিজ্ঞেস করল।
–হ্যাঁ। আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।
–এই দেশে এসেছো কেন? দলপতি জিজ্ঞেস করল।
বলতে পারেন বেড়াতে। শাঙ্কো বলল।
–তোমরা জানো পাহাড়ের ওপারের রাজ্যের রাজা হুয়াল্পারের সঙ্গে আমাদের লড়াই আর কিছুদিনের মধ্যে শুরু হবে। দলপতি বলল।
–না। এখানে আমাদের জাহাজে চড়ে এসেছি ঘণ্টাখানেক হল। ফ্রান্সিস বলল।
–বিশ্বাস করতে পারলাম না। রাজা হুয়াল্পার গুপ্তচর তোমরা। দলপতি বলল।
এই রাজ্যে আমরা যুদ্ধের জন্যে কী সব ব্যবস্থা নিচ্ছি এটাই তোমরা গোপনে নি জানতে এসেছে। দলপতি বেশ গলা চড়িয়ে বলল।
ফ্রান্সিস গলায় বেশ জোর দিয়ে বলল–আমরা গুপ্তচর নই। আমরা বিদেশি। জাহাজে চড়ে এসেছি। যদি গুপ্ত ধনভাণ্ডারের খবর পাই তাহলে আমরা থাকবো যতদিন না গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারছি। গুপ্তধন উদ্ধার করে গুপ্তধন যার বা যাদের পাওনা তাদের হতে দিয়ে চলে যাবো। এছাড়া এখানে আসার অন্য কোন কারণ নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা বিশ্বাস করি না। দলপতি বলল।
–তাহলে আমরা নাচার। আপনি যা ভাববার ভেবে নিন। ফ্রান্সিস বলল।
–সব কটাকে বন্দী কর। দলপতি হুকুম দিল।
একজন যোদ্ধা এগিয়ে এল। হাতে দড়ি। প্রথমে ফ্রান্সিসের হাতে দড়ি বাঁধল। ফ্রান্সিস কোন আপত্তি করল না। বরং বলল–আপত্তি করো না। এর সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে। শাঙ্কো বিস্কোর হাতও দড়ি দিয়ে বাঁধা হল।
দলপতির নির্দেশে ছোট পাহাড়টার দিকে চলল সবাই। পাহাড়ের নিচে পৌঁছে ফ্রান্সিসরা দেখল চামড়ার তাবু মত। তাঁবুগুলো অনেকটা জায়গা জুড়ে। ফ্রান্সিসদের দেখতেই বোধহয় তাঁবুগুলো থেকে মেয়েরা শিশুরা বেরিয়ে এল।
একটা তাবুর কাছে এল সবাই। দলপতি ফ্রান্সিসদের বলল–এইখানে তোমরা বন্দী হয়ে থাকবে। যতদিন রাজা বলবেন তত দিন। এবার তাঁবুটায় তোক। ফ্রান্সিসরা তাঁবুতে ঢুকল। মোটামুটি প্রশস্ত। টান হয়ে শুলে তাবুর বাইরে পা চলে যাবে। তবে তিনজন এঁটে যাবে। রান্নার জিনিসপত্র উনুন এসব রাখা নেই। তবে তিনজন এঁটে যাবে। বন্দীদের জন্যেই রাখা হয়েছে। একটা কাঠের পাটা মেঝেয় পাতা। ওটার ওপরেই তিনজনকে বসতে বলা হল।
জল খাবো। বিস্কো বসতে বসতে বলল। একজন আঙ্গুল দিয়ে কোণার দিকে দেখাল। বিস্কো ওখানে গেল। দেখল একটা চামড়ার থলিতে জল রাখা। ও থলিতে মুখ চেপে জল খেল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোও জল খেল।
–তোমাদের খাবার আসছে। খেয়ে দেয়ে আমাদের রাজা আত্তারিয়ার কাছে যেতে হবে। তোমাদের কী শাস্তি দেওয়া হবে সেটা রাজাই জানাবেন। দলপতি আর কয়েকজন চলে গেল। দু’জন পাহারায় রইল।
কিছুক্ষণ পরে খাবার এল। দু’জন লোক নিয়ে এল। বড় পাতা পেতে দেওয়া হল। তাতে খাবার দেওয়া হল। ফ্রান্সিস বলল–পেট পুরে খাও। ভালো না লাগলেও খাও। তিনজনে চেয়ে চেয়ে খেল। লোকেরা চলে গেল।
বিকেল হল। দলপতি একাই এল। বলল–চল আমাদের রাজার কাছে যেতে হবে। ফ্রান্সিস বলল-খাওয়ার সময়ও আমাদের হাতের বাঁধন খোলা হল না। বাঁধা দু’হাত নিয়ে খাওয়া যায়? এখনও বাঁধন খোলা হল না।
দলপতি ফ্রান্সিসদের হাতের দড়ি একটা ধারালো ছোট কুঠার দিয়ে কেটে দিল। তাঁবুর বাইরে এল ওরা। দলপতির পেছনে পেছনে চলল।
এলাকার মাঝখানে বেশ বড় একটা তাবু। তাবুর সামনে এল ওরা। দলপতি তাঁবুর ভাঁজকরা চামড়া সরিয়ে ভেতরে তাকাল। বলল–মাননীয় রাজা গুপ্তচরদের এনেছি।
–ভেতরে এসো। রাজার বেশ ভারী গলা। দলপতি ফ্রান্সিসদের তাঁবুতে ঢোকবার জন্যে ইঙ্গিত করল।
ফ্রান্সিসরা তাঁবুতে ঢুকল। বড় তাবু তাই মেঝেও বড়। একপাশে রাজা আত্তারিয়া কাঠের আসনে বসে আছেন। চোখ নাক মুখ সুন্দর। সুগঠিত দেহ। গলায় নানা রঙের ছোট ছোট পাথর। রাজা বসবার ইঙ্গিত করলেন। ফ্রান্সিসরা বসল।
