ফ্রান্সিসের কথা শেষ হতেই ভাইকিং বন্ধুরা কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল। একদল দড়িদড়া খুলে পাল নামাতে লাগল। চারপাঁচজন মাস্তুলে বাঁধা দড়িদড়া খুলতে লাগল। অনেকটা করে দড়ির পাঁচ খুলে এল। সেই মোটা দড়িগুলো ধরে কিছু ভাইকিং তৈরি হয়ে দাঁড়াল।
কয়েকজন দাঁড়ঘরে গেল। দাঁড়গুলো আসনের সঙ্গে বেঁধে রেখে এল। ঝড়ের ধাক্কায় দাঁড়গুলো ভাঙবে না।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। যেন কালো আকাশটাকে চিরে ফেলছে।
হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ তুলে ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়ল ফ্রান্সিসদের জাহাজের ওপর। ফেনিল জল ডেক-এর ওপর দিয়ে গিয়ে অন্যপাশে পড়তে লাগল। তার সঙ্গেই বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি শুরু হল। একটু পরেই মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে লাগল।
ডেক-এর ওপর দিয়ে কোনওরকমে হেঁটে ফ্রান্সিস ফ্লেজারের কাছে এল। ফ্লেজার হুইল এদিক ওদিক ঘোরাতে ঘোরাতে ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করতে লাগল।
ফ্রান্সিস হুইল ধরে দাঁড়ানো জাহাজ চালক ফ্লেজারকে বলল–সাবধান জাহাজ যেন ডোবে না। কথাটা এই প্রচণ্ড ঝড়ে ফ্লেজার শুনতে পেল না। ফ্রান্সিস বুঝল সেটা। ফ্রান্সিস এবার ফ্লেজারের কানের কাছে মুখ এনে কথাটা আবার বলল। ফ্লেজার হাতটা একটু উঠিয়ে বলল–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস কথাটা শুনল না। কিন্তু বুঝতে পারল।
ডেক-এর ওপর দাঁড়িয়ে কয়েকজন ভাইকিং মাস্তুলে বাঁধা মোটা মোটা দড়িদড়া টেনে ধরে রইল। ওরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ–জাহাজ ডুবতে দেবে না।
কিছুক্ষণ পরে বাতাসের বেগ কমল। তারপরেই বৃষ্টি কমল। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাওয়ার সেই তেজ আর রইল না।
ভাইকিংরা ডেক-এর ওপর পড়ে আছে। সারা গা ভেজা যেন চান করেছে। একজন দু’জন করে সবাই উঠে দাঁড়াতে লাগল। ফ্রান্সিসও মাস্তুলে টানা কাছিতে হাত লাগিয়েছিল। ওরও অবস্থা বন্ধুদের মতই, ফ্রান্সিস কেবিনঘরের দিকে চলল। জাহাজ একটা দ্বীপের কাছে চলে এসেছে।
সন্ধ্যের পরে হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফ্রান্সিস তখন বিছানায় আধশোয়া। মারিয়া কীসব সেলাই করছিল। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস এখন কী করবে?
-কোথায় এলাম এটা সবকিছুর আগে জানা দরকার। নইলে হিসেবে গণ্ডগোল হয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
–তা তো ঠিকই। তাহলে আজকে তো আর তীরে নামছো না। হ্যারি বলল।
–না। আজকের রাতটা কাটুক। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। তাহলে কালকে খোঁজ নিতে যাবে। হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ। অঞ্চলের লোকদের সঙ্গে কথা বলে সব জানতে পারবো। ফ্রান্সিস বলল।
–সেটাই ভাল হবে। চলি। হ্যারি চলে গেল।
পরের দিন সকালের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিস ফ্লেজারের কাছে যাচ্ছে তখনই মারিয়া বলল–তুমি কী স্থির করেছো?
–কী স্থির করেছি সেটা বলার সময় এখনো আসে নি। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া একটু অভিমানভরে বলল–তুমি তো আমাকে আগে থেকে কিছু বলো না।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–এ তোমার অনর্থক অনুযোগ, অভিমান। তোমাকে না জানিয়ে কোন কাজ আমি করি?
-হ্যাঁ, মাঝে মাঝে করো। মারিয়া বলল।
–এ তোমার ভুল বোঝা। এসব নিয়ে মিছিমিছি মন খারাপ করো না। আমি যা ঠিক করি তা আমাদের ভালর জন্যেই। ফ্রান্সিস বলল।
তখনই এক ভাইকিং বন্ধু খাবার নিয়ে এল। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খাবার খেয়ে নিল! তারপর বাইরে এল। ডেক-এ শাঙ্কোকে দেখল। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো –তোমার সকালের খাবার হয়েছে?
-হ্যাঁ। এখন কী করবে? শাকো বলল।
–সেটাই ভাবছিলাম। যাকগে-চলো তীরে নামি। খোঁজখবর করি। ফ্রান্সিস বলল।
দিনের বেলাই যাবে? শাঙ্কো বলল। –হ্যাঁ। রাতে নামলে বিপদে পড়তে পারি। ফ্রান্সিস বলল।
–আর কাকে নেবে? শাঙ্কো বলল।
–হ্যারি এখনও যথেষ্ট দুর্বল। ভাবছি বিস্কোকে নিয়ে যাবো।
বিস্কোকে একবার ডাকো তো। ফ্রান্সিস বলল।
একটু পরেই বিস্কো এল।
–বিস্কো–শোন–আমরা তীরে নামবো। জানতে হবে আমরা কোথায় এলাম। তুমি আর শাঙ্কো আমার সঙ্গে থাকবে। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। বিস্কো মাথা কাত করে চলল।
–দু’জনেই তৈরি হয়ে এসো। তরোয়াল তীরধনুক সঙ্গে নিও না।
শাঙ্কো আর বিস্কো চলে গেল।
ফ্রান্সিসও তৈরি হল।
মারিয়া বলল–এখানে কি নামতেই হবে?
–উপায় নেই। সঠিক জানতে চাই আমরা কোথায় এলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–বিপদ তো হতে পারে। মারিয়া বলল।
–নিশ্চয়ই বিপদ আছে। কিন্তু জীবনের ঝুঁকিটা নিতেই হবে। নইলে সত্যটা জানবো কী করে? ভয় নেই আমরা সাবধানে থাকবো।
শাঙ্কো আর বিস্কো এল। তিনজন ডেক-এ উঠে এল।
তিনজনে জাহাজের দড়ির সিঁড়ি বেয়ে একটা নৌকোয় নামল। শাঙ্কো নৌকোর দড়ি খুলে জাহাজের গায়ে ধাক্কা দিয়ে নৌকো সরিয়ে আনল। তারপর তীরভূমি লক্ষ্য করে নৌকোর দাঁড় বাইতে লাগল।
তীরে পৌঁছল। আর একটা ছোট জাহাজও নোঙর ফেলে আছে। জাহাজের মাথায় উড়ছে পর্তুগালের পতাকা।
যেখানে নামল সেখানে একটু উঠেই পায়ে চলা পথের মতো দেখল। দুপাশে ঝোঁপ জঙ্গল।
শাঙ্কো নৌকেটা তীরভূমিতে তুলে রাখল। জোয়ার এলে নৌকোটা আর ভেসে যাবে না।
ওরা চলল। পাখির বিচিত্র সব ডাক। রোদও চড়া নয়। হাঁটতে ভালোই লাগছিল।
হঠাৎ ফ্রান্সিস দেখল দুতিনজন লোক জলাজঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের দেখে ওরা সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস দেখে বুঝল লোকগুলো এখানে কোন বিদেশিকে দেখবে এটা বোধহয় কল্পনাও করেনি। ওরা থেমে আছে। ফ্রান্সিস বুঝল ওরা ছুটে পালাবার জন্যে তৈরি। ফ্রান্সিস আস্তে বলল–শাঙ্কো– ছোট। অন্তত একটাকে ধর। তখনই তিনজন বাঁ দিকে দৌড় দিল। শাঙ্কো ওদের চেয়েও দ্রুত ছুটে পেছনেরটাকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে পড়ে গেল। শাঙ্কো লোকটার হাত ধরল। লোকটাকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
