এবার ফ্রান্সিস বলল-রাজকুমারীর সন্ধান পেতে আমাদের সারা শহর খুঁজে দেখতে হবে। তার আগে কবিরাজের বাড়ি যাবো। কথায় কথায় কিছু সূত্র পেতে পারি। আমরা কবিরাজকে স্পষ্ট বলব–আপনি আমাদের জব্দ করতে রাজকুমারীকে হরণ করিয়েছেন। কবিরাজের মনোভাবটা কী দাঁড়ায় সেটা বোঝা যাবে। কবিরাজের বাড়ি চলো।
সবাই কবিরাজের বাড়ির দিকে চলল।
কবিরাজের বাড়ির সামনে এল। দেখল একজন দারোয়ান বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে পেতলের বর্শা। ফ্রান্সিস ওর কাছে গেল। দারোয়ানকে দেখল সন্দেহ নেই দারোয়ান বলিষ্ঠ। ফ্রান্সিস বলল–আমরা কবিরাজমশাইর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
তবে ভেতরে প্রথম ঘরটায় যান। দারোয়ান বলল।
ফ্রান্সিসরা সেই ঘরে ঢুকল। দেখল বেশ বড় ঘর। দেয়াল আলমারি ভর্তি অনেক কাঁচের বোয়াম। ফরাস পাতা। ফরাসে তিন চারজন লোক বসে রয়েছে। বোধহয় চিকিৎসার জন্য এসেছে।
ফ্রান্সিসরাও বসল। তখনই একজন লোক ঘরে ঢুকল। গলায় ঝোলানো একটা মুক্তো বসানো সোনার হার। লোকটার মাথার চুল বড় বড়। পরনে সিল্কের পোশাক। বলল–নতুন কে এলেন–নাম বলুন। কথাটা বলে যুবকটি কোমরে গোঁজা ছোট নোটবই মত বের করল। টেবিলের কাছে গিয়ে বলল- নতুন কে বা কারা এসেছেন বলুন। ফ্রান্সিস ফরাস থেকে উঠে দাঁড়াল। বলল– আমরা নতুন এসেছি।
রোগীর নাম বলুন। যুবকটি বলল।
–ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস বলল।
–হুঁ। যুবকটি নাম লিখতে লিখতে মুখে শব্দ করল–হু।
–আপনার সমস্যা কি? যুবক বলল।
–কাঁধে ভীষণ ব্যথা। ওষুধ নিতে এসেছি। রোগীটি বলল।
–আগে কবিরাজমশাই আপনাকে পরীক্ষা করে দেখবেন তারপর ওষুধ দেবেন। যুবকটি বলল।
–কবিরাজ কখন দেখবেন? নোটবই লিখতে লিখতে বলল।
উনি আয়াচুচো গেছেন। তিনি এসে বলবেন।
কখন ফিরবেন? হ্যারি বলল।
তার কিছু ঠিক নেই। অপেক্ষা করুন। যুবকটি বলল।
–এতো মুস্কিলের কথা। শাঙ্কো বলল।
–উপায় নেই। অপেক্ষা করুন। যুবকটি ভেতরে ঢুকে গেল। দুপুর থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। খিদে জলতেষ্টা পাচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল–খিদেও পেয়েছে, জলতেষ্টাও পেয়েছে। এ দুটোর ব্যবস্থা করতে হয়।
ফ্রান্সিস ভেতরের দরজায় গিয়ে আঙ্গুল ঠুকলো৷ যুবকটি বেরিয়ে এল। বলল কী ব্যাপার?
–আমরা অনেকক্ষণ না খেয়ে আছি। কিছু খেতে চাই। ফ্রান্সিস বলল।
–এটা কি সরাইখানা? যান জল পাঠিয়ে দিচ্ছি।
একটু পরে বাড়ির কাজের লোক একটা জলভরা মাটির হাঁড়ি নিয়ে এল। হাতে কাঁচের গ্লাস। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–কে কে জল খাবেন খেয়ে যান।
হ্যারি, শাঙ্কো জল খেয়ে এল। যারা আগে এসেছিল তার মধ্যেও দুজন জল খেয়ে গেল। ফ্রান্সিস হাঁড়ি গ্লাস ফেরৎ দিল।
সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত। দুজন লোক রোগী নিয়ে চলে গেল। ফ্রান্সিসরা বসে রইল।
যুবকটি এল। কোনার টেবিল চেয়ারে বসল। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। একে একটু টোকা দিয়ে দেখা যাক। ফ্রান্সিস যুবকটির কাছে এল। যুবকটি বোধহয় ঝিমোচ্ছিল। ফ্রান্সিস সামনের টেবিলে আঙ্গুল ঠুকলো। যুবকটি ধড়ফড়িয়ে উঠল। বলল–আ আ–মানে আপনি কি চান?
–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কবিরাজমশাইর দেখা পেতে চাই।
–অসুখটা কি?
–আমাদের কারো কোন অসুখ নেই।
–বলেন কী? তাহলে এসেছেন কেন?
–কবিরাজমশাইর সঙ্গে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে।
–কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা?
–আছে–আছে।
তার মানে? একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–শুনুন–আমরা ভাইকিং। জাহাজ চালিয়ে দেশ বিদেশে যাই। গুপ্তধন উদ্ধার করি। বদলে একটা স্বর্ণমুদ্রাও নিই না।
–আশ্চর্য তো।
-হ্যাঁ। আমরা এমনিই। একটু থেমে বলল–মাজোর্কার রাজবাড়িতে আছে অতীতের রাজার গুপ্তধন। সেটাই আমরা নক্সা দেখে বুঝে নিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করেছি। কিন্তু ঐ গুপ্তধন আমাদের আগেই কেউ উদ্ধার করে পালিয়েছে।
–আপনারা বুঝতে পেরেছেন কে গুপ্তধন চুরি করেছে?
–হ্যাঁ। আমাদের স্থির বিশ্বাস গুপ্তধন চুরি করেছেন আপনাদের কবিরাজমশাই।
যুবকটি হকচকিয়ে গেল। বলে উঠল-আন্দাজে আমাদের কবিরাজ মশাইর ওপরে দোষ চাপাচ্ছেন।
–আরো আছে–ফ্রান্সিস বলল–আমাদের সঙ্গে আছেন আমাদের দেশের রাজকুমারী। আজ দুপুরের দিকে এক ঘোড়সওয়ার এসে রাজকুমারীকে হরণ করেছে।
ডাকাত টাকাত হবে।
না। একটা কুখ্যাত গুণ্ডা। যদি তার লুঠ করারই উদ্দেশ্য হত তাহলে সে ঘরে ঢুকে সোনার চাকতি দামি পাথর লুঠ করে নিত। কিন্তু সে তা করে নি। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে রাজকুমারীকে হরণ করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। এই ঘটনার সঙ্গে কবিরাজমশাইর যোগ আছে।
–কী আজেবাজে বলছেন। যুবকটি বলল।
–যা সত্য তাই বলছি।
–যত সব বাজে কথা। যুবকটি গলা চড়িয়ে বলল। শাঙ্কো যুবকটির গলার ওপর দিয়ে বলল–এই বিরাট বাড়িটা আমাদের খুঁজতে দেবেন?
-কী খুঁজবেন?
রাজকুমারীকে–আমাদের রাজকুমারীকে।
সব পাগলের দল।
–এদের পাল্লায় পড়ে আমি না পাগল হয়ে যাই।
–আমরা সেটাই চাই। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনাদের সাহস তো কম নয়। কবিরাজমশাইকে চোর বলছেন। কবিরাজমশাইর কোন ক্ষতি আপনারা করতে পারবেন না। যুবকটি বলল।
–রাজা পাচাকুচির দরবারে আমরা কবিরাজের মুখোশ খুলে দেব।
কবিরাজমশাইর কত সন্মান আপনারা জানেন না। কোনভাবেই তাকে অপদস্ত করতে পারবেন না। বাড়ি যান।
বাড়ি নয়। সরাইখানা।
তাহলে সেখানেই যান।
–আমরা কবিরাজমশাইর সঙ্গে দেখা না করে যাব না। ফ্রান্সিস বলল।
