–এসব কী বলছেন আপনি? কোথায় গুপ্তধন কোথায় থলিটলি এসব মানে। কি? কবিরাজ বললেন।
ফ্রান্সিস আগের মতই বলতে লাগল–পরে যেদিন রোগী দেখার কথা নয়– সেইদিন গেলেন। অতিথিঘরে রইলেন। ভোরের দিকে থলিটা নিয়ে প্রায় পালিয়ে, এলেন। কারো সঙ্গে দেখা না করেই চলে এসেছিলেন। একমাত্র মালী আপনাকে দেখেছিল।
কবিরাজ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন–এসব মিথ্যে অপবাদ।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। বলল–আমরা বিদেশী। এক জায়গায় তো বেশিদিন থাকি না। যদি থাকতাম তাহলে আপনাকে কয়েদখানায় ঢোকাতাম।
বেরিয়ে যাও–বেরিয়ে যাও! কবিরাজ বললেন। ফ্রান্সিস বলল—আমি মাজোর্কা যাচ্ছি। রাজা কুয়েক হুয়াকে সব বলবো। উনি যদি আপনার নামে রাজা পাচাকুচির রাজদরবারে নালিশ করেন–শেষ পর্যন্ত আপনাকে সব স্বীকার করতে হবে। রাজা কুয়েক হুয়ার মত একজন উদারমনা মানুষকে ঠকালেন–এটাই দুঃখের। কবিরাজ তখনও চ্যাঁচাচ্ছেন–বেরিয়ে যাও–বেরিয়ে যাও। নাম লেখার লোকটি ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিসের ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস লোকটার ঘাড়ে এক রদ্দা কষাল। লোকটি মেঝেয় বসে পড়ল।
ফ্রান্সিস বাইরে এল। হ্যারি ছুটে এল ফ্রান্সিস তোমাকে মারধোর করে নি তো?
–দুর। দুঃখ কী জানো–কবিরাজকে কান ঘেঁষে মাথায় এক রদ্দা কষালে ভালো হত। ফ্রান্সিস বলল।
–চল–চল। আর নয়। হ্যারি বলল।
তিনজনে কবিরাজের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
জাহাজে ওঠার সময় হয়ে আসছে। দুপুরে খাওয়ার সময় শাঙ্কো প্রস্তাব দিয়ে বলল–ফ্রান্সিস–আমাদের তো জাহাজে ফেরার সময় এসে গেছে। এখন আমাদের কিছু স্বর্ণমুদ্রা দাও। বাজারে গিয়ে দরকারী জিনিস টিনিস কিনে আনি।
ঠিক আছে। ফ্রান্সিস হেসে বলল। মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল–মারিয়া তুমিও যাবে। মারিয়া একটু চুপ করে থেকে বলল–আমারও কিছু কেনাকাটা ছিল! কিন্তু সকাল থেকে মাথার বাঁ পাশে ভীষণ ব্যথা শুরু হয়েছে। কখনও কমছে কখনও বাড়ছে। আমি যেতে পারবো না।
-ঠিক আছে। রাজকুমারী বিশ্রাম নিন। আমরা যাবো। তবে খুব বেশি ঘোরাঘুরি করবো না। তাড়াতাড়িই ফিরে আসবো। হ্যারি বলল। কেউ কিছু বলল না।
খাওয়া শেষ। ঘরে এসে সবাই পোশাক পাল্টাতে লাগল। মারিয়া ফ্রান্সিসকে বলল–তুমি কিছু কিনবে না। তুমি আর আমি কাল সকালে বেরিয়ে আমাদের দুজনের জিনিসপত্র কিনবো।
–কী কিনবে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–সেটা কাল সকালে ভাবা যাবে। মারিয়া বলল।
–তাহলে আজ আমি খাবো না। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া বলল–কেন। বন্ধুর সঙ্গে তুমিও যাও।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিসরা তৈরি হল। হ্যারি বলল-রাজকুমারীকে একা রেখে যাওয়া চলবে না। বিস্কো এখানে থাকবে। ও কালকে ফ্রান্সিসদের সঙ্গে যাবে।
ফ্রান্সিস সবাইকে দুটো করে স্বর্ণমুদ্রা দিল। সকলেই খুশি।
পড়ন্ত বিকেলে ফ্রান্সিসরা কেনাকাটা করতে বাজারের দিকে চলল।
সরাইখানার বাইরে দাঁড়িয়ে বিস্কো দেখল সেটা। মারিয়া ঘর থেকে বেরোয় নি।
বিস্কো নিজেদের ঘরের দিকে চলল। ওর একটু অভিমান হয়েছিল। ওকে ফ্রান্সিসরা নিয়ে গেল না।
বিস্কো বিছানায় শুয়ে পড়ল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
মারিয়া বিছানায় শুয়েছিল। মাথার যন্ত্রণাটা একটু কমেছে। একা একা শুয়ে আছে। ভালো লাগল না।
সরাইখানার বাইরে এসে দাঁড়াল। রাস্তার লোকজন গাড়িঘোড়া মানুষের ব্যস্ততা এসব দেখতে লাগল। আবার একঘেঁয়ে লাগছে। ঘর থেকে আসবে কিনা ভাবছে। তখনই এক ঘোড়াসওয়ার ঠিক ওর সামনে এসে ঘোড়াটাকে দাঁড় করালো। মারিয়া আরোহীর দিকে তাকাল। লোকটার লম্বা লম্বা চুল। কপালে একটা লাল ফেট্টি বাঁধা। গাল পর্যন্ত জুলপি। কুকুতে চোখ। দেখেই কেমন গুণ্ডা গুণ্ডা মনে হল।
লোকটা ঘোড়াটা মারিয়ার আরো কাছে আনল। মারিয়া কিছু বোঝবার আগেই নিচু হয়ে হাত বাড়িয়ে মারিয়ার কোমর ধরে এক হ্যাঁচকা টানে ঘোড়ার ওপর তুলে নিল। সামনে বসিয়ে ঘোড়া ছোটাল উত্তরমুখো। রাস্তার লোকজন যারা দেখল তারা হৈ হৈ করে উঠল। তারপর ঘটনাটা দেখেছে এমন লোকেদের দুজন ছুটল ঘোড়সওয়ারকে ধরতে। কিন্তু তেজি ঘোড়ার গতির সঙ্গে তারা পারবে কেন। হাল ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল। ততক্ষণে ঘোড়া সওয়ারসহ অনেক দূরে।
বিস্কোর ঘুম ভেঙে গেল। হঠাৎ বাইরের একটা হৈ হৈ চিৎকার শুনল। ও উঠল। কী ব্যাপার দেখতে হয়। ও আস্তে আস্তে বাইরে এল। তখন অনেক লোক জমে গেছে। একজনকে জিজ্ঞেস করল কী ব্যাপার? লোকটি বলল– একটা গুণ্ডা ঘোড়ায় চড়ে। এসে একটি মেয়েকে তুলে নিয়ে গেল। এরকম হতে পারে। বিস্কো কিছু মনে করল না। নিজের ঘরে চলে আসছে তখনই দেখল মারিয়ার ঘরের দরজা হাট করে খোলা। বিস্কো দ্রুত ঘরে ঢুকল। ঘর শূন্য। রাজকুমারী নেই।
বিস্কো এক ছুটে বাইরে এল। তখনও কয়েকজন মিলে–এমনি সব ঘটনা নিয়ে বলাবলি করছিল। বিস্কো গিয়ে জিজ্ঞেস করল আপনারা দেখেছেন?
–আমাদের চোখের সামনে সমস্ত ব্যাপারটা ঘটেছিল। একজন বলল।
–বিস্কো–মেয়েটি কি পোশাক পরেছিল?
বিদেশী পোশাক। একজন বলল।
–তাহলে মেয়েটি বিদেশী? বিস্কো বলল।
–হ্যাঁ হ্যাঁ। আর একজন ঘাড় কাত করে বলল।
বিস্কো অস্ফুটস্বরে বলে উঠল তাহলে রাজকুমারী।
বিস্কো নিজের ঘরে ফিরে এল। কথা ছিল আমি রাজকুমারীর পাহারায় থাকবো। সেই আমি গর্ধভের মত ঘুমিয়ে পড়লাম। আমি যদি রাজকুমারীকে বলে রাখতাম আমার ঘুম পাচ্ছে। আপনি আমাকে না বলে সরাইখানার বাইরে যাবেন না। তাহলে রাজকুমারী নিশ্চয়ই বাইরে যেতেন না। এই ঘটনাটাও ঘটত না।
