–আপনি খুঁজে পেয়েছেন? রাজা জানতে চাইলেন।
–না। এখনও পাই নি। তবে পাবো আশা করছি। আমি এই ঘরটা দেখেছি! অন্দরে আরো ঘর রয়েছে তো?
-হ্যাঁ। রাজা বললেন।
–ঐ দুটো ঘরে কে থাকেন?
–আমার স্ত্রী। ছেলেমেয়ে একটা ঘরে থাকেন। রাজা বললেন।
–আর একটা ঘরে? ফ্রান্সিস বলল।
–ওটা আমাদের অতিথিঘর বলতে পারেন। পরিচিত আত্মীয়স্বজন এলে থাকেন। রাজা বললেন।
–সব ঘরেই আছে? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। আমার ঠাকুর্দার শখ ছিল ফুলের। নানা রঙের ফুল তিনি পছন্দ করতেন। এই ফুলদানিগুলো তিনিই লোক রেখে করিয়েছিলেন। রাজা বললেন।
–প্রতিটি ফুলদানিতেই ফুল রাখা হয়? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। একজন মালী আছে। মালী প্রতিদিন ভোরে তাজা ফুল এনে রাখে ফুলদানীগুলোতে। রাজা বললেন।
–এবার একটা অনুরোধ। ভেতরের ঘরগুলো যদি দেখতে দেন। ফ্রান্সিস বলল।
–নিশ্চয়ই। মেয়েকে বললেন–অন্য ঘরদুটো ফ্রান্সিস সাহেবকে দেখিয়ে দে।
আন্না উঠে দাঁড়াল। রাজার বালিশের তলা থেকে একটা চাবি নিয়ে বলল– আসুন।
ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি তোমরা থাকো। আমি যাচ্ছি।
আন্নার সঙ্গে প্রথম ঘরটায় গেল ফ্রান্সিস। ঘরে ঢুকল। কঁচ-ঢাকা আলো ঘরটায়। সবই মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বড় বিছানা একটায়। অন্যটা ছোট বিছানা। বড়টায় বোধহয় ভাইবোনেরা থাকে। ছোটটায় রাণী।
ফ্রান্সিস ফুলদানিগুলো এক এক করে দেখতে লাগল। চারটে ফুলদানি। তাতে ফুল রাখা। ফ্রান্সিস দেখল প্রত্যেকটি ফুলদানিই বসানো আছে হাত তিনেক মোটা কাঠের ওপর। প্রত্যেকটি একইভাবে রাখা। কালো পাথরের সব ফুলদানি।
এবার ফ্রান্সিস বলল–আন্না তোমাদের অতিথিঘর কি খোলা?
-না। চাবি এনেছি। আন্না বলল।
অতিথি ঘরের সামনে এল ফ্রান্সিস। তালা ঝুলছে। আন্না তালা খুলল। বলল একটু দাঁড়ান আলো আনছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আন্না একটা হলুদরঙের মোটা মোমবাতি নিয়ে এল।
ফ্রান্সিস ঘুরে ঘুরে ঘরটা দেখতে লাগল। একই রকম ঘর। তবে একটু বেশি সাজানো গুছনো। খাটের ওপর ফুলপাতা আঁকা মোটা একটা চাদর। বালিশ।
এবার ফ্রান্সিস ফুলদানিগুলো দেখতে লাগল। সেই গোল কাঠের পাটা তিন হাত মত এবং তার ওপর ফুলদানি রাখা। হঠাৎ ফ্রান্সিসের চোখে পড়ল পূবদিকের ফুলদানিটা। ও ফুলদানিটার কাছে গেল। ভালো করে দেখল ফুলদানির দুটো পাতা ভাঙা। ফুলদানিগুলো ফুলের পাতার ফুলের মত তৈরি করা। ভাঙা জায়গায় দেখল সাদাটে। ফ্রান্সিস হাত দিয়ে দেখল কালো রঙ উঠে এল। দেখা গেল সাদাটে পাথর। এই একটাই সাদা পাথরের। কালো রং করে রাখা।
ফ্রান্সিস ভাঙা পাতা দুটো দেখতে লাগল। তারপর ফুলদানিটা তুলল। গোল কাঠের ছোট্ট স্তম্ভ। ভেতরে কুঁদে একটা গর্তমত রাখা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিস বলে উঠল–থলি রাখা ছিল চুরি হয়ে গেছে। আন্না বলল–কী বললেন যেন।
-না-না। ও কিছু না। চলো তোমার বাবার কাছে।
ফ্রান্সিস বলল–আন্না চল। দুজনে বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিস রাজার কাছে এল। বলল–মাননীয় রাজা-মণিমানিক্য অলঙ্কার রাখা ছিল যে থলিটায় সেটা চুরি হয়ে গেছে।
-বলেন কী? রাজা উঠতে গেলেন। রাণী শুইয়ে দিলেন। বললেন–একেবারে উত্তেজিত হবেন না।
এখন প্রশ্ন কে চুরি করল? ফ্রান্সিস বলল।
–আপনি কি নিশ্চিত গুপ্তভাবে রাখা মূল্যবান সবই চুরি হয়ে গেছে? রাজা বললেন।
–হ্যাঁ। এবার আপনাকে কিছু পুরোনো ঘটনা মনে করতে হবে। যেমন- ঐ অতিথি ঘরে আপনার অনাত্মীয় মানে যারা আপনার আত্মীয় নন তেমন কাউকে থাকতে দিয়েছিলেন?
সবাই তো রাতে থাকতো না। তবে অনাত্মীয় বলতে যাদের বোঝায় তাদের দুজনের কথা মনে পড়ছে–এক–বাবার এক প্রিয় বন্ধু। বড় বক বক করতেন। দুদিন ছিলেন। অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম। আর একজন আমার বৈদ্য– কবিরাজ। বেশিদিনের কথা নয়। মাস দুতিন আগে আমাকে সেদিন দেখতে এসেছিলেন। আমাকে দেখে যেতে তাঁর দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাইরে ঝড় বৃষ্টি চলছিল। রাতের খাওয়া খেলেন। অতিথিঘরে রইলেন। পরদিন সকালে চলে গেলেন।
–আর? ফ্রান্সিস আরও জানতে চাইল।
–দাঁড়ান, দাঁড়ান মনে পড়েছে। দিন কয়েক পরে ঐ কবিরাজ আবার এলেন। সেদিন তার আসার কথা নয়। উনি আমাকে দেখলেন। ওষুধও পাল্টালেন না। রাত হয়ে গিয়েছিল। তিনি ঐ অতিথি আবাসে থাকলেন। কিন্তু ভোরবেলা কখন চলে গেছেন কেউ জানে না। শুধু মালী নাকি দেখেছিল।
–এঁরা ছাড়া আর কেউ? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–মনে পড়ছে না। রাজা বললেন।
–ইদানীং মানে মাস কয়েকের মধ্যে? ফ্রান্সিস বলল।
–না। আর কেউ অতিথিঘরে থাকেন নি।
এবার ফ্রান্সিস বলল–ঐ বকরবকর ভদ্রলোক–আপনার বাবার বন্ধু–আর কবিরাজের ঠিকানা চাই। দিতে পারবেন?
রাজা রাণীকে বললেন–বালিশের তলা থেকে মোটা বইটা বের কর তো?
রাণী বালিশের তলা থেকে মোটা বইটা বের করে রাজাকে দিলেন। রাজা নোট বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বললেন–বাবার বন্ধুর নিজের হাতে তার ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন। তিনি–রাজা থেমে গেলেন। বললেন– পেয়েছি। ফ্রান্সিস আন্নাকে বললেন–এক টুকরো কাগজ আর কালি কলম নিয়ে এস। আমাকে ঠিকানা দুটো লিখে দাও। আন্না ভেতরের ঘরে চলে গেল।
–পেয়েছি, পেয়েছি। কবিরাজের ঠিকানাও পেয়েছি। রাজা বললেন।
আন্না কাগজ কলম নিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল–ঠিকানা দুটো আমাকে লিখে দাও। আন্না ঠিকানা লিখে দিল।
