প্রহরীটি ছুটে বেচুয়ার কাছে গেল। এক হ্যাঁচকা টানে বর্শাটা বের করল। রক্ত বেরোতে লাগল। ফ্রান্সিস দেখল বেচুয়ার ডান হাতে তরোয়ালটা ধরা। ফ্রান্সিস নিচু হয়ে তরোয়ালটা তুলে নিল।
তখনই বন থেকে চার পাঁচজন যোদ্ধা বেরিয়ে এল। ওদের গায়ের রং কালো। ফ্রান্সিস বুঝল এরাই কালো পাহাড়ি। বুনোদের নতুন রাজাকে ধরতে এসেছে।
ওরা ফ্রান্সিসের গায়ে রাজার পোশাক দেখেই চিনল। উল্লাসে ওরা চিৎকার করে উঠল। ছুটে এল ফ্রান্সিসের সামনে। প্রথম যোদ্ধাটি ফ্রান্সিসের দিকে বর্শা ছুঁড়ল। ফ্রান্সিস দ্রুত সরে গেল। যোদ্ধাটির হাতে বর্শা নেই। ফ্রান্সিস লাফিয়ে সামনে গিয়ে যোদ্ধাটির বুকে তরোয়াল ঢুকিয়ে দিল। যোদ্ধাটি চিৎ হয়ে পাথুরে মাটিতে পড়ে গেল। আর একজন বর্শা হাতে এগিয়ে এল। প্রহরীটি ফ্রান্সিসকে বলল–আপনি যাবেন না–আমি যাচ্ছি। প্রহরীটি একজন যোদ্ধাকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুঁড়ল। নিখুঁত নিশানা। বর্শাটা বুকে ঢুকে গেল। যোদ্ধাটি মাটিতে পড়ে গেল।
এবার ফ্রান্সিস তরোয়াল হাতে যোদ্ধাদের দিকে ছুটে এল। যোদ্ধারা পালাতে শুরু করল। সব যোদ্ধারা যখন বনে ঢুকে পড়ল তখন ফ্রান্সিস ফিরে এল। বেচুয়ার কাছে এসে প্রহরীটিকে বলল চলল। ওকে গুহায় নিয়ে যাবো। বিস্কো সব সময় ফ্রান্সিসের কাছাকাছি আছে।
দুজনে বেচুয়াকে ধরাধরি করে গুহার ভেতরে নিয়ে এল। পাথরের ওপর বিছানায় শুইয়ে দিল। প্রহরীটি রাখা জল নিয়ে এল। ফ্রান্সিস বেচুয়ার চোখেমুখে জল দিল। প্রহরীটি চকমকি পাথর ঠুকে মশাল জ্বালল। চারদিকে আলো ছড়ালো।
ফ্রান্সিস এতক্ষণে বুঝল–বেশ খিদে পেয়েছে। কিন্তু খাবার এখন কোথায় পাওয়া যাবে? বিস্কো এল। বলল-ফ্রান্সিস–একটু যে ঘুমিয়ে নেব তারও উপায় নেই। খালি পেটে ঘুমও আসছে না।
–উপায় নেই। এখন বাইরে লড়াই চলছে। বাইরে বেরোনো যাবে না। অপেক্ষা করতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই লড়াই থেমে যাবে। তখন খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে ফ্রান্সিস বলল।
রাত শেষ। পাখির ডাক শোনা গেল। ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। হঠাৎ বেচুয়ার গোঙানি শোনা গেল। ফ্রান্সিস উঠে গিয়ে বেচুয়ার পাশে বসল। বলল–বেচুয়া শরীর খারাপ লাগছে?
-হ্যাঁ। শরীর অসম্ভব দুর্বল লাগছে। মাথা ঘুরে ঘুরে উঠছে। কথাটা আস্তে আস্তে বলে বেচুয়া বলল–আমি–বোধহয় বাঁচবো না।
–এইসব আজেবাজে চিন্তাকে প্রশ্রয় দিও না। নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ ভাববে। ফ্রান্সিস বলল। তারপর হাত বাড়িয়ে বলল–দেখি তো জ্বরটা কেমন? ফ্রান্সিস বেচুয়ার হাতে নাড়ি টিপে দেখল। গাল গলায় উত্তাপ দেখল। বেশ জ্বর এখন।
ফ্রান্সিস বলল–জ্বর আছে এখনও। তবে একটু ওষুধ টষুধ পড়লে তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। ততক্ষণে একটু জ্বর বাড়ল।
ফ্রান্সিস বলল–একটু কষ্ট সহ্য কর। বেচুয়া আর কথা বলল না। দু চোখ বুজে শুয়ে রইল।
এইবার খাদ্য চাই। ফ্রান্সিস কীভাবে খাদ্য জোগাড় করবে ভেবে পেল না। প্রহরী ফ্রান্সিসকে বলল সেকথা। প্রহরীটি বলল–একটু দূরে এক জমিদার থাকে। তার বাড়ি থেকে খাবার চুরি করতে হবে।
তার মানে আমাদের সারাদিনই না খেয়ে থাকতে হবে। একটাই বাঁচোয়া জলভরা পীপে আছে দুটো। সারাদিনই জল খেতে হবে। তাতে খিদেটা বেশ চাপা পড়ে যাবে। বিস্কো বলল।
দুপুরে প্রহরীটি বনজঙ্গল থেকে কিছু ফল নিয়ে এল। তাই ভাগ করে সবাই খেল।
সারা দিনটা গেল। সন্ধ্যে থেকেই বেচুয়ার গোঙানিটা শুরু হল। বোঝাই যাচ্ছে বেচুয়া ভীষণ কষ্ট সহ্য করছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে। ফ্রান্সিস ভাবল যে বর্শায় বেচুয়া আহত হয়েছিল সেটার মাথায় বিষ মাখানো ছিল।
রাত বাড়তে লাগল। বেচুয়ার গোঙানি থেমে গেছে। বোধহয় আর গোঙানি করবার শক্তিও অবশিষ্ট নেই।
সকাল থেকে এই রাত পর্যন্ত ফ্রান্সিসরা শুধু জল খেয়ে। খাবার জোগাড় করতে বিস্কো আর প্রহরীটি একটু রাতে বেরুলো। নিচু দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকল। জ্যোৎস্না খুব উজ্জ্বল নয়। দেখেশুনে পা ফেলতে হচ্ছিল।
রসুই ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করা। অল্প আলোয় দেখল একটা তালা লাগানো। বিস্কোরা দেখল লোহার বড় তালা। বিস্কো বার কয়েক চেষ্টা করল খুলতে। কিন্তু পারল না।
বিস্কো বের করল ছোরার মুখটা তারপর তালার গর্তে ঢুকিয়ে আস্তে আস্তে চাপ দিতে লাগল। তারপর চাপ বাড়াল। শব্দ করে তালাটা ভেঙে গেল। একটু শব্দ হল।
ফ্রান্সিসরা চুপ করে দাঁড়িল রইল না। কারো ঘুম ভাঙে নি। ফ্রান্সিসরা রসুইঘরে ঢুকল। কাঠের ডেকচিতে রাখা ছিল মাংস। ফ্রান্সিস ডেকচিটা তুলে নিল। কেক রুটি সবই নিল দুজন।
দরজা ভেজিয়ে পাঁচিল টপকে বাইরে বেরিয়ে এল।
গুহায় ফিরে এল। বেচুয়া বাদে সবাই খাবার ভাগ করে নিয়ে খেতে লাগল। প্রায় দুদিন উপবাস। ফ্রান্সিস খাবারের দিকে চেয়ে রইল। খিদেটাই মারা গেছে। উপায় নেই। খাবার যেমনই লাগুক সব খাবার খেতে হবে। ফ্রান্সিস খেতে লাগল।
শেষ রাতের দিকে বেচুয়া সমস্ত শরীর মোচড়াতে লাগল। মুখে গোঁ গোঁ শব্দ করছে। সবাই বেচুয়ার চারপাশে ভিড় করে দাঁড়াল।
হঠাৎ বেচুয়ার শরীর স্থির হয়ে গেল। বেচুয়া মারা গেল। ফ্রান্সিসের চোখে জল এল। ও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
এবার বেচুয়াকে কবর দেওয়া যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। সূর্য ওঠার আগেই কবর দিতে হবে। লড়াইয়ের ফলাফল কী তা ওরা এখনও জানে না। রাজা পাচাকুচি যদি জয়ী হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকা ছেড়ে পালাতে হবে। যদি রাজা কুয়েক হুয়ার জয় হয় তাহলে নিশ্চিন্ত। কবরে দিয়ে সবাই মাজোর্কার উদ্দেশ্যে রওনা হবে।
