–ঠিক আছে। কিন্তু আমি এত পাহারা টাহারা পছন্দ করি না। সবসময় মনে হয় আমি যেন বন্দী হয়ে আছি। ফ্রান্সিস বলল।
–আমাদের যেমন হুকুম। আপনি মন্ত্রীমশাইকে বলে দেখুন। বেচুয়া বলল।
–তুমি বললে কালো পাহাড়ী। ওরা কারা? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–ঐ কালো পাহাড়ীদের গায়ের রং কালো। উত্তরে যে পাহাড়টা মাচিপিচুলাম ওখানেই ওদের রাজত্ব। ওদের গায়ের রং কালো। তাই আমরা কালোপাহাড়ী বলি। বেচুয়া বলল।
–ওরা বুঝি মাঝে মাঝেই আক্রমণ করে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। উদ্দেশ্য তো বললাম–আমাদের রাজাকে মেরে ফেলা। বেচুয়া বলল।
–তাতে ওদের কি লাভ? ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা তাহলে আমাদের মধ্যে মারামারি করব। এই দেশে অশান্তির আগুন জ্বলবে। আমরা দুর্বল হয়ে পড়বো।
তখন ওরা সহজেই এই রাজ্যজয় করতে পারবে। এই দেখুন না–আমাদের আগের রাজা কী বলশালী। তাকেও ওরা বন্দী করেছিল। ঘোড়ায় চাপিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আমরাও ওদের চেয়ে দ্রুতবেগে ছুটে গিয়ে রাজাকে উদ্ধার করেছিলাম। রাজা সুস্থ হলেন কিন্তু বাঁহাতটা শুকিয়ে গেল। ওরা রাজার বামবাহুতে বড় ছোরা বসিয়েছিল। আস্তে আস্তে ঐ জায়গাটা দুর্বল হয়ে পড়ল। সেই রাজার বাঁ হাত অকেজো হয়ে গেল। কে জানে ছোরার মুখে বিষাক্ত কিছু মেশানো হয়েছিল কিনা? বেচুয়া বলল।
পরের দিন রাতে ফ্রান্সিস খেয়ে শুয়ে পড়ল। মাংসটা কোন পাখির অথবা জীবজন্তুর এটা বুঝতে পারল না। কিন্তু খুব সুস্বাদু লাগল। ফ্রান্সিস চেয়ে খেলো।
শুয়ে শুয়ে একটা চিন্তাই ওকে বড় বিচলিত করছিল। জাহাজে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। উপায়ও নেই। সবসময়ই কাছে কাছে কোন না কোন প্রহরী।
ফ্রান্সিস এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল। হঠাৎ গভীর রাতে বুনোদের চিৎকার হৈ হল্লা। ফ্রান্সিস শুয়ে থেকে বুঝতে পারল–লড়াই শুরু হয়েছে। বুনোদের পায়ের শব্দ শুনে বুঝল-বুনোরা ছুটে যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস দেখল–ঘরের দরজায় দুজন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে অস্পষ্ট জ্যোত্সা। ঘরের মশাল নেভানো হয়েছে। মন্ত্রীমশাই ছুটতে ছুটতে অন্ধকার ঘরে ঢুকলেন। অন্ধকারেই বললেন–মান্যবর রাজা–আপনাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে।
-কোথায়? ফ্রান্সিস বলল।
–রক্ষী আপনাকে নিয়ে যাবে। আপনি কালকে পর্যন্ত ওখানেই থাকবেন। লড়াই থেমে গেলে আপনাকে আবার এই ঘরে নিয়ে আসা হবে। মন্ত্রী ছুটে বেরিয়ে গেলেন।
রক্ষী দুজন ঘরে ঢুকল। বেচুয়া বলল–মাননীয় রাজা–শিগগির তৈরি হন। আমাদের অন্য জায়গায় যেতে হবে।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–মশালটা জ্বালো। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। বেচুয়া মশালটা জ্বালল। ফ্রান্সিস আজ পোশাক পাল্টাল না। রাজার পোশাক যা পরনে ছিল তাই পরে নিয়েই দরজার দিকে চলল। ফ্রান্সিসের পিছু পিছু ঘর থেকে বেরিয়ে এল দুজন প্রহরীও। এবার বেচুয়া বলল–মাননীয় রাজা আপনি আমার পেছনে পেছনে আসুন। ফ্রান্সিস তাই চলল। কিছু দূরেই হৈ হৈ চিৎকার গোঙানি। জোর লড়াই চলছে।
বনের তলায় অন্ধকার। তবে গাছের পাতা ডালের ফাঁক দিয়ে অস্পষ্ট জ্যোৎস্নাভাঙা টুকরোর মত পড়েছে। তাতে অন্ধকার কাটে নি। অবশ্য মোটামুটি একটু আধটু দেখেটেখে পা ফেলে যাই।
ফ্রান্সিসের হঠাৎ মনে হল–এখন বাইরের পরিবেশ। যে কোন মুহূর্তে আক্রান্ত হতে পারে। তরোয়ালটা সঙ্গে থাকলে মনে অনেক জোর পাওয়া যায়। ফ্রান্সিস ডাকল–বেচুয়া!
–বলুন।
–আমার তরোয়ালটা কোথায় রাখা হয়েছে? ফ্রান্সিস বলল।
–আপনার ঘরে। বেচুয়া বলল।
–তাহলে তরোয়ালটা নিয়ে এসো। এখন একেবারে নিরস্ত্র থাকা বিপজ্জনক। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। বেচুয়া চলে যাচ্ছে তখন প্রহরীটি বলল–কোথাও দাঁড়িয়ে পড়া ঠিক নয়। আমরা যে গুহায় যাবো বেচুয়া তুমিও সেখানে চলে এস।
-ঠিক আছে। বেচুয়া চলে গেল। অন্ধকারে মিলিয়ে গেল যেন।
ফ্রান্সিসরা চলল। প্রহরীটি পিছু পিছু চলল।
একটা টিলার সামনে এল ওরা। একজন প্রহরী এগিয়ে গেল। অল্প জ্যোৎস্নায় দেখা গেল একটা গুহার মুখ। মুখে বড় পাথর চাপা দেওয়া। প্রহরীটি বলল–এই পাথরটা সরাতে হবে। একা পারবো না। আপনি আসুন। একজন প্রহরী বলল।
এবার দুজনে গুহামুখের পাথরটা ধাক্কা দিতে লাগল। পাথরটা নড়ল। আরো বার কয়েক ধাক্কা দিতেই পাথরটা একপাশে সরে গেল। ঢোকার মত জায়গা হল। দুজনে গুহাটায় ঢুকল।
নীর অন্ধকারে কিছুই দেখা গেল না। প্রহরীটি বলল–আপনি আমার হাত ধরে আসুন। দুজন অন্ধকারে চলল। কিছুটা এসে প্রহরীটি বলল–এখানে বসুন। ফ্রান্সিস হাত দিয়ে দেখল একটা পাথরের পাটামত। ফ্রান্সিস বসল। প্রহরীটি বসল।
বেশ গরম লাগছে। আস্তে আস্তে গরমটা সহনীয় হল। এখন বেচুয়ার জন্যে অপেক্ষা।
দুজনেই চুপ করে বসে রইল। চোখে অন্ধকারটা সয়ে এল। ফ্রান্সিস অস্পষ্ট দেখল পাথরের লম্বা পাটাটায় বিছানা মত কাপড় পাতা। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। এখন চিন্তা হল বেচুয়ার জন্যে ও নির্বিঘ্নে আসতে পারবে কিনা।
কিছুক্ষণ পরে দূর থেকে বেচুয়ার ডাকই মনে হল। প্রহরীটি গুহার মুখের দিকে দ্রুত ছুটে গেল। ফ্রান্সিসও পেছনে পেছনে ছুটল। গুহার মুখে পাথরের আড়াল থেকে দুজনে অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় দেখল-বেচুয়া টলতে টলতে আসছে। ওর হাতে বর্শাটা নেই। হাতে একটা তরোয়াল। তখনই ফ্রান্সিসরা ভালো করে দেখল বেচুয়ার পিঠে একটা বর্শা বেঁধা। বেচুয়া আর বেশি দূর আসতে পারল না। উবু হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
