রাত বাড়ল। দরজা খোলা হল। তিনচারজন বুনো মানুষ ঘরে ঢুকল। মেঝের একপাশে আসন পাতল। কোন গাছের পাতা বড় গোল পাতা পাতল। জলভরা কাঠের গ্লাশ রাখল। তেলের আলোটা বসবার জায়গার কাছে রাখল। একজন বুনো সৈন্য। ফ্রান্সিসকে খাবারের জায়গায় এসে বসতে ইঙ্গিত করল।
ফ্রান্সিস উঠল। খেতে বসল। গোল রুটি, পাখির মাংস, তারপর ঝোলের মত কিছু। ফ্রান্সিস খেতে লাগল। মাংসটাই সবচেয়ে ভালো লাগছিল। ওটাই দুবার চেয়ে খেল।
খাওয়া শেষ। ফ্রান্সিস বিছানায় ফিরে এল। অনেক চিন্তা মাথায়। সেসব ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।
ভোরে ঘুম ভাঙ্গল পাখির ডাকে। এখানে এত পাখি? ফ্রান্সিস হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় এসে বসল। দুজন রক্ষী খাবার নিয়ে এল। কাঠের থালায় পোড়া রুটি কয়েকটা। একটা বাঁশের ছোট চোঙে কী এক তরল জিনিস।
খিদেও পেয়েছে বেশ। ফ্রান্সিস বেশ দ্রুতই খেতে লাগল। খাওয়া শেষ।
রক্ষীরা চলে গেল। দুপুরে মাংসের সঙ্গে রুটি। আরো কিছু লতাপাতা দিয়ে রান্না করা খাবার। সেসবও খেল।
সন্ধেয় ফ্রান্সিসকে এনে উঠোনের একপাশে বসান হল। সিংহাসন ফাঁকা। বুনোরা ঢোলের মত একটা বাদ্যযন্ত্র এনে বাজাতে শুরু করল। উঠোনে স্ত্রীপুরুষ নাচতে নাচতে এল। সেইসঙ্গে তীক্ষ্ণস্বরে গান।
নাচগান চলছে তখন আগের রাজা এল। একপাশে বসল। নাচগান কিছুক্ষণ চলল। তারপর নাচিয়েরা চলে গেল।
এবার আগের রাজা উঠে দাঁড়াল। গলায় বেশ জোর দিয়ে বলতে লাগল আমাদের রাজপুরোহিত স্বপ্নের মধ্যে দেখেছে এক যুবক দক্ষিণ দিক থেকে এসেছে। সেই যুবকের রাজা হবার সমস্ত লক্ষণই পুরোহিত দেখেছে। সেই যুবকই হবে আমাদের রাজা। সব লক্ষণ মিলে গেছে।
এই পর্যন্ত বলে রাজা ফ্রান্সিসের দিকে হাত বাড়াল।
ফ্রান্সিস আগের রাজার হাত ধরল। আগের রাজা বলল–উঠে আসুন। ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। পুরোহিতের নির্দেশমত আমরা এই যুবককেই রাজা বলে মেনে নিলাম। বুনোরা হৈ হৈ করে উঠল। হাতের বর্শা ওঠানামা করতে লাগল। আগের রাজা বলতে লাগল–প্রজা সাধারণ–এই নতুন রাজাকে তোমরা মেনে নেবে। এই বলে আগের রাজা ফ্রান্সিসকে আস্তে ধরে নিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে দিল। আবার ধ্বনি উঠল–নতুন রাজা–বেঁচে থাকুন। বেশ হৈ চৈ চলল। আগের রাজা দুহাত ওপরে ওঠালো। গণ্ডগোল থেমে গেল।
পুরোহিত এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসের সামনে এসে কীসব বিড়বিড় করে বলতে লাগল। তারপর ফ্রান্সিসের মাথায় ফুল রাখল। হাত সরিয়ে নিতে ফুলগুলো পড়ে গেল। আরো কিছুক্ষণ পরে পুরোহিত মন্ত্র পড়তে পড়তে কী যেন বলল। ফ্রান্সিসের অস্বস্তি লাগছিল। চুপ করে বসে থাকতেও পারছে না আবার কিছু বলতেও পারছে না। সিংহাসন থেকে উঠে যেতেও পারছে না।
ফ্রান্সিসের কাছে এসে পুরোহিত গলা নামিয়ে বলতে লাগল, আগের রাজা কিছুতেই ক্ষমতা ছাড়ছিলেন না। মন্ত্রী অমাত্যরা আমাকে দায়িত্ব দিলেন নতুন রাজা খুঁজে বের করুন। আমি আমাদের দেবতা আরুজুবার কাছে জানতে চেয়েছিলাম নতুন রাজাকে কীভাবে পাব। আমাদের দেবতা আরুজুবা বললেন- তোর কাছে পুজোর জন্যে যে পবিত্র জল আছে তাতে নতুন রাজার ছবি ফুটে উঠবে। আমি পবিত্র জলে আপনার ছবি দেখলাম। সৈন্যদের হুকুম দিলাম আপনাকে ধরে আনতে।
–কিন্তু আমি রাজা হব না। ফ্রান্সিস বলল।
–পারবেন না পালিয়ে যেতে। রাজা হয়েই আপনাকে এখানে থাকতে হবে। পুরোহিত বলল।
–দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
পুরোহিত চলে গেল। সমবেত জনতার মধ্যে মাঝে মাঝেই ধ্বনি উঠল– নতুন রাজা–দীর্ঘজীবী হোন। ভিড় কমতে লাগল। সেনাপতি এসে বলল– মাননীয় রাজা–চলুন বিশ্রাম করবেন।
ফ্রান্সিস সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়াল। মন্ত্রী ও সেনাপতিও উঠল। ফ্রান্সিস চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। উপায় ভাবতে লাগল কেমন করে পালানো যায়। বুনোরা নতুন রাজার জয়ধ্বনি করল। একজন যোদ্ধা সামনে আর একজন পেছনে। প্রহরী দু’জন ফ্রান্সিসকে রাজগৃহে নিয়ে এল।
ফ্রান্সিসের জন্যে কিছু পরে প্রহরী দুজন খাবার নিয়ে এল। বেশ খিদে পেয়েছে। অন্যসময় হলে ও হাপুসহুপুস খেতো। কিন্তু এখন রাজা। এখন রাজার মতো আচরণ করতে হবে। এখন সবাই তার আচরণ ব্যবহার এসব দেখবে। কাজেই এখন যা খুশি তা করা চলবে না।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে খেতে লাগল। একজন প্রহরীকে হাতের ইশারায় ডাকল। প্রহরীটি এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল–
–তোমার নাম কি? প্রহরীটি খুব খুশি। রাজাকে সম্মান দিয়ে একটু মাথা নিচু করল। তারপর বলল-বেচুয়া।
–হুঁ। তুমি কি সারারাত আমাকে পাহারা দাও? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। আমি একা নই। সঙ্গে আর একজন থাকে। বেচুয়া বলল।
–এত পাহারার কি দরকার? ফ্রান্সিস বলল।
মাননীয় রাজা–আপনার জানার কথা নয়। উত্তরে পাহাড়ী এলাকায় একটা দেশ আছে। ওখানে কালো পাহাড়ীদের দেশ। ওরা মাঝে মাঝেই আমাদের আক্রমণ করে। আমাদের সঙ্গে পেরে ওঠে না। পালিয়ে যায়। কিন্তু এরকম আক্রমণ বন্ধ রাখে না। ওদের লক্ষ্য শুধু আমাদের রাজাকে হত্যা করা। তাই আপনাকে সবসময় পাহারাদাররা পাহারা দিয়ে রাখে। বেচুয়া বলল।
–হু। দেখছি। এত পাহারা দিয়ে আমাকে আটকেই রাখা হয়। এই পাহারার ব্যবস্থা করেছেন কারা? ফ্রান্সিস বলল।
–মন্ত্রীমশাই, সেনাপতি আর অমাত্যরা। বেচুয়া বলল।
