প্রাচীন স্পেনীয় ভাষায় লেখা–হোক না কালো পাথর
ফুলদানি বড় সুন্দর।
সবচেয়ে ভালো সাদা ফ্রান্সিস একটুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবল। মাথা তুলে বলল–এখানে তো তিনটে ঘর। তিনটে ঘরেই কি রাখা আছে? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। রাজা বললেন।
–ফ্রান্সিস বলল–তাহলে তিনটে ঘরে সব মিলিয়ে বারোটা ফুলদানি আছে।
একটা কথা–একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–কাপাক ছাড়া আর কাউকে আপনার নকশা দেখতে দিয়েছিলেন?
–একজন কবিরাজকে। তিনি আমার চিকিৎসা করতেন। রাজা বললেন।
করতেন বলছেন। এখন কি আপনাকে চিকিৎসা করেন না? ফ্রান্সিস বলল। তারপর বলল
–নকশাটা কি উনি ফেরৎ দিয়েছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
–না। রাজা মাথা নেড়ে বললেন।
–এখন যে নকশাটা আছে? ফ্রান্সিস বলল।
–নকল করে রেখেছি। রাজা বললেন।
–কবিরাজ মশাই নকশা নিয়ে বেপাত্তা হয়ে গেলেন।
–আপনি তার খোঁজখবর করেছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। কিন্তু তার কোনরকম হদিশই পাই নি। রাজা বললেন।
–উনি কোথায় থাকতেন? ফ্রান্সিস বলল।
কুজকো। ঘোড়ায় চড়ে আসতেন। রাজা বললেন।
বয়েস কম? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–না। মধ্যবয়স্ক। আপনি এত কথা জানতে চাইছেন কেন? রাজা বললেন।
–এসবের সঙ্গে আপনার পিতামহের রাখা গুপ্তধনের হদিশ বের করব। ফ্রান্সিস বলল।
–পারবেন? রাজা বললেন।
–সেই জন্যেই তো আপনার কাছ থেকে সব জানতে চাইছি। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখুন চেষ্টা করে। রাজা বললেন।
তখনই একজন পাচাকুচির সৈন্য ঘরে ঢুকল। বলল–মাননীয় রাজা সেনাপতি এসেছেন। রাজা বললেন নিয়ে এসো।
রাজা ভালোভাবে উঠে বসলেন। রাণী রাজার কাঁধ ধরে রইলেন। সেনাপতি ঢুকল। সেই দাম্ভিক ভঙ্গী। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে দরজার দিকে যাচ্ছিল। সেনাপতির নজরে পড়ল। বলল–
–তুমি এদেশীয় পোশাক পরেছো। কিছু চুরির ধান্ধা। সেনাপতি বলল।
–আমরা চোর নই। ফ্রান্সিস বলল।
–না। মহাপুরুষ। সঙ্গের দুজন সৈন্যকে বলল–এই ধর তো বিদেশী ভূতটাকে। সেনাপতি বলল।
সৈন্য দুজন ফ্রান্সিসের দিকে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে প্রথম সৈন্যটির চোয়াল লক্ষ্য করে ঘুষি মারল। সৈন্যটি উল্টেগিয়ে মেঝেয় পড়ল। অন্যটিকে পায়ে পা ঠেকিয়ে জোরে পা ঘোরাল। সৈন্যটিও মেঝের ওপর চিৎ হয়ে পড়ল।
ফ্রান্সিস দ্রুত বাইরের ঘরে এল। তারপর মন্ত্রণাকক্ষটি পার হয়ে সদর দেউড়িতে এল। সঙ্গে দেউড়ির আলোর বাইরে ছুটে এল। প্রহরী দু’জন চিৎকার করে উঠল। ততক্ষণে ফ্রান্সিস অন্ধকারে মিশে গেছে।
ফ্রান্সিস রাজবাড়ির তিনটে ঘর ভালো করে দেখতে চেয়েছিল। সেটা আর হলো না।
ফ্রান্সিস নদীর ধারে এল। জোর হাওয়া ছুটেছে। ফ্রান্সিসের ঘামে ভেজা গা জুড়োল।
হঠাৎ একটা খেজুর গাছের পেছন থেকে চারপাঁচজন বুনো মানুষ ছুটে এসে ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস এই আক্রমণের জন্যে তৈরি ছিল না। নিজেকে সামলাতে পারল না। মাটিতে পড়ে গেল। বুনোরা সবাই মিলে ফ্রান্সিসকে শক্ত হাতে চেপে রইল। নদীর ঢালে নিয়ে এল। ফ্রান্সিসকে ঢাল দিয়ে নামিয়ে নৌকোয় বসিয়ে দিল। বৈঠা দিয়ে একজন নৌকো চালাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপারে পৌঁছল। ফ্রান্সিস বার তিনেক জিজ্ঞেস করল–আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? কেউ কোন কথা বলল না।
নৌকো থেকে নেমে বুনোরা ফ্রান্সিসকে নিয়ে চলল। এতক্ষণ তবুনিস্তেজ জ্যোৎস্নায় কিছু কিছু দেখা যাচ্ছিল। এখন বনের মধ্যে ঢুকে চারদিক অন্ধকার।
কিছুক্ষণ পরে বুনোরা ফ্রান্সিসকে ওদের বসতি এলাকায় নিয়ে এল। একটা বেশ বড় উঠোনের মত। চারপাশে বাড়ি ঘর। কেউ কেউ ঘর থেকে মুখ বের করে ফ্রান্সিসকে দেখল।
ফ্রান্সিস দীর্ঘশ্বাস ফেলল–আবার কয়েদঘর। আবার বন্দীদশা।
কিন্তু আশ্চর্য। ফ্রান্সিসকে ওরা একটা গাছের ডালে তৈরি ঘরে নিয়ে এল। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘর। ঘরে একটা তেলের আলো জ্বলছিল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একজন প্রহরী। হাতে বর্শা।
কিছুক্ষণ পরে দ্বাররক্ষী গলা চড়িয়ে বলল–রাজা আসছেন। তাকে সম্মান জানাও।
রাজা ঢুকল। বেশ দশাসই চেহারা। মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকতে হল। মাথায় লাল মোটা কাপড়ের ফেট্টি। তাতে বিচিত্র রঙের পাখির পালক গোঁজা। গলায় লালরঙের পাথরের মালা। মাথায় বড় বড় চুল। বেণীর মত বাঁধা।
দ্বাররক্ষী মাথা একটু নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানাল। রাজা বলল–আমাদের পুরোহিত আমাদের জানিয়েছে যে বর্তমান রাজা অর্থাৎ আমি আর রাজা থাকতে পারব না। নতুন রাজা আসবে দক্ষিণ দিক থেকে। তার গায়ের রঙ হবে সাদা। লম্বা লম্বা চুল। পরনে থাকবে বিদেশী পোশাক। তরোয়াল চালাতে অত্যন্ত দক্ষ। রাজা থামলেন।
–কিন্তু আমি রাজা হব কী করে? ফ্রান্সিস বলল।
–আমরাই আপনাকে রাজা করব। রাজা বলল।
–কিন্তু আমি তো রাজা হতে চাই না। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে আপনাকে বন্দী করা হবে। থাকতে দেওয়া হবে কয়েদখানায়। ফ্রাসিস কিছু বলল না। চুপ করে রইল। বুঝল এই বুনোদের হাত থেকে মুক্তি নেই। ওরা ওকে নিয়ে যা খুশি করুক। ও আপত্তি করবে না। পাথরকুচি দিয়ে মেঝে তৈরি হয়েছে। তার ওপর বিছানা। বেশ পুরু বিছানা। এক বিশেষ নরম ঘাসে তৈরি।
ফ্রান্সিস বিছানায় বসল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। রাজা চলে গেল। রাজার সঙ্গে যারা এসেছিল তারাও চলে গেল।
কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। বিছানায় শুয়ে পড়ল। মারিয়া আর বন্ধুদের কথা মনে এল। এখানে এইভাবে রাজা হয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। ঠিক করল বুনোরা যা করতে বলবে তাই ও করবে। বুনোদের চটাবে না। ওদের কথামতো না চললে ওর মৃত্যু হতে পারে। কাজেই বুনোরা যা করছে করুক ও সবই মেনে নেবে।
