ফ্রান্সিসরা বড় ঝোঁপটায় ঢুকল। ঝোঁপের মধ্যে তেমন চাঁদের আলো পড়েনি। ওর মধ্যেই কিছুটা ঝোঁপ জঙ্গল পরেই দেখা গেল কিছুটা ভোলা জায়গা। ফ্রান্সিস বলল আমরা এখানে থেকে লড়াইর শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। তারপর লড়াই শেষে রাজবাড়ি যাবো।
কাদের সঙ্গে কাদের যুদ্ধ একেবারেই বোঝা গেল না। যা হোক দেখা যাক। বিস্কো বলল।
ফ্রান্সিসরা ঐ খোলা জায়গাটুকুতে বসল। চাঁদের আলো অনুজ্জ্বল। ফ্রান্সিস ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। তখন আকাশে চাঁদ আর সাদা মেঘের খেলা চলেছে। চাঁদ সাদা মেঘে চাপা পড়েছে। মেঘ সরে যেতেই আবার চাঁদ।
ওদিকে রাজবাড়ির দিকে শোনা গেল সমবেত ধ্বনি-পাচাকুটি দীর্ঘজীবী হোন। এবার কাপাক বলল–দাদা আবার এই মাজোর্কা জয় করল। আমি জয় করেছিলাম। বেশ কিছু সৈন্য পালিয়ে গিয়েছিল। হয়তো ওরাই দাদার সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ে নেমেছে। দাদার নামে জয়ধ্বনি উঠছে। দাদার সাম্রাজ্য আরো কিছুটা বাড়ল। কতজনের প্রাণ গেল কে জানে। একটু থেমে বলল–এখনকার সেনাপতি অত্যন্ত নির্মম, নিষ্ঠুর। নির্বিচারে নরহত্যা ওর কাছে খুব মজার খেলা। সে অন্য পক্ষের সৈন্যদের বন্দী করে না হত্যা করে। এতেই তার আনন্দ।
সৈন্যদের হৈ হল্লা শোনা গেল। কিছুক্ষণ পরে হৈ হল্লা বন্ধ হল।
ওদিকে সেনাপতি দুজন রক্ষী নিয়ে রাজবাড়ির দরজার কাছে এল। দেখল দরজা খোলা। ধারে কাছে কেউ নেই। সেনাপতি হো হো করে হেসে উঠল। রক্ষীদের বলল–সব পালিয়েছে। চল। প্রথম মন্ত্রণা কক্ষটায় এল। একটা গোল ওক কাঠের টেবিল। চারপাশে বাঁকা পায়াওয়ালা চেয়ার। একপাশের পাথরের দেওয়ালে একটা মশাল জ্বলছে।
ভেতরের ঘরের দরজা খুলে একটি পরিচারিকা বেরিয়ে এল। বলল– আপনারা কি রাজামশাইর কাছে যাবেন?
-হ্যাঁ। সেনাপতি বলল।
–তাহলে এই ঘরে আসুন পরিচারিকা চলল।
সেনাপতিরা পরিচারিকার পিছু পিছু পরের ঘরটায় এল। দেখল বিছানায় রাজা কুয়েক হুয়া শুয়ে আছেন। রাজা অসুস্থ এটা ওরা শুনেছিল। রাজার মাথার কাছে রাণী বসে আছেন।
রাজা একটু ওঠার চেষ্টা করলেন। রাণী রাজার পিঠে হাত দিয়ে তুললেন। ঘাড়ে পিঠে মোটা বালিশ রাখলেন। রাজা স্বস্তি পেলেন। রাজা বললেন–আসুন। আপনার পরিচয়টা জানলে–সেনাপতি রাজাকে থামিয়ে দিয়ে বলল–আমি রাজা পাচাকুচির সেনাপতি। আপনি অসুস্থ এটা আমরা শুনেছি। তবে এতটা অসুস্থ বুঝতে পারিনি।
আপনাদের তো তেমন কোন লড়াই করতে হয়নি। আমার সৈন্যরা এই আকস্মিক আক্রমণে বোধহয় দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। তাই পালিয়েছিল। রাজা বললেন।
-না। ওরা সহজে হার স্বীকার করে নি। শেষ শক্তিটুকু দিয়ে লড়েছে। যথার্থ বীর ওরা। অনেকেই পরাজয় সহ্য করতে না পেরে পেটে তরোয়াল ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সেনাপতি বলল।
কেন এসব করতে গেল? রাজা বললেন।
–আপনাকে ওরা দেবতার মত শ্রদ্ধা করে। আপনার জয় হল না। এই পরাজয় ওরা মেনে নিতে পারে নি। সেনাপতি বলল।
–হয়তো তাই। রাজা দুর্বলকণ্ঠে বললেন।
সেনাপতি সঙ্গের এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিকে দেখাল।
রাজা একটু মাথা নামালেন। নতুন রাজাও মাথা একটু নুইয়ে ভদ্রতা দেখাল।
–এখন মাজোর্কার রাজা আর আপনি নন ইনি–হুঁয়ার্কই এখন রাজসিংহাসনে বসবেন। সেনাপতি বলল।
খুব ভালো কথা। আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। প্রজারা খুবই চিন্তায় পড়ল। আমিও রাজকার্য ঠিকভাবে চালাতে পারছিলাম না। আমিও একজন নতুন সুস্থ রাজা চাইছিলাম। এখন আপনারা নিজেরাই যখন আমাকে সিংহাসনচ্যুত করতে চাইছেন তখন আমি খুশিই হয়েছি। প্রজারা একজন নতুন রাজা পাবে। সত্যি বলতে কি এভাবে রাজা হয়ে থেকে প্রজা সাধারণের কোন উপকারই করতে পারবো না। রাজা বললেন।
–এখন আপনাদের তো রাজবাড়ি ছাড়তে হবে। সেনাপতি বলল।
রাণী বলে উঠলেন–তাহলে আমরা কোথায় থাকবো?
–আপনারা কি এই মাজোর্কাতেই থাকতে চান? সেনাপতি জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। আমরা মাজোর্কা ছেড়ে অন্য কোথাও থাকবে না। রাজা বললেন।
–ঠিক আছে। সেই ব্যবস্থাই হবে। তবে আপনারা রাজার ব্যবহৃত রাজদণ্ড পতাকা পোশাক টোশাক নিয়ে যেতে পারবেন না। ওসব নতুন রাজাকে দেওয়া হবে। সেনাপতি বেশ গম্ভীর গলায় বলল। রাজা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বেশ ক্লান্তস্বরে বললেন–আমি ওসব কিছুই নেব না। তবে একটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যাপারে আপনাকে বলছি। একটু থেমে বললেন–আমি পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে একটা গয়নার বাক্স পেয়েছিলাম। ওটার মধ্যে একটা নকশা পেয়েছিলাম। ওটা আমার রাজবৈদ্যকে দেখিয়েছিলাম। উনি নকশাটা নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। দেখে টেখে ফেরত দিলেন। উনিও বললেন–এই নকশা বোঝা অসম্ভব।
–ঐ নকশা এখন কোথায়? সেনাপতি বলল।
–দুজন ভাইকিং আমার বাড়িতে এসেছিল। নক্সাটা তাদেরই দিয়েছি।
সেনাপতি একটু গলা চড়িয়ে বলল–কেন আপনি ওদের নক্সা দিলেন?
–যোগাযোগের ব্যাপার। আমি পরিচিত অপরিচিত সবাইকেই এই নকশার কথা বলে থাকি। এই ভাইকিংদেরও বলেছিলাম। ওরা বেশ আগ্রহের সঙ্গেনক্সাটা নিয়েছিল। বলেছিল কয়েকদিন ভালো করে দেখে ফেরৎ দেবে। রাজা বললেন।
নক্সা দেবার আর তোক পেলেন না? ওরা নকশা নিয়ে এতক্ষণে ওদের জাহাজে চেপে অনেক দূরে চলে গেছে। সেনাপতি বলল।
–না-না। নিশ্চয়ই ফেরৎ দেবে। এই নক্সার রহস্য কেউ উদ্ধার করতে পারবে না। রাজা বললেন।
