-না-না। ভেতরে আসুন। লোকটা বলল।
লোকটি দরজাটা আরো কিছুটা খুলল। ফ্রান্সিসরা কাত হয়ে ঢুকে পড়ল। টানা একটা কাঠের পাটাতনে বসল। তখনই মালিক এল। হেসে বলল আপনাদের কথা রাইট বলেছে। লড়াই চললে কী হবে? লোকের পেটের খিদে তো মিটবে না। তাই আমি লুকিয়ে চুরিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষদের খাবার দিচ্ছি।
–সত্যি আপনি প্রশংসনীয় কাজ করছেন। ফ্রান্সিস বলল।
–যতটা পারি আর কি। সরাইওয়ালা হেসে বলল।
–এবার আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করুন। কাপাক বলল।
মালিক ডাকল-রবার্ট?
রবার্ট এগিয়ে এল।
রান্না কতদূর? এঁরা অভুক্ত। সরাইওয়ালা বলল।
রুটি হয়ে গেছে। তরকারিটা ফুটছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ে যাবে। রবার্ট বলল।
-মাংসের ব্যবস্থা করেছো? মালিক বলল।
–না–মাংস জোগাড় করতে পারলাম না। রবার্ট বলল।
ফ্রান্সিস বলল–রবার্ট আমাদের রুটি দিয়ে যাও।
–শুধু রুটি? রবার্ট জানতে চাইল।
–হ্যাঁ সঙ্গে পেঁয়াজ আর নুন। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনারা সবাই নুন পেঁয়াজ আর রুটি খাবেন? রবার্ট আবার বলল।
–না। তবে কেউ খেতে চাইলে খাবে। যা বললাম নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল। রবার্ট অবাক চোখে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চলে গেল। মালিক বলল–রবার্ট তো বলে গেল ঝোলটা তাড়াতাড়িই হবে।
–ঠিক আছে। আমাকে আমার ইচ্ছেমত খেতে দিন। ফ্রান্সিস বলল।
নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। মালিক হেসে বলল। তারপর চলে গেল।
রবার্ট খান চারেক রুটি আর পেঁয়াজ নিয়ে এল। ফ্রান্সিসের সামনে একটা পাতা পেতে দিল। তাতে রাখল সব। ফ্রান্সিস রুটি খেতে লাগল। পেঁয়াজটা কামড়ে কামড়ে খেতে লাগল। খেতে খেতে ডাকল–রবার্ট। রবার্ট এল।
–দুটো টমেটো দিয়ে যাও। ফ্রান্সিস বলল।
রবার্ট টমেটো দিয়ে গেল।
ফ্রান্সিস নির্বিকার মুখে সবই খেতে লাগল। ফ্রান্সিসের খাওয়া তখনও শেষ হয়নি। রবার্ট সবজির তরকারি দিয়ে গেল। ফ্রান্সিস খেয়ে চলল। এবার রবার্ট অন্যদের খাবার দিতে লাগল। বিস্কোরা খেতে লাগল।
খাওয়া শেষ। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রান্সিসরা এসে পাটাতনে বসল। কিছুক্ষণ ওরা চুপ করে বসে রইল। একসময় কাপাক বলল–ফ্রান্সিস আমাদের এখানকার কাজ হয়ে গেছে। এখন মাজোর্কা যেতে হবে। আর দেরি করা ঠিক নয়।
–বেশ চলুন। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। আর সবাইও উঠে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিস দাম মেটাল। তারপর সবাই রাস্তায় এল। ফ্রান্সিস মাজোর্কার দিকটা বুঝে নিল। বলল–আমাদের পূর্বমুখো যেতে হবে।
যেতে যেতে দেখল রাস্তায় বাড়িঘরের সামনে অস্ত্রাঘাতে নিহত মানুষেরা পড়ে আছে। রাস্তায় কিছু লোকজন দেখা যাচ্ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সবাই বেশ ভীত, সন্ত্রস্ত।
সদর দেউড়ির কাছে এল ওরা। দেখল দরজার কাছে অনেক মৃতদেহ পড়ে আছে।
–থামবেন না। দ্রুত সদর দেউড়ি পার হয়ে যাবেন। কাপাক মৃদুস্বরে বলল। কিন্তু সবাই শুনতে পেল। ওরা দ্রুতপায়ে খেলা দেউড়ি পার হয়ে গেল। দু’তিনজন দ্বাররক্ষী ছিল। তারা বাধা দিল না। তাদের হাতে বল্লমও ছিল না। বোধহয় আহত।
বাইরে এসে ফ্রান্সিস বলল–কাপাক–দুটো ঘোড়া চাই। মাজোর্কা বেশ দূর।
-হ্যাঁ। হেঁটে গেলে থেমে থেমে যেতে হবে। দেরি হবে। কাপাক বলল।
–দেরি করা চলবে না। জাহাজে আমার বন্ধুরা সব রয়েছে। ওরা আমাদের জন্যে চিন্তায় আছে। আমাদের তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।
–তাহলে ঘোড়া জোগাড় করতে হয়। কাপাক বলল।
চেষ্টা করতে হবে। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকাতে লাগল। তখনই দেখল একটু দুরে একটা শিশু গাছে তিনটে ঘোড়া বাঁধা। ফ্রান্সিস গলা চেপে বলল– কাপাক দেখেছেন তো?
-হ্যাঁ। কিন্তু ঘোড়াগুলোর গায়ে গলায় কোন সাজ পরানো নেই।
–কিন্তু একটা লাগাম পরানো আছে। বসার আসন টাসনের কথা এখন ভাববেন না। চলুন।
ফ্রান্সিসরা ঘোড়াগুলোর কাছে এল। শেষ বিকেলের আলো আছে। সবই দেখা যাচ্ছে।
কাপাক বলল–আগে আপনারা দুজন যান। আমরা পরে উঠব।
-বেশ। ফ্রান্সিস বলল। তারপর বিস্কোকে সঙ্গে নিয়ে একটা ঘোড়ার কাছে এল। দেখল ঘোড়াগুলোর গলায় লাগাম মত পরানো দড়ি। ঐ দড়ি গাছের সঙ্গে বাঁধা। ফ্রান্সিস বলল–বিস্কো গাছে বাঁধা দড়ি কাটো। বিস্কো বলল– কাপাক আপনাদের ঘোড়ার দড়ি কেটে দিলাম। আপনারা উঠুন। কাপাক লাফিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ল। ঈগরও এক লাফে ঘোড়ার পিঠে উঠে পেছন দিকে কাঁপাকের পেট জড়িয়ে ধরল।
ফ্রান্সিস আর কাপাক ঘোড়া চালাতে লাগল। বসার আসন নেই, পা দানি নেই। এভাবেই ফ্রান্সিসরা ঘোড়া চালাতে লাগল। মাঝে মাঝে ফ্রান্সিসদের ঘোড় জোরে ছুটতে শুরু করে। বেশ করে ঘোড়া দুটোকে সামলাতে হচ্ছে। দুদিন পরে তৃতীয় দিন সন্ধ্যেবেলা ওরা মাজোর্কা পৌঁছল।
কিছুক্ষণ পরে কাপাক বলল–আমরা এসে গেছি রাজবাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। সদর দেউড়ির দুপাশে দুটো বিরাট মশাল জ্বলছে। দুটো থামের ওপর রয়েছে সেই মশাল দুটো। মোটা কাপড়ের পলতে। তেলে চুবিয়ে সেই মোটা পলতেতে আগুন জ্বালানো হয়। চারদিকে বেশ উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ লড়াইয়ের শব্দ। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল-রাজবাড়ির সদর দেউড়ির কাছে লড়াই শুরু হয়েছে। মানুষের চিৎকার তরোয়ালে তরোয়ালে ঠোকাঠুকির শব্দ। শোনা গেল আহতদের গোঙানি। কান্না। ফ্রান্সিস বলল- কার সঙ্গে কার লড়াই হচ্ছে আমরা তা বুঝতে পারছি না। যাদের মধ্যেই লড়াই হোক আমরা কোন দলে যাবো না। লড়াই থামা পর্যন্ত চলে। বাঁ দিকে ঐ বড় ঝোঁপটার দিকে। ওখানেই আশ্রয় নেব আমরা।
