ঘরের কোণায় রাখা মোমবাতিটার দিকে ফ্রান্সিস তাকিয়ে রইল। মাথায় চিন্তা। কবে নাগাদ ফিরতে পারবে। জাহাজে মারিয়া, বন্ধুরা নিশ্চয়ই খুব চিন্তায় পড়ে গেছে। ফ্রান্সিসের মনটা খারাপ হয়ে গেল। ফ্রান্সিসের চোখ জ্বালা করে উঠল। ও চোখ বন্ধ করল।
হঠাৎ কারর কথায় ও চোখ খুলল। দেখল একজন সৈন্য ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সৈন্যটি বলল–চলো সব। কয়েদখানায় চল।
ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়াল। ঘরের বাইরে এল। ছ’সাতজন সৈন্য আগে পিছে দাঁড়াল। চলল সবাই। রাস্তায় লোকজন চলাচল করছে। আকাশে চাঁদ আছে কি না ফ্রান্সিস তাকাল। চাঁদ কুয়াশা-ঢাকা চারদিক অন্ধকার রাস্তার লোকেরা ফ্রান্সিসদের দেখল।
নগরের পেছন দিককার দরজার কাছে এল। দরজায় সশস্ত্র প্রহরী পাহারা দিচ্ছে। সৈন্যটি প্রহরীদের কি বলল। প্রহরীরা সরে গেল। নগরের পেছন দিককার দরজা খুলে গেল। ফ্রান্সিসরা দরজা দিয়ে বাইরে এল। ওরা চলল।
এই অন্ধকারেও ফ্রান্সিস দেখল উত্তরদিকে একটা পাহাড়ের মত। খুব উঁচু নয়। এই রাস্তা গেছে ঐ পাহাড়ের দিকে। নগর ছাড়িয়ে এই রাস্তাটা পাথর ছড়ানো। এবড়ো খেবড়ো। হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। ফ্রান্সিসরা ঐ রাস্তা দিয়েই চলল।
পাহাড়ের নিচে এসে দেখল কয়েকটা গুহা। গুহার মুখে মশাল জ্বলছে। একটা গুহার মুখ বেশ বড়। গুহার মুখে দুপাশে দুটো মশাল জ্বলছে। চারজন প্রহরী তরোয়াল হাতে পাহারা দিচ্ছে।
ফ্রান্সিসরা গুহার মুখে এল। দেখল গুহায় একটু এগিয়েই পাথরে পোঁতা লোহার গরাদ। তাতে একটা ছোট দরজা, এক প্রহরী এগিয়ে এসে দরজার তালা খুলে দিয়ে ফ্রান্সিসদের ইঙ্গিতে ঢুকতে বলল। ফ্রান্সিসরা ঢুকল। একটু দূরে গুহার ভেতরের দিককার আর একটা গরাদ পোঁতা জায়গা। ঐ দুটি গরাদের মধ্যেই যতখানি জায়গা তাই বন্দীরা পাবে।
ফ্রান্সিস দেখল মেঝেয় ঘাসের বিছানা। ফ্রান্সিস দেখেই বুঝল শুয়েও বিশ্রাম করা যাবে না। পাথরকুচি ছড়িয়ে আছে। বসলে শুলে পাথরের কুচি ফুটবে। সেই অবস্থাতেই ফ্রান্সিস শুয়ে রইল। বিস্কোরাও বসল। দেখল–পেছনের দিকে একটা মাটির জালা। নিশ্চয়ই জল আছে ওটাতে। ও উঠে জালাটার কাছে গেল। জালার মুখ-ঢাকা কাঠটা সরাল। দেখল জল। ও পাশে রাখা একটা কাঁচের গ্লাশমত পেল। ও গ্লাশ ডুবিয়ে পরপর তিনবার জল ভরে খেল। ফিরে এসে ফ্রান্সিসকে বলল–যাও। জল আছে। ওখানে। ফ্রান্সিস একটু হেসে বলল–একটা পাত্রে করে এনে দাও। বিস্কো বুঝল ফ্রান্সিস খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ও গিয়ে গ্লাশের মত পাত্রটায় জল ভরে নিয়ে এসে। ফ্রান্সিসকে দিল। ফ্রান্সিসও পরপর তিনবার জল খেল। কাপাকরাও জল খেল।
ফ্রান্সিস চুপচাপ শুয়ে রইল। অনেক চিন্তা মাথায়। রাজা কুয়েক হুয়ার গুপ্তধন। এই বন্দীদশা। কবে ছাড়া পাবে তার কোন ঠিক নেই। দেরি করা চলবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাহাজে ফিরতে হবে।
একটু রাত্রে ফ্রান্সিসদের খাবার এল। দুজন সৈন্য ফ্রান্সিসদের সামনে প্রত্যেককে পাতা দিল। তারপর পোড়া রুটি আর তরিতরকারির ঝোল। ফ্রান্সিস চেয়ে চেয়ে নিয়ে নিল। বলল–বিস্কো পেট পুরে খাও। চেয়ে চেয়ে খাও। শরীর ঠিক রাখো। এটা বন্দী জীবনে ফ্রান্সিস বন্ধুদের বলে থাকে।
খাওয়া শেষ। রক্ষীরা চলে গেল। জল খেয়ে ফ্রান্সিস বলল–কাপাক আগেই শোবেন না। সবাই বিছানাটা তুলুন। বিছানাটা তোলা হল। ফ্রান্সিস এঁটো পাতাগুলি দিয়ে জায়গাটা থেকে পাথরের কুচিগুলো সরালো। তারপর বিছানা পাতা হল। এবার আর পাথরকুচি বিধছে না। ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।
একটু সকালেই ফ্রান্সিসের ঘুম ভাঙল। ও উঠে বসল। ও বাইরের দিকে তাকাল। দেখল–চারজনের জায়গায় দু’জন প্রহরী। আর দুজন বোধহয় খাবার আনবে। ও লক্ষ্য করল দুই প্রহরী নিজেদের মধ্যে কী নিয়ে কথা বলছে।
হঠাই কুজকো নগরের দিক নগর থেকে চিৎকার হৈ-হল্লার শব্দ ভেসে এল। ফ্রান্সিস বলল–কাপাক কীসের শব্দ বলুন তো! কাপাক বলল–কুজকো নগরী আক্রান্ত।
তার মানে? কারা আক্রমণ করল? ফ্রান্সিস বলল।
–পাশের রাজ্যের সঙ্গে এই কুজকো রাজ্যের ঝগড়া চলছে বহুদিন ধরে। বর্তমান। রাজারাও লড়াইতে জড়িয়ে গেছে। লড়াই চলছে।
–তাহলে আমরা কী করবো? ফ্রান্সিস বলল।
–অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। কাপাক বলল।
ফ্রান্সিসরা চুপচাপ শুয়ে বসে রইল। ওদিকে অস্পষ্ট চিৎকার আর্তনাদ গোঙানির শব্দ আসতে লাগল।
বেলা বাড়তে লাগল। সকালের খাবার এল না। কাপাক গরাদের কাছে গেল। গরাদের ফাঁক দিয়ে মুখ বের করে বলল
–কী ভাই? আমাদের খাবারের কী হল?
প্রহরী ঘুরে দাঁড়াল। বলল–আমাদেরও খাবার জোটে নি।
–কারণ কী? ফ্রান্সিস বলল।
রাঁধতে টাধতে দেরি হচ্ছে আর কি। প্রহরী বলল।
–সত্যি কথাটা বল ভাই। পাশের রাজ্যের রাজা কুজকো অধিকার করতে এসেছে। দাদার সৈন্যরা লড়াই চালাচ্ছে। রাঁধুনীও লড়াইতে গেছে। কাপাক বলল।
প্রহরী সাদামাটা গলায় বলল–কতকটা ঐরকমই ব্যাপার।
–তোমার বন্ধুকে দেখছি না। কী ব্যাপার? ফ্রান্সিস বলল।
–খাওয়ার ব্যবস্থা করতে গেছে। প্রহরী বলল।
—তাহলে খাবার পাওয়া যাবে? ফ্রান্সিস বলল।
–দেখা যাক। প্রহরী বলল।
ফ্রান্সিস একটু ভাবল। পরে কাঁপাকের কাছে গেল। বলল–মাত্র একজন প্রহরী। ওকে সহজেই কাবু করা যায়। কী বলেন?
