–হু–শরীর ঠিক রাখতে হবে। ফ্রান্সিস খেতে খেতে বলল।
ফ্রান্সিসের খাওয়া শেষ হল। জল খাওয়ার পর ফ্রান্সিসরা একটু ধাতস্থ হল। শরীরে একটু জোরও পেল। ক্লান্ত ভাবটা কমল।
কিছুক্ষণ পরে সেনাপতি এল। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল–কী? ভালো আছ তোমরা?
–ওসব কথা অর্থহীন। আমাদের কয়েদখানায় নিয়ে চলুন। ফ্রান্সিস বলল।
–সে তো নেবই। তবে শরীরের অবস্থা এখন কেমন সেটাই জানতে চাইছিলাম। সেনাপতি বলল।
–এই নিয়ে আর কথা বলবেন না। ধূলো প্রচণ্ড রোদ আর ধূলো ওড়ানো বাতাস এসবের মধ্যে দিয়ে এলে লোকে যেরকম থাকে আমরা তেমনি আছি। এখন কয়েদ ঘরে নিয়ে চলুন। ফ্রান্সিস বলল।
–রাজা পাচাকুটির হুকুম এখনও পাইনি। রাজা এখানে একবার আসতেও পারেন। সেনাপতি বলল।
ফ্রান্সিসরা কেউ কোন কথা বলল না।
কিছুক্ষণ পরে সৈন্যদের মধ্যে বেশ ব্যস্ততা দেখা গেল। সেনাপতির উচ্চস্বরে বলা কথা শোনা গেল
–সবাই ঘরে ঢোক। বাইরের মাঠে থাকবে না। সব সৈন্য ঘরে ঢুকে পড়ল। মাঠের ওপর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে রাজা পাচাকুটি এলেন। ধবধবে সাদা একটা ঘোড়ায় চড়ে। পেছনে তিনচারজন রাজার দেহরক্ষী।
রাজা ঘোড়া থেকে নামলেন। দেহরক্ষীরা নামল না। সেনাপতি রাজাকে ফ্রান্সিসদের ঘরে নিয়ে এল। রাজা ঘরে ঢুকে একবার চারদিকে চোখ বুলোলেন। ফ্রান্সিসরা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। এবার রাজা কাঁপাকের দিকে তাকালেন। একটু পরে বললেন–কাপাক তুমি আমার নির্দেশ অমান্য করেছো। তোমাকে ফাঁসি দেওয়া হবে।
–দাদা–আমি জেনেশুনে এই ভুল করিনি। তখন ভেবেছিলাম সুন্দর নগরী মাজোর্কা যদি জয় করতে পারি তাহলে তোমার রাজত্বের সীমাও বাড়বে। আবার একটা সুন্দর নগরীও তোমার অধিকারে আসবে। কাপাক বলল।
–ওসব আমি শুনতে চাই না। আমার নির্দেশ অমান্য করেছো এটাই তোমার অপরাধ। রাজা পাচাকুটি বললেন।
কিন্তু আমি যা করেছি তোমার জন্যেই করেছি। এ ব্যাপারে আমার কোন স্বার্থ ছিল না। কাপাক বলল।
–কে জানে? কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ তোমার ছিল কিনা। রাজা বললেন।
একটু থেমে কাপাক বলল–কত যুদ্ধে জয়ী হয়ে তোমার সাম্রাজ্য বাড়িয়েছি। আজকে একটা সামান্য ভুলের জন্যে আমাকে হত্যা করবে?
–ওসব কথা তুলে লাভ নেই। ফাঁসি তোমার হবেই। রাজা বললেন।
এতক্ষণে রাজা পাচাকুচির নজর পড়ল ফ্রান্সিসদের ওপর। রাজা সেনাপতিকে জিজ্ঞেস করলেন–এরা কারা?
–বিদেশী। কাঁপাকোর সঙ্গী সব। সেনাপতি বলল।
–তোমরা কোন দেশের লোক। রাজা জিজ্ঞেস করলো।
–আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।
–এখানে কী জন্যে এসেছো? চুরি ডাকাতির মতলব নেই তো? রাজা বললেন।
–ভাইকিংরা চুরি ডাকাতি করে না। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে এই দেশে এসেছো কেন? রাজা বললেন।
একটু চুপ করে থেকে ফ্রান্সিস বলল–মাজোর্কার রাজা কুয়েক হুয়া তাঁদের পারিবারিক সম্পদের সঙ্গে একটি নক্সা পেয়েছিলেন। তার পিতামহের আঁকা নকশাটিতে তাঁদের ধন সম্পদের নিশানা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাজা কুয়েক হুয়ার পিতা নক্সার অর্থ বের করতে পারেন নি। ওখানকার বুনো মানুষদের সঙ্গে লড়াইয়ে রাজা কুয়েক হুয়ার পিতামহ হঠাই মারা যান। নক্সা সম্বন্ধে কাউকে কিছু বলে যেতে পারেন নি। রাজা কুয়েক হুয়ার পিতা অনেক চেষ্টা করেও গুপ্ত ধনভাণ্ডারের হদিশ করতে পারেন নি। কুয়েক হুয়া নিজেও চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেন নি। হতাশ হয়ে তিনি কাপাককে নক্সাটা দিয়ে দেন। কাপাকও পারে নি। নক্সাটা আমি পেলাম। এই ব্যাপারে আমরা মাজোর্কা যাচ্ছিলাম। পথে আপনার সেনাপতি আমাকে বন্দী করেন। সবই আপনাকে বললাম। আমাদের একটাই কথা–আমরা বন্দী হওয়ার মত কোন অপরাধ করি নি।
রাজা পাচাকুচি একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন–নক্সাটা তোমার কাছে আছে?
-হ্যাঁ। কাপাক বলল।
–আমাকে দাও। রাজা বললেন।
–কিন্তু–যদি মাজোর্কার রাজবাড়িতে খোঁজ করার সুযোগ পাই।
–ঐ সুযোগ তুমি কোনদিনই পাবে না। গুহার কয়েদখানায় থেকে থেকেই একদিন মারা যাবে। কাজেই ওটা আমাকেই দাও। রাজা বললেন।
–বেশ এই নিন। ফ্রান্সিস কোমরের ফেট্টির মধ্যে থেকে নক্সাটা বের করল। রাজার দিকে বাড়িয়ে ধরল। রাজা খপ করে যেন কেড়ে নিলেন। বললেন মন্ত্রীমশাইকে দেব। মন্ত্রীমশাই অত্যন্ত বুদ্ধিমান। এই নক্সার রহস্য উনি অনায়াসে ভেদ করতে পারবেন।
এবার ফ্রান্সিস বলল–আপনি তো নক্সা পেলেন। এবার আমাদের ছেড়ে দিন।
–না না–রাজা মাথা নাড়লেন–তোমরা গুপ্তধন চুরি করতে এসেছো তোমাদের ছাড়া হবে না। কাপাক বলল–দাদা–আমি অপরাধ করেছি নিজের অজান্তে আমাকে শাস্তি দাও, এরা বিদেশী, এদের কেন বন্দী করে রাখা হবে?
–তোমার সঙ্গী তাই। কাউকে ছাড়া হবে না। রাজা বললেন।
রাজা ঘরের বাইরে গেলেন। সাদা ঘোড়াটায় উঠলেন। পেছন পেছন সেনাপতি ঘোড়াটায় উঠলেন। দুজনে ঘোড়া চালালেন। পেছনে কয়েকজন দেহরক্ষী, অশ্বারোহী সৈন্য।
ফ্রান্সিস বিছানায় শুয়ে পড়ল। বিস্কো বলল–
–ফ্রান্সিস এটা কী করলে?
–কী করলাম? ফ্রান্সিস বলল।
–নক্সাটা দিয়ে দিলে? বিস্কো বলল।
-ওটা নকল। আসলটা হ্যারির কাছে আছে। ঐ নিয়েই সন্তুষ্ট হল। নইলে কাঁপাকের সঙ্গে আমাদেরও ফাঁসিতে ঝোলাত। রাজামশাই অত্যন্ত নিচুমনা মানুষ।
–ঠিকই বলেছেন। ও আমার দাদা। তবু আমি ওকে ঘৃণা করি। ওর সঙ্গে মতের মিল না হলেই ঝোলাও ফাঁসিতে। ওর হুকুমে ইতিপূর্বে দুজন মন্ত্রী ফাঁসিকাঠে ঝুলেছে। সেনাপতি মরেছে তিন জন। আমিই সবচেয়ে বেশিদিন সেনাপতি ছিলাম। এখন তো আমাকে ঝোলাবার ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছে। ভাই বলে রেহাই নেই।
