তুমি যখন বলছো। ফ্রান্সিস ফিরে এসে আবার ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল।
রাতের খাওয়া শেষ হল। ফ্রান্সিস বলল–রাতে আর ঘোড়ায় চড়বো না। কাল সকালে রওনা দেব। আজ এখানেই রাত কাটাবো। তাই হল। মোটা কাপড় ঘাসের ওপর পেতে বিছানা হল। ওরা শুয়ে পড়ল।
ফ্রান্সিসের ঘুম আসতে দেরি হল। একটা সূত্র-রাজবাড়ির খাট। শোবার ঘর। আর কিন্তু তিন নম্বর ঘরটায় এখনও যাওয়া হয় নি। আরো কিছু সূত্রের প্রয়োজন। এসব ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।
সবাই ভোরে উঠল। রাতের কিছু রুটি বিস্কো রেখে দিয়েছিল। সকালের খাবার হিসেবে ঐ রুটিই মধু মিশিয়ে খাওয়া হল।
তারপর ঘোড়ার পিঠে উঠল সবাই। ঘোড়া ছোটাল মাজোর্কার দিকে।
তখন ভর দুপুর। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকাতে লাগল। দেখল চারদিকেই বুনোগাছের ঝোঁপঝাড়। পুকুরও দেখল না। শুধু চারদিকে নজর রেখে চলল।
তখনই হঠাৎ বাঁপাশের গাছপালা থেকে ঘোড়ার ডাক শোনা গেল। ফ্রান্সিস গলা। চড়িয়ে বলল–আমরা বিপদে পড়লাম। ফ্রান্সিসের কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁদিকের জংলা গাছপালা থেকে ঘোড়ায় বসা সৈন্যরা বেরিয়ে এল। প্রায় পনেরজন সওয়ারি নিয়ে ঘোড়াগুলো পথের ওপর এল। ফ্রান্সিসরা ঘোড়া থামাল।
সবচেয়ে সামনের অশ্বারোহী ঘোড়া নিয়ে ফ্রান্সিসদের সামনে এল। কাঁপাকের কাছে এসে ঘোড়া দাঁড় করাল। হেসে বলল–অশুত। এগারো দিন আমরা এখানে ঘাঁটি গেড়ে অপেক্ষা করছিলাম। জেনেছিলাম–আপনি মাজোর্কা যাবেন। কাজেই এই মোড়ে অপেক্ষা করছি। কুজবাই যান অথবা মাজোর্কাই যান এই মোড়ে আপনাকে আসতেই হবে।
–তুমি সেনাপতি হয়েছে? কাপাক জানতে চাইল।
সেনাপতি হেসে বলল–রাজা আমাকে দায়িত্ব দিলেন। আমিও দায়িত্ব নিলাম।
কাপাক চিৎকার করে বলল–তোমার মত একটা ডাহা চোরকে দাদা সেনাপতি করলেন?
সেনাপতি কোন কথা না বলে তরোয়াল বের করল। কাপাক তরোয়াল বের করার আগেই সেনাপতি কাঁপাকের ওপর তরোয়াল চালাল। ফ্রান্সিস এরকমই ঘটবে বলে আঁচ করেছিল। ফ্রান্সিস তরোয়ালের খাপে তরোয়ালের হাতলে হাত দিয়ে ধরে রেখেছিল। ও দ্রুত তরোয়াল খুলে সেনাপতির তরোয়ালে ঘা মারল। সেনাপতির তরোয়াল প্রায় ছিটকে যাচ্ছিল। কোনভাবে সামলাল। ফ্রান্সিস বলল–আমি লড়াই চাই না। সেনাপতি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–এই চারজনকেই বন্দী কর। হাত বাঁধ। তারপর বলল-ঘোড়া থেকে নামো সব।
ফ্রান্সিসই নামল। বিস্কোকেও বলল নেমে আসতে। তারপর কাপাককে বলল নেমে আসুন। ওরা সংখ্যায় বেশি। লড়াই চলবে না। সেনাপতি গলা চড়িয়ে বলল নামুন। আপনাদের হেঁটে কুজকো যেতে হবে। কাপাক আর কোন কথা বলল না। ঈগরকে নামতে বলে নিজে ঘোড়া থেকে নামল। ফ্রান্সিসদের দুহাত পেছনে নিয়ে দুজন সৈন্য দড়ি দিয়ে বাঁধল। পেছনে হাত বাঁধা অবস্থায় ফ্রান্সিসরা হেঁটে চলল। ফ্রান্সিসদের ঘোড়া দুটোয় চারজন পদাতিক সৈন্য উঠল।
সেনাপতি তরোয়াল উঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল–কুজকো। সবার আগে একটা সাদা খয়েরি ঘোড়ার পিঠে সেনাপতি। তারপরে কিছু অশ্বারোহী সৈন্য। কিছু পদাতিক সৈন্য। পেছনে ফ্রান্সিসরা। ওদের পরে খোলা তরোয়াল হাতে কিছু পদাতিক সৈন্য।
শেষ বিকেলে ফ্রান্সিসরা কুজকো পৌঁছল। প্রধান প্রবেশ পথ দিয়ে ওরা নগরে ঢুকল। কিছু প্রহরী রয়েছে। সেনাপতিকে দেখে ওরা মাথা নিচু করে সন্মান জানাল।
ফ্রান্সিসরা নগরে ঢুকল। পথে বেশ ভিড়। অনেক লোক কেনাকাটা করছে। এদিকে ওদিকে ঘুরছে। অনেকেই সেনাপতির মিছিল দেখল।ওরা কাপাককে বন্দী অবস্থায় দেখে বেশ অবাক হল। ফ্রান্সিস আর বিস্কোকে ওদের দেশীয় পোশাকে দেখে লোকেরা নানা কথা বলতে লাগল। কাপাক মাথা নিচু করে হেঁটে চলল। কোনদিকে তাকাল না।
সদর রাস্তা দিয়ে ফ্রান্সিসদের মিছিল চলল। ফ্রান্সিস বিস্কো এই প্রথম ইকাদের রাজধানী কুজকো দেখল। সত্যি বেশ সাজানো গোছানো শহর। সদর রাস্তার ধার দিয়ে ফুলের গাছ। ফুল ফুটে আছে। মাঝে মাঝেই সদর রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাগানে জলের ফোয়ারা। শেষ বিকেলের আলোয় খুব সুন্দর বাগান ঝর্ণা বাড়িঘর দেখা গেল।
ওরা ফ্রান্সিসরা একটা বড় মাঠ দেখল। মাঠের পাশে লম্বাটে বাড়ি। বিস্কো বলল সৈন্যাবাস। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল।
মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে ফ্রান্সিসরা এল লম্বাটে ঘরগুলোর একটা ঘরের সামনে। দুজন মশালবাহী সৈন্য ঘরের তালাটা খুলে দিল। ফ্রান্সিসরা ঘরে ঢুকল। মেঝে জুড়ে একটাই ঘাসপাতার বিছানা। ফ্রান্সিস বসল। তারপর শুয়ে পড়ল। কাপাক ফ্রান্সিসের পাশে এসে বসল। বলল–এটা কিন্তু সৈন্যাবাস। আমাদের এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে মাচু পিচু নামের পাহাড়ে। ওখানে কয়েকটা গুহা আছে। গুহাতে কুজকোর গরীব মানুষজন থাকে। তারই মধ্যে একটা গুহায় কয়েদঘর। আমাদের সেখানে রাখা হবে।
–আজ রাতেই আমাদের নিয়ে যাবে? ফ্রান্সিস বলল।
হা। কিছু খেতে দেওয়া হবে। তারপর। কাপাক বলল।
কিছু পরে দু’জন সৈন্য একটা বড় কাঠের গামলায় মাংসের বড়া নিয়ে এল। ফ্রান্সিসরা খেতে লাগল। শরীর এত ক্লান্ত যে ফ্রান্সিসের খেতেই ইচ্ছে করছিল না। বিস্কো খেতে খেতে বুঝল সেটা। বলল–ফ্রান্সিস পেট পুরে খাও।
ফ্রান্সিস বলল–সারা রাস্তা এই গরমে ধূলো রোদখিদেটাই মরে গেছে যেন।
–তাহলেও খাও। আবার কখন খাবার জুটবে–মা মেরিই জানে। বিস্কো বলল।
