ভোর হল। সরাইওয়ালাকে বললাম–ঘণ্টা খানেকের মধ্যে খেতে দেবার ব্যবস্থা। করতে হবে। চিনেমাটির থালা গ্লাসে জল কাজের ছেলেটি রোখ গেল। আমরা বসে পড়লাম। রাঁধুনি গোল করে কাটা রুটি আর আলু সবজির ঝোল দিল। তারপর মুর্গীর মাংস দিয়ে গেল। আমরা হাপুসহুপুস খেতে লাগলাম। তাড়াতাড়ি খেতে লাগলাম। পেট ভরে খেতে হবে। রাঁধুনি আরো রুটি দিতে এসে বলল–আস্তে খান। গলায় লাগবে। কে কার কথা শোনে। আমরা সমান গতিতে খেয়ে চললাম।
আজকেই পিসকো যাবো।
–ঠিক আছে। ঈগর বলল।
তৈরি হয়ে আমরা এই পিসকো বন্দরের দিকে আসতে লাগলাম। দুপুর তখন। চড়া রোদ গরম বাতাস। বেশ কাহিল হয়ে পড়লাম। এক গরীব চাষীর বাড়িতে বসার জায়গা পেলাম। এত খিদে পেয়েছে তখন যে ভদ্রতা টদ্ৰতা বিচার করতে পারছিলাম না। বললাম–আমরা খুব ক্ষুধার্ত। কিছু খেতে দিতে পারেন? চাষীর বৌ তাড়াতাড়ি আমাদের জন্যে কয়েকটা রুটি করল। আর আলুভাজা। আমরা গোগ্রাসে তাই খেলাম।
আর বিশ্রাম করলাম না। যাত্রা করলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পিসকো বন্দরে এসে বিদেশি জাহাজের খোঁজ করা। তারপর সেই জাহাজে চড়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া। রাত হয়ে গেলে জাহাজের পতাকা দেখতে পাবো না। তাই দ্রুত এসে বিকেল নাগাদ এই পিসকো বন্দরে এলাম। খুঁজে খুঁজে আপনাদের জাহাজটা দেখলাম।
জাহাজঘাটায় রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। তারপর আমরা অন্ধকার সমুদ্রে সাঁতরে সাঁতরে আপনাদের জাহাজে উঠলাম। ঈগর হালে বসে রইল। আমি এলাম। দেখলাম আপনারা ভালো মানুষ। বিদেশী আপনারা। তবু আপনাদের ব্যবহারে কথাবার্তায় খুবই ভালো লাগল। ঈগরকে খবর পাঠিয়ে আনালাম।
আমাদের সব কথাই আপনাদের বললাম। আমরা দস্যুও নই চোরও নই। এখন আপনাদের বিবেচনা আপনারা আমাদের আশ্রয় দেবেন কিনা। ফ্রান্সিস বলল– আপনাদের খাদ্য আশ্রয় দুটিই দেওয়া হবে। হ্যারি বলল–বুঝতে পারছি আপনারা সৎ ও নির্ভীক। আপনারা আমাদের জাহাজেই থাকবেন। একটু পরে কাপাক বলল–কী বলে যে আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাবো বুঝতে পারছি না।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–নক্সাটা আমি নিয়ে যাচ্ছি। নক্সাটা নিয়ে আমি দু’একদিন ভাববো। তারপর আপনাকে ফেরৎ দেব।
ঠিক আছে কাপাক বলল–আপনার কি মনে হয় এই গুপ্তধন উদ্ধার করা যাবে? কাপাক বলল।
–এখনই বলতে পারছি না। রাজবাড়িতে যাই। সব দেখে টেখে বুঝতে পারবো গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারবো কিনা। আসল কথা হল নক্সাটার নির্দেশ মেনে এগোতে হবে। তার জন্যে একটু সময় লাগবে। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে আপনি কি মাজোর্কা যাবেন? কাপাক বলল।
নিশ্চয়ই যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–আমাদেরও যেতে ইচ্ছে করছে। কাপাক বলল।
যাবেন। রাজা কুয়েক হুয়া আপনাকেই নক্সাটা দিয়েছেন। কাজেই নকশা দেখে গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারলে সেটা আপনারই প্রাপ্য। আমরা শুধু উদ্ধার করে দেব। তারপর রাজা কুয়েক হুয়া ও আপনি গুপ্তধন নিয়ে যা করার করবেন। ফ্রান্সিস বলল–
–আপনারা গুপ্তধন নেবেন না? কাপাক জানতে চাইল।
-না আমরা বুদ্ধির লড়াই পছন্দ করি। ভালো লাগে নকশার নির্দেশ বোঝা আর সেই অনুযায়ী ধীরে ধীরে এগিয়ে গুপ্তধন উদ্ধার করা। ফ্রান্সিস বলল।
–এতেই আপনারা খুশি? কাপাক বলল।
–হ্যাঁ। গুপ্তধন ও সম্পদের ওপর আমাদের কোন লোভ নেই। আমরা বুদ্ধি খাঁটিয়ে গুপ্তধন উদ্ধার করে যার প্রাপ্য তাকে দিয়েই আমরা আমাদের কর্তব্য শেষ করি।
–আপনাদের মত এরকম মানুষ আছে? কাপাক বলল।
–আছে–আছে। তাদের সন্ধান পান নি। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস নকশাটা নিয়ে নিজের ঘরে এল। দেখল মারিয়া ছুঁচসুতো নিয়ে কী কাজ করছে। ফ্রান্সিস বিছানায় বসল। নক্সাটা বের করে দেখতে লাগল। মারিয়া বলে উঠল–আবার নক্সা? হায় যীশু!
-শোন শোন। অতীতের এক রাজার হাতে আঁকা এই নক্সাটা। ফ্রান্সিস বলল।
–নিশ্চয় গুপ্তধনের ব্যাপার আছে। মারিয়া বলল।
–অবশ্যই আছে। নইলে আমি দেখতে নেব কেন? ফ্রান্সিস বলল।
–কোন দেশের কোন রাজার গুপ্তধন? মারিয়া বলল।
–এই দেশটার নাম পেরু। উত্তরে এক রাজ্য আছে। নাম মাজোর্কা। সেখানকার রাজার নাম কুয়েক হুয়া। তাঁর পিতামহ তার ধনসম্পদ গোপনে রেখেছিলেন। ঐ রাজ্যের পরে একটা নদীর ওপারেই থাকে বুনো লোকদের রাজ্য। এরা যখন খুশি তখন দলবেঁধে মাজোর্কায় আসে। বাধা দেবার আগেই যা পায় চুরি করে নিয়ে যায়। এখন বর্তমান রাজার পিতামহ তাই তাঁর ধনসম্পদ একটা গোপন জায়গায় রেখেছিলেন। বুনোদের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় তিনি মারা যান। বর্তমান রাজা কুয়েক হুয়াকে কিছু বলে যেতে পারেন নি। এখন রাজা একজনকে নক্সাটা দিয়েছেন যদি তিনি এই নক্সার অর্থোদ্ধার করতে পারেন। আমি তার কাছ থেকে নক্সাটা নিয়েছি। ফ্রান্সিস বলল।
-বুঝলাম। আবার গুপ্তধন উদ্ধারে নামবে। মারিয়া বলল।
–অবশ্যই নামবো। আমাকে তো জানো এইসব নক্সার অর্থ খুঁজে খুঁজে উদ্ধার করার মধ্যে আমি সবচাইতে আনন্দ পাই। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু দেশে ফেরার কী হবে? কতদিন বাবা মাকে দেখি নি। তুমি এসব বোঝ না। মারিয়া বলল।
বুঝি। আমার তো মা নেই। বাবার জন্যেই চিন্তা হয়। কিন্তু এভাবে এসব ভাবলে মন দুর্বল হয়ে যায়। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ তা হয়। মন দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু এই ভাবনা ছাড়তেও পারি না। মারিয়া বলল।
